ভারতকে সংবেদনশীল হওয়ার তাগিদ ঢাকার

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৬ এএম

জুলাই যোদ্ধাসহ বাংলাদেশের নাগরিকদের ‘আহত করে’, এমন বিষয়ে নিকট-প্রতিবেশী ভারতকে সংবেদনশীল হওয়া দরকার বলে মনে করে বাংলাদেশ সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এ কথা বলেন।

নয়াদিল্লিতে গত বুধবার দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যে বিষয়গুলো জুলাইযোদ্ধাসহ বাংলাদেশের নাগরিকদের আহত করে, সেসব বিষয়ে ভারতকে অনেক বেশি সংবেদনশীল হতে হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে ভারতকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তারা পররাষ্ট্র বিষয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেবে। কিন্তু আমরা চাই, সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের ভিত্তিতে, নিজেদের স্বার্থ বজায় রেখে। সেটা সম্ভব হলে সবার জন্য ভালো।’

শামা ওবায়েদ বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক, যেটা একটি জায়গায় আটকে থাকতে পারে না, যা শেখ হাসিনা চায়। জ্বালানি, পানি, সীমান্তসহ বিভিন্ন বিষয় আছে; যেগুলো নিয়ে আলাপ-সংলাপ দরকার আছে। এই আলোচনাগুলো চলবে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ভালো হোক এটা দুই দেশের সরকার ও জনগণ চায়। ভারতের সঙ্গে অনেক কিছু আছে, যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রয়োজন আছে। কিন্তু ভারতের মাটিতে বসে যদি আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী ও সাজাপ্রাপ্ত লোকজন ষড়যন্ত্রমূলক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে থাকে, আর ভারত সরকার তা অবিলম্বে বন্ধ না করে, তবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য উদ্বেগের জায়গা তৈরি করে। এগুলো ভারত চলতে দেবে কি না, সে সিদ্ধান্ত ভারতকে নিতে হবে।’

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের আমন্ত্রণে বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস আউটরিচ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না এ প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় কর্মসূচিতে যোগ দিতে আগ্রহী। তবে প্রধানমন্ত্রী তার ব্যস্ততা ও কর্মসূচি অনুযায়ী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।’

আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের পাশে ১৪ সেপ্টেম্বরের আউটরিচ কর্মসূচিতে যোগদানের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

শেখ হাসিনার বক্তব্যে বাংলাদেশকে ‘জঙ্গিরাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস আছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কী অবস্থান একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (বুধবারের) বিবৃতিতে কূটনৈতিক ভাষায় এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের বিষয়ে জঙ্গিবাদের তত্ত্ব টেনে আনা আওয়ামী লীগের পুরনো অভ্যাস। আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ পাওয়ার জন্য এটা করা হচ্ছে। এই তত্ত্ব আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়ও আন্তর্জাতিকভাবে ও জাতীয়ভাবে কেউ বিশ্বাস করেনি এখন বিশ্বাস করার প্রশ্নই আসে না।’

আওয়ামী লীগের মুখে এখন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা শুনতে হচ্ছে; এটা একটি হাস্যকর ব্যাপার এমন মন্তব্য করে শামা ওবায়েদ প্রশ্ন তোলেন, ‘যখন ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম ও সুমনকে গুম করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছোট ছোট বাচ্চাদের হত্যা করা হয়েছে, তখন মানবাধিকার কোথায় ছিল?’ 

নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে শেখ হাসিনার ভার্চুয়ালি মতবিনিময় অনুষ্ঠানের বিষয়ে আগে থেকেই ভারত সরকারকে উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল ঢাকা। জবাবে এর সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। এরপরও অনুষ্ঠানটি করার অনুমতি দেওয়ায় তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা।

গত বুধবার রাতেই এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশের মানুষ যখন জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে, ঠিক সেই দিনে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান। এ ছাড়া শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনেকে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দ- নিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ কেন দিল এটি আমাদের প্রশ্ন। ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন; তাকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলা সুযোগ দেওয়া হলো।’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেনি বা ক্ষমা চায়নি। এমনকি তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। বরং তারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে। জনগণ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ।’ তিনি বলেন, ‘দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির ব্যাপারে বিচার হবে। সংশ্লিষ্ট আইনে সেই বিধান যুক্ত করা হয়েছে। তবে বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে সিদ্ধান্তের বিষয়টি আদালতের। আদালত থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেভাবেই সরকার কাজ করবে।’

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে বক্তব্যই দেওয়া হোক না কেন, তাদের সমর্থন ছাড়া নয়া দিল্লিতে এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির দিন নয়াদিল্লিতে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বক্তব্য রাখার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা ভারতের নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনাতেই হয়েছে।’

বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

রিজভী বলেন, ‘৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন। এই দেশে গণতন্ত্র, অবাধ রাজনীতি এবং জনগণের কথা বলার সুযোগের জন্য, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে যে গণজাগরণ ও মহাবিপ্লব হয়েছে, ঠিক সেই দিনেই দিল্লিতে এই প্রোগ্রামটি হয়েছে। সেখানে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে শেখ হাসিনাকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটা সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পিত একটি বিষয়। অর্থাৎ গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের অপমান করার জন্যই শেখ হাসিনাকে কথা বলার সুযোগটা করে দেওয়া হয়েছে। এই ঘৃণ্য প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা গত সতের বছর অবৈধভাবে শাসন করে দেশটাকে ধ্বংস করেছে। এখন প্রতিবেশী দেশ ভারতে বসে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তার কোনো চক্রান্ত সফল হবে না। দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রশ্নে এক আছে।’

গতকাল বেলা ১১টার দিকে নাটোর  সদর উপজেলার হয়বতপুর বেগম খালেদা জিয়া মহাবিদ্যালয়ের চারতলা ভিত বিশিষ্ট একতলা নতুন অ্যাকাডেমিক ভবন ও রাস্তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত