কাঁচা-পাকা চুল দাড়ি। পরিপাটি চেহারা। সুঠাম দেহ। তীক্ষ্ম চোখ। অবয়বে ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা। দেখে মনে হয় হাতে আঁকা ছবি, আসলে না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল সময়ের প্রতিকৃতি এটি। রবীন্দ্রনাথের এই ছবির আলোকচিত্রী সুকুমার রায়। যখন এই ছবিটি তোলা হয় তখন আলোকচিত্র দুনিয়ায় গ্লাস প্লেট নেগেটিভের যুগ। আর ভারতীয় উপমহাদেশে তখন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন জোয়ার। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ঠিক ৪৫ বছর। আর সুকুমারের ১৯। রবীন্দ্রনাথের বেশির ভাগ ছবিই শেষ বয়সের। তরুণ কিংবা মধ্য বয়সের ছবি খুব একটা নেই। মধ্য বয়সের যত ছবি আমরা দেখি, এই ছবিটি সেগুলোর অন্যতম।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এ পর্যন্ত যত গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা বের হয়েছে, তার অধিকাংশগুলোতেই ছবিটি ১৯০৫ সালে তোলা বলে উল্লেখ করা হয়। ছবিটি কার তোলা প্রকাশনাগুলোতে তার উল্লেখ নেই। রবীন্দ্রনাথের ছবিগুলোতে সাধারণত ফটো ক্রেডিট ব্যবহার করা হয় না। ফলে তার আলোকচিত্রীদের নাম জানা যায় না। ২০২৫ সালে কথাপ্রকাশ থেকে আমার সম্পাদনায় আলোকচিত্রপুরাণ প্রকাশিত হয়। সেই সময় দ্য ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেট-এ চোখ রেখে জানতে পারি, রবীন্দ্রনাথের এই ছবিটি সুকুমার রায়ের তোলা।
কবিগুরুর আশিতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৪১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দ্য ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেট-এর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। অমল হোম সম্পাদিত সেই সংখ্যায় এক পৃষ্ঠাজুড়ে ছবিটি ছাপা হয়। ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয় ১৯০৬ সালে সুকুমার রায় কর্তৃক ফটোগ্রাফ। এই ছবি প্রথম ছাপা হয় ১৯১১ সালে, বিশ্ববিখ্যাত সাময়িকী প্যানরোজ পিকটোরিয়াল অ্যানুয়াল-এ। সেকালের মুদ্রণজগতে প্যানরোজ ছিল বাইবেলের মতো। প্যানরোজ-এর ওই ইয়ার বুকে ‘মাল্টিপল স্টপস’ শিরোনামে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর একটি দীর্ঘ গবেষণা প্রবন্ধ [পৃষ্ঠা : ৮১-৮৮] প্রকাশিত হয়। সেই প্রবন্ধের ৮৪ নম্বর পৃষ্ঠায় সুকুমারের তোলা রবীন্দ্রনাথের এই ছবির বিভিন্ন এক্সপোজারের চারটি ইমেজ ছাপা হয়। প্যানরোজ-এ অবশ্য ফটো ক্রেডিট ব্যবহার করা হয়নি।
এই ছবি কীভাবে কিংবা কোন বাস্তবতায় তোলা সে কাহিনি জানা যায় না। রবীন্দ্রনাথ কিংবা সুকুমার কেউ এই ছবির বর্ণনা লিখে যাননি। এই ছবির কারিগরি দিক জানতে বিশিষ্ট প্রতিকৃতি আছে দুঃখ আছে মৃত্যু...
আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি বললেন, ‘ছবিটি দেখে মনে হয়, স্টুডিও লাইটে তোলা। লিথোগ্রাফ টাইপের। ধারণা করি, ছবিটির নেগেটিভ শান্তিনিকেতনের আর্কাইভে নাই। আমরা যেটি দেখি, সেটি ছবি থেকে প্রিন্ট করা। ছবির নিচের দিকে ফেইড হয়ে গেছে।’ নাসির আলী মামুন জানান, ‘রবীন্দ্রনাথের তরুণ ও মধ্য বয়সের ছবি কম। তবে এটিই তার মধ্যবয়সের সবচেয়ে আইকনিক ছবি।’
সুকুমার রায় যে রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য ছবি তুলেছেন শত বছরের বেশি আগের পুরনো সাময়িকপত্রে তার প্রমাণ মেলে। কলকাতার সিটি স্কুলে পড়ার সময়ই ফটোগ্রাফিচর্চা শুরু করেন সুকুমার। উপেন্দ্রকিশোর ১৯১১ সালে ছেলে সুকুমারকে বিলেতে পাঠান ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণশিল্পে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য। তার আগেই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে সুকুমারের যাতায়াত। সুকুমারের বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আবার সুকুমার ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ছেলে রথীন্দ্রনাথের বিশেষ বন্ধু।
ফলে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে ছবি তোলার সুযোগ পান সুকুমার রায়। রবীন্দ্রনাথের একটি পারিবারিক ছবি আছে সুকুমারের তোলা। ছবিতে দেখা যায় ছেলে রথীন্দ্রনাথ আর পুত্রবধূ প্রতীমা দেবীর মাঝখানে বসা রবীন্দ্রনাথ। তাদের দুই পাশে রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠা কন্যা মীরা দেবী ও জ্যেষ্ঠা কন্যা মাধুরীলতা দেবী। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে কারুকাজ করা পর্দা। নববধূকে ঘিরেই ঘরোয়া পরিবেশে ছবিটি তোলা। বিভিন্ন প্রকাশনায় ছবিটিকে ১৯০৯ সালে গৃহীত বলে উল্লেখ করা হলেও আমার ধারণা ছবিটি পরের বছর তোলা। কারণ রথীন্দ্রনাথ ও প্রতীমা দেবীর বিয়ে হয় ১৯১০ সালের ২৭ জানুয়ারি। ফলে ছবিটি বিয়ের পরে তোলা মনে করাই সঙ্গত। প্রতীমা দেবীর শাড়ি, চুড়ি আর গয়না দেখলেও তা অনুমান করা যায়। ঐতিহাসিক এই ছবিটি ১৯৬০ সালে রবীন্দ্রশতবর্ষ পূর্তিতে বিশ্বভারতী পত্রিকার শ্রাবণ-আশি^ন ১৩৬৭ সংখ্যার ৩১ নম্বর পৃষ্ঠায় ছাপা হয়।
ঠাকুর পরিবারের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কিছু দুষ্প্রাপ্য আলোকচিত্র ধারণ করেছিলেন সুকুমার। শত বছরেরও বেশি আগে ছাপা হওয়া সাময়িকপত্রের পৃষ্ঠা থেকে এমন তিনটি ছবি খুঁজে বের করি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ফাল্গুনী’ নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯১৫ সালের মার্চ মাসে, কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। বৈরাগ্য-সাধন ও যৌবন উদযাপনের ধারণার ওপর ভিত্তি করে নাটকটি রচিত। এই নাটকে অভিনয় করেন রবীন্দ্রনাথ ও ঠাকুর পরিবারের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এই নাটকের প্রথম মঞ্চায়নের ছবিগুলো যে সুকুমারের তোলা তা আমি জানতে পারি রমানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত প্রবাসী পত্রিকা ঘাঁটতে গিয়ে। প্রবাসীর চৈত্র ১৩২২ সংখ্যায় [মার্চ ১৯১৬] ‘ফাল্গুনী’ নাটক নিয়ে একটি সমালোচনা লেখেন সুবেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত। সেই প্রবন্ধের সঙ্গে সুকুমারের তোলা এই তিনটি ছবি ছাপা হয়। পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হওয়া মূল ছবিটির ক্যাপশনে লেখা হয় ‘বৈরাগ্য-সাধন অভিনয়ের ভূমিকা। পাঠকের বাঁদিক হইতে শ্রুতিভূষণ শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মন্ত্রী শ্রীযুক্ত সমরেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রাজা শ্রীযুক্ত গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেনাপতি বিজয়বর্মা শ্রীযুক্ত পীয়ার্সন। কবিশেখর শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এখানে ‘ফাল্গুনী’ অভিনয়ে অন্ধ বাউলের বেশে উপস্থিত আছেন, যুবক কবিশেখরের বেশে নহে।’ ক্যাপশনের নিচে উল্লেখ করা হয় শ্রীযুক্ত সুকুমার রায় কর্তৃক গৃহীত ফটোগ্রাফ হইতে। পরের পৃষ্ঠায় ছাপা হয় অন্ধ বাউলের বেশে রবীন্দ্রনাথের একটি একক ছবি ও ‘ফাল্গুনী’ নাটকের রঙ্গসজ্জায় কলাকুশলীদের আরেকটি ছবি। রবীন্দ্রনাথের আর কী কী ছবি তুলেছেন সুকুমার তা জানতে আরও দীর্ঘ গবেষণা প্রয়োজন।
তবে রবীন্দ্রনাথ ও সুকুমারের সম্পর্কের রসায়ন বুঝতে হলে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকে আলো ফেলা দরকার। ম্যানচেস্টারে পড়ার সময় সুকুমার থাকতেন বিলেতের ২১ ক্রমওয়েল রোডের নর্থব্রুক সোসাইটির হোস্টেলে। এর মধ্যে ১৯১২ সালের ১৯ জুন একটা মজার ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ ধর্মযাজক ও রবীন্দ্রসাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদক উইলিয়াম পীয়ার্সনের বাড়িতে বাংলাসাহিত্য নিয়ে ইংরেজিতে একটা প্রবন্ধ পড়ার আমন্ত্রণ পান সুকুমার। সেখানে গিয়ে তার চোখ চড়কগাছ। ঘরোয়া এই সভায় উপস্থিত ব্রিটেনের সাহিত্যমহারথী আর্নল্ড বেনেট, উইলিয়াম রোদেনস্টাইন, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ! ফলে চোখ-কান বন্ধ করে তিনি পড়লেন ইংরেজিতে অনূদিত রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি কবিতা। এতে রবীন্দ্রনাথ এতটাই খুশি হলেন যে সবার কাছে পুত্রসম সুকুমারকে পরিচয় করিয়ে দিলেন ‘যুবক বন্ধু’ বলে।
এই ঘটনার বছরখানেক পর ১৯১৩ সালের ২১ জুলাই বিলেতের ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট সোসাইটিতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ পড়ার আমন্ত্রণ পেলেন। ‘দ্য স্পিরিট অব রবীন্দ্রনাথ টেগোর’ শিরোনামে নিজের লেখা প্রবন্ধ পড়লেন সুকুমার। রবীন্দ্রনাথ জীবনের প্রেমে যেমন উদ্বেল হয়েছেন, তেমনি শ্যামসমান মৃত্যুকেও প্রশান্ত চিত্তে আলিঙ্গন করতে চেয়েছেন। রবিদর্শনের এই বিশেষ দিকটি সুকুমারের বক্তৃতায় উঠে আসে। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লন্ডনের বিখ্যাত ত্রৈমাসিক দ্য কোয়েস্ট-এর সম্পাদক জি. আর. এস. মিড। তিনি দ্য কোয়েস্ট-এ সুকুমারের প্রবন্ধটি ছাপার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ১৯১৩ সালের অক্টোবর মাসে দ্য কোয়েস্ট-এ সুকুমারের দীর্ঘ প্রবন্ধটি [পৃষ্ঠা : ৪০-৫৭] প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধই প্রথম পাশ্চাত্য দুনিয়ায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও দর্শনকে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তোলে। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‘ইহাই বোধহয় রবীন্দ্র সম্বন্ধে ভারতীয়দের পক্ষে প্রথম পাবলিক ভাষণ।’ পরের মাসে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান রবীন্দ্রনাথ।
১৯১৩ সালে সুকুমারের গবেষণা ডিগ্রি সম্পন্ন হয়। ওই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর ‘সিটি অব লাহোর’ জাহাজে করে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেশে ফেরেন সুকুমার। ২০ দিনের এই সমুদ্রযাত্রায় কবির সঙ্গে তার কী কী আলাপ হলো কিংবা পারস্পরিক সঙ্গ কেমন কাটল এসবের লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় না। দেশে ফেরার দুই মাসের মধ্যে সুপ্রভা দাশকে বিয়ে করেন সুকুমার। ১৯২১ সালের ২ মে সুকুমার-সুপ্রভার ঘরে জন্ম নেন সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের জন্মের কয়েক মাস পর দুরারোগ্য কালাজ¦রে আক্রান্ত হন সুকুমার। তখন এ রোগের কোনো ওষুধ ছিল না। ফলে মৃত্যুই ছিল অবধারিত। সুকুমারের এমন অসুস্থতা রবীন্দ্রনাথকে খুবই ব্যথিত ও বিচলিত করে। রবীন্দ্রনাথ নিয়মিত সুকুমারের খোঁজখবর নিতেন। মাঝে মাঝে যেতেন ১০০ নম্বর গড়পাড় রোডের বাড়ি।
১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর মাস। কলকাতার আলফ্রেড ও ম্যাডন থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের নাটক ‘শারদোৎসব’ মঞ্চস্থ হচ্ছিল। নাটকে সন্ন্যাসী চরিত্রে অভিনয় করছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এ সময় খবর পেলেন, সুকুমার মৃত্যুপথযাত্রী। সুকুমারের জন্য কবির মন ব্যথায় কাতর হয়ে উঠল। সুকুমারকে দেখতে তিনি ছুটে গেলেন তার গড়পাড়ের বাসায়। কথা বলতে পারছেন না সুকুমার। কিন্তু কবিকে দেখে তিনি আনন্দে আত্মহারা। মৃত্যু নিয়ে তার চোখে লেশমাত্র দুঃখ নেই। সুকুমার কবিকে একটি গান গাইতে অনুরোধ করলেন। কবি ধরলেন ‘দুঃখ এ নয়, সুখ নহে গো, গভীর শান্তি এ যে। আমার সকল ছাড়িয়ে গিয়ে, উঠল কোথায় বেজে।’ কবির এই অমর সুধা নীরবে শুনলেন সুকুমার। চোখে জল, মুখে প্রশান্তির দীপ্তি। গানের বাণী আর সুরের তরঙ্গে বদ্ধ ঘরে স্বর্গীয় সুষমা ভর করল। সুকুমার এবার কবিকে আরও একটি গান গাইতে অনুরোধ করলেন। কবি কণ্ঠে ধরলেন ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে...।’
