বাসক বেশ চেনা আমাদের। কারণ একটাই, গাছটির আশ্চর্য ঔষধিগুণ। আমাদের দেশে সাধারণত আবাদ করা হলেও নেপালের কাঠমু-ু থেকে পোখরা যাওয়ার পথে পাহাড়িবনে বেশ বড় বড় ঝাড় দেখেছি। কিন্তু একযুগ আগেও রামবাসক বা তাম্রপুষ্পি বাসক সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। ঢাকায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের রবীন্দ্রচত্বর লাগোয়া মাঠের ধারে একটি গাছ ছিল। এটিই আমার প্রথম দেখা তাম্রপুষ্পি বাসক।
বছর কয়েক আগে মৌলভীবাজার জেলার পাথারিয়া পাহাড়ের পাদদেশে মাঠভরতি ফুল দেখে রীতিমতো চমকে উঠেছিলাম। একসঙ্গে অসংখ্য অগ্নিরাঙা ফুল চারপাশ আলো করে রেখেছে। এগুলো প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো তাম্রপুষ্পি বাসক। সমতল অঞ্চলে খুব একটা দেখা যায় না। তাম্রপুষ্পি বাসক উদ্যান সজ্জায় আদর্শ শ্রেণির। বিশেষত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত আমাদের দেশে যখন পুষ্পবৈচিত্র্য সীমিত হয়ে আসে তখন এই ফুলটি তার রাজসিক সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয়। এই বাসক কোথাও কোথাও বাঘাতিতা, সিংহাস্য, সিংহপুচ্ছ নামেও পরিচিত।
তাম্রপুষ্পি বাসক (Phlogacanthus thyrsiflorus) মূলত বুনো ফুল। ভুটান, চীন ও ভারতের আসাম জুড়ে এই ফুলের বিস্তার। আমাদের দেশে বৃহত্তর সিলেটে বেশি দেখা যায়। প্রিয় আবাস ঝোপ-ঝাড় বা নদীর পাড়, সেখানেই এদের দেখা মিলবে। গাছ প্রায় ২.৪ মিটার উঁচু হয়। পাতা বড়, প্রায় ২০ সেমি লম্বা। ফুল হলদে লাল বা তামাটে রঙের হয়। তামাটে রঙের ফুলের জন্য নাম তাম্রপুষ্পি বাসক। সাদা ফুলের বাসক যেমন তেতো তাম্রপুষ্পি বাসকও তেমনি তেতো, সম্ভবত এ কারণেই নাম বাঘাতিতা। ফুলের গড়ন সিংহের হা-করা মুখের হাসির মতো, তাই সিংহাস্য নাম। আবার পুষ্পদ- নাকি সিংহের লেজের মতো, তাই আরেক নাম সিংহপুচ্ছ। আর রামবাসক নামটি সম্ভবত এর গুণের জন্য। আমাদের পরিচিত বাসক এবং তাম্রপুষ্পি বাসক একই পরিবারের উদ্ভিদ।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই দুই বাসকের গুণ প্রায় সমান। ঠান্ডা-কাশি, অ্যাজমা, রক্ত পিত্ত, হুপিং কাশি প্রভৃতিতে উপকারী। কিন্তু এর মাত্রা জেনে ব্যবহার করা উচিত। বেশি মাত্রায় ব্যবহারে তন্দ্রাভাব আসে, তবে কোনো ক্ষতি হয় না।
তাম্রপুষ্পি বাসক স্ত্রীরোগের ক্ষেত্রে ফলদায়ক। পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে মেনোরিজিয়া (গবহড়ৎৎযড়বমরধ) বলা হয়। এই রোগ সম্পর্কে আয়ুর্বেদের নিজস্ব চিন্তাধারার চিকিৎসা পদ্ধতিও ভেষজগুণের সমন্বয় সাধনেই এই রোগোপশম সম্ভব হয়। হাতের নাগালে বাসক বিদ্যমান থাকতে রক্ত পিত্ত, ক্ষয় ও কাশির সমস্যায় মুষড়ে না পড়ার পরামর্শ হেকিমদের। রামবাসকের সিরাপ দুরারোগ্য হুপিং কাশিকে নিরাময় করে। এটা দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে উপলব্ধি করা যায়।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার মিটার উচ্চতায় এ বাসক ভালোভাবে জন্মাতে পারে।
লেখক : উদ্ভিদ, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক
