মূল্যস্ফীতির ধকল

বাড়ুক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা

আপডেট : ০৮ মে ২০২৬, ০৮:০৪ এএম

এটা কোনো গল্প নয়, কঠিন বাস্তব, যা নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে হতচকিত করে দিয়েছে। তারা ভাবতে পারছেন না, কী করে এই মূল্যস্ফীতির চাপ সহ্য করবেন। নগরনিবাসী মধ্যবিত্তের পকেটেও এর তাপ লেগেছে। উচ্চবিত্তের পকেটের টাকায় টান পড়বে না বটে, তবে দুর্ভাবনা তাদেরও আছে। কাঁচাবাজার থেকে পাইকারি বাজার, মুরগি- ডিম আর দুধের বাজারেও মূল্যস্ফীতি অসহনীয় স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার ফলে গোটা মধ্য প্রাচ্যে তেলের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। তা মাথায় রেখে বাংলাদেশ সরকার জ্বালানির দাম বাড়ায়নি প্রথমদিকে। এপ্রিলের ১৯-এ এসে দাম বাড়ানো হয়েছে যথাক্রমে ডিজেল লিটারে ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, অকটেন ২০ টাকা এবং পেট্রলে ১৮ টাকা বেড়েছে।। দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাসভাড়া, লঞ্চভাড়াসহ পরিবহন খাতের সব রকম যানবাহনে ভাড়া বেড়েছে। এর ফলে নির্মাণ সামগ্রি থেকে শুরু করে, পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণেও তার চাপ আমরা লক্ষ্য করছি। সামগ্রিক বিবেচনায় এই স্ফীতি, গোটা দেশের অর্থনীতির ওপর এসে পড়েছে। যদি এই মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকে, বাজার নিয়ন্ত্রিত ও ব্যবস্থাপনায় শৈথিল্য থাকে, তাহলে আমরা ক্রমাগত হারাব জীবনযাপনের মান। এমনিতেই নগর ও গ্রামের মধ্যে পণ্যের দামে ব্যবধান থাকে। মূলত তা পরিবহনের কারণেই বেশি হয়। সততার সঙ্গে ব্যবসা করলে হয়তো মূল্যস্ফীতি তেমন কোনো চাপ ফেলতে পারত না, কিন্তু তা হওয়ার নয়। লোভী ব্যবসায়ীদের উদগ্র বাসনার জন্য মার খাচ্ছে ক্রেতা-ভোক্তাসাধারণ। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি বলেন ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।’ তবে, যুদ্ধের সুযোগেই বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যেতে দেখা গেছে । সেই দাম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিত থেকে জ্বালানির দাম পুনর্নির্ধারণের ফলে তা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির সমাধান কীভাবে হবে তা সরকারের বিষয় হলেও উৎপাদন সেক্টরের শ্রমজীবীদের মধ্যে তা ভাগ করে নেওয়ার মতো পথ খুঁজে নিতে হবে আমাদের। নতুন সরকার অচিরেই মূল্যস্ফীতির ধকল সামলে নিতে নতুন বেতন স্কেল দেওয়ার আয়োজন করছে। ওই স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানা গেছে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবার আগে বাড়তি টাকা পাবেন। এতে তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে মনে করা যেতে পারে। তারপর উচ্চ বেতনের কর্মকর্তারা পাবেন বাড়তি বেতন। ফলে তারাও স্বস্তি পাবেন বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বাইরেও লাখ লাখ বেসরকারি শ্রমজীবী আছেন, তাদের বেতন-ভাতা কি বাড়বে? তারাইবা ওই মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেবেন কীভাবে? আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সঙ্গতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে বিশেষ পথ খুঁজে নিতে হবে, যা সমতাকে একটি সরলরেখায় নিয়ে আসতে পারে।

অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে উৎপাদিত পণ্যের মানভেদে মূল্য স্থিতিশীল রাখা জরুরি। বৈদেশিক বাণিজ্যের বহুমুখিকরণ ও রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন নতুন দুয়ার উন্মুক্ত করতে হবে। আমাদের সম্ভাবনাময় কুটির এবং হস্তশিল্প আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যেতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সে ব্যাপারে সরকারকে ভাবতে হবে। এপ্রিলের ৯.০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনতে হলে প্রশাসন ও রাজনৈতিক সরকারের কর্মগতি বাড়াতে হবে। অর্থনীতি যাতে ভালো ফল দিতে পারে, তার জন্য পণ্যবাজার মূল্য ও উৎপাদন ব্যয় কমানো যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি কমে আসুক মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এটাই প্রকৃত প্রত্যাশা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত