পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল

আপডেট : ০৮ মে ২০২৬, ০৭:৪৩ এএম

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ করতে না চাওয়ার মধ্যেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিধানসভা ভেঙে দিয়েছেন রাজ্যপাল আরএন রবি। আর  তার এই আদেশের মধ্য দিয়ে ইস্তফা ছাড়াই মুখ্যমন্ত্রীর পদ হারালেন ৭১ বছর বয়সী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত দুদিনের জন্য রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে রাজ্যপাল বলেন, ‘ভারতের সংবিধানের ১৭৪ অনুচ্ছেদের (২) ধারার (খ) উপ-ধারার অধীনে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে আমি ২০২৬ সালের ৭ মে থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভেঙে দিচ্ছি।’ সংবিধানের ধারা মেনে রাজ্যপালের নির্দেশ বলবৎ হওয়ায় মমতার নেতৃত্বাধীন সপ্তদশ বিধানসভার আনুষ্ঠানিক ইতি  ঘটেছে এবং নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে অষ্টাদশ বিধানসভা গঠনের পথ প্রশস্ত হয়েছে।

জানা গেছে, পরাজয়ের পর রাজভবনে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া ভারতীয় সাংবিধানিক রীতি। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে ভোটের ফল ঘোষণার পরের দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন ‘কেন পদত্যাগ করব? আমরা তো হারিনি! জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্ন কেন উঠছে?’ তিনি লোক ভবনে গিয়ে সরকারিভাবে ইস্তফা না দিয়ে বলেছিলেন ‘ওরা আমাকে বরখাস্ত করুক!’ তবে ‘মুখ্যমন্ত্রী’ মমতাকে বরখাস্ত করেননি রাজ্যপাল। আবার তাকে নতুন সরকারের শপথ পর্যন্ত ‘তদারকি মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেননি। শুধু বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সপ্তদশ বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

নতুন বিজেপি সরকারের শপথ নেওয়ার কথা আগামী ৯ মে। ফলে মাঝের এই দুদিনের জন্য রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হওয়ায় রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন রাজ্যপাল।

এদিকে কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রথম বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিজেপি ও এনডিএর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, রাজ্যে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে বিজেপি। ৮০টি আসনে জয় পায় তৃণমূল কংগ্রেস। খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে ১৫ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত হন।

উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ, গ্রেপ্তার চার শতাধিক : বিধানসভা নির্বাচনের ফলকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। গত সোমবার ঘোষিত ফলে রাজ্যটিতে প্রথমবারের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিজেপি। ইতিমধ্যে ভোটপরবর্তী সহিংসতায় রাজ্যটিত ৫ জন নিহত হয়েছে; যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম- চন্দ্রনাথ রথ। গত বুধবার রাতে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারীকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রাজ্যটিতে সহিংসতায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এ পর্যন্ত কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৩৩ জনকে; আটক করা হয়েছে ১ হাজার ১০০ জনকে। গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজিপি) সিদ্ধনাথ গুপ্ত। সেসময় তিনি বলেন, রাজ্যজুড়ে ২ শতাধিক মামলা হয়েছে এবং এসব মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত আছে। গত ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয় পশ্চিমবঙ্গে, ৪ মে সোমবার ভোটের ফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। সেই দিন, অর্থাৎ সোমবার রাত থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করে সহিংসতার খবর।

ভোটের ফল প্রকাশের পর রাত থেকেই কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর শুরু করে বিজেপি সমর্থকরা, হামলা শুরু হয় তৃণমূল কর্মীদের ওপরও। আবার রাজ্যের অনেক এলাকায় বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের ওপরও চড়াও হয়েছে তৃণমূল। সেই উত্তেজনার রেশ এখনো চলছে। এর মধ্যে চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যু আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বুধবার উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার মধ্যমগ্রামের দোহারিয়া এলাকায় গাড়িতে করে যাওয়ার সময় পথে খুন হন তিনি। পুলিশ সূত্র বলছে, দুষ্কৃতকারীরা চন্দ্রনাথকে বেশ কিছুদিন ধরে নজর রাখছিল।

পুলিশ জানায়, দুষ্কৃতকারীরা একটি গাড়ি ও দুটি মোটরসাইকেলে করে তাকে অনুসরণ করছিল। চন্দ্রনাথের গাড়ি কলকাতা বিমানবন্দরের ১ নম্বর গেট হয়ে যশোর রোডের ডানদিকে দোহারিয়ার দিকে ঢুকলে দুষ্কৃতকারীরা মোড়ের রাস্তায় তার গাড়ি আটকে দেয়। এ সময় পেছনের মোটরসাইকেলে আসা দুষ্কৃতকারীরা গাড়ির সামনের আসনে বসা চন্দ্রনাথকে লক্ষ্য করে পরপর চারটি গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। চন্দ্রনাথ বিজেপি নেতা শুভেন্দুর আপ্তসহায়ক হিসেবে তার ছায়াসঙ্গী হিসেবে থাকতেন। এবার বিধানসভায় ভবানীপুর আসনের নির্বাচনে শুভেন্দু দায়িত্বে রেখেছিলেন এই চন্দ্রনাথকে। তিনি বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মী। অবসর নেওয়ার পর তিনি শুভেন্দুর হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন।

ঘটনা জানার পর দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যসহ অন্য নেতারা। ছুটে যান পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মহাপরিচালক সিদ্ধনাথ গুপ্তসহ পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও। শুভেন্দু বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের কোনো রথীমহারথী ছাড় পাবেন না। তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত