আয় বৈষম্যের স্থিতিস্থাপকতা

আপডেট : ০৮ মে ২০২৬, ০৮:০৬ এএম

আয় বৈষম্যে স্থিতিস্থাপকতার উপসর্গ কর জিডিপির অনুপাত তারতম্যের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় বেশ কম। এটি কম কেন, তা নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে অনেকে বিভিন্ন কথা বলেন। কিন্তু তারা সামগ্রিকভাবে বিষয়টিকে দেখেন না। এতদিন কাজ করে যা বুঝেছি, তা হলো তিন কারণে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। এক. আওতার সীমাবদ্ধতা, পরিধিগত ঘাটতি। সব যোগ্য করদাতা ও খাতকে করজালের মধ্যে আনতে পারা বা তাদের আসতে অনীহা, দীর্ঘসূত্রতা বা ক্ষেত্রবিশেষে অপারগতা অথবা অক্ষমতা। দুই. ব্যাপক কর ছাড়, কর রেয়াত, কর ফাঁকি, মামলায় আটকানো, কর্তন কিংবা আদায়কৃত কর রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়া। তিন. এর কারণ রাজস্ব বিভাগের দক্ষ লোকবলের অপর্যাপ্ততা, কর ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণে অপারগতা- দুর্নীতি, জবাবদিহির অবর্তমানে কর ফাঁকিতে পারস্পরিক আঁতাত,  মনিটরিংয়ের দুর্বলতা, প্রত্যক্ষ কর আইন আহরণ ও প্রদান পদ্ধতির জটিলতাসহ পরোক্ষ করের আধিক্য, সংস্কারে ধীরগতি (অনীহা) দায়ী। এই মনোভঙ্গি পরিবর্তনের আবশ্যকতা রয়েছে।

করের আওতা সীমিত, জুরিসডিকশন আসলে বাঞ্ছনীয়ভাবে বাড়ছে না। অর্থাৎ সক্ষম সব করদাতা এবং প্রযোজ্য সব খাত করজালের আওতায় আসেনি। ফলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়েনি। যেকোনো দেশে জিডিপির অন্তত ১৫-১৬ শতাংশ কর হিসেবে আহরিত হয়। কিন্তু আমাদের কর জিডিপির অনুপাত ১০-১১ শতাংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ঘোরাফেরা করছে। এর মানে এখনো জিডিপির হিস্যা অনুযায়ী, অর্জিতব্য কর অনাহরিত থেকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ৫-৬ শতাংশের একটা ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। আমাদের জিডিপিতে কৃষির অবদান এখনো বেশি। বেশ কয়েক বছর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এই প্রবৃদ্ধিতে সার্বিকভাবে কৃষির অবদান বেশি। গত ১০-১২ বছরে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হোক, বন্যা হোক বা ব্যাপক ফসলহানি হোক এ রকম বড় বিপর্যয় বা ঘটনা ঘটেনি। ফলে জিডিপিতে  কৃষি অব্যাহতভাবে ঊর্ধ্বমুখী অবদান রেখে যাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কৃষি খাতের অধিকাংশ আয় কর আওতার বাইরে। কৃষির পরে জিডিপিতে অবদান শিল্পের। শিল্প থেকে কর আসছে বা আসবে, তা আহরণের আওতায় আনার প্রয়াস ও পদ্ধতি আছে। জিডিপিতে বড় অবদান সত্ত্বেও কৃষি খাত করের বাইরে থাকায় কর-জিডিপি অনুপাত হারাহারি মতে বাড়ছে না।

‘কৃষি’ করের বাইরে কেন? আমরা মনে করেছি, আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান। যদি এটি করের বাইরে রাখা হয়, তাহলে তা গ্রো করবে। এটিও সত্য, ক্ষুদ্র কৃষককে করের আওতায় আনা বা না আনায়, তেমন কিছু আসে যায় না। কর রাজস্বে তার অবদান বা দেয় খুব একটা নেই। কিন্তু কৃষির উপকরণ সরবরাহ কিংবা উৎপাদিত পণ্য বিপণনকালে সিন্ডিকেট, কর না দেওয়ায় পরোক্ষভাবে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষির নাম করে, কৃষির উপায় উপকরণজাত অনেক আয়বর্ধক কর্মকান্ড বা শিল্প করের বাইরে রয়ে গেছে। গ্রামের কৃষককে তিন লাখ পর্যন্ত করমুক্ত করা হয়েছে, সেটি ঠিক আছে। কিন্তু কৃষকের কৃষি খাতের কিছু কিছু সাব-সেক্টরে ব্যাপক আয় আছে যেমন- মৎস্য চাষ, সার উৎপাদন, সেচ প্রভৃতি। যেগুলো কৃষি খাতের, কিন্তু অর্থকরী শিল্প,  বিরাট অঙ্ক, বিরাট অর্থনীতি। ঘুরানো-পেঁচানো ব্যাখ্যার বদৌলতে কোনো কোনো কর্মকান্ড করের বাইরে রেখে, ক্ষেত্রবিশেষে কর রেয়াত দিয়ে, সাবসিডি দিয়ে সুরক্ষার নামে কর রাজস্ব আয়কে সীমিত করা হচ্ছে। কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যেসব শিল্প গড়ে উঠছে, সেগুলোও কৃষির নাম করে বরং করের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। মৎস্য চাষ, পানি সেচের যন্ত্র থেকে শুরু করে, অনেক কিছুকে বলা হয় কৃষি খাতের। কর জালের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কৃষি খাতে যে সমস্ত ছাড় বা সীমাবদ্ধতা আছে, সেটি ঠিক করে আনলে যারা কর দেওয়া এড়িয়ে যায় কিংবা ফাঁকি দিচ্ছে, সেটি ঠিক করা যাবে। আওতার ব্যাপারে আরেকটি কথা হলো, আমাদের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। এটি ধারাবাহিকভাবে গ্রো করেনি। নব্বই দশক থেকে হঠাৎ বড় হচ্ছে অর্থনীতি। আর বড় হচ্ছে যেসব খাত তা হলো তৈরি পোশাক, আবাসন, নির্মাণ শিল্প, সেবা, বড় বড়  অবকাঠামো নির্মাণ, আর্থিক খাত, টেলিকম, ওষুুধ, প্রভৃতি। আরও কিছু খাত উঠতি। এসব খাতে অনেক মুনাফা হচ্ছে, মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। অথচ এদের অনেকে করের আওতায় ভালো করে আসছে না। কর অবকাশের তালিকা দীর্ঘতর হচ্ছে, শিল্প উৎপাদনক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় আসতে কর অবকাশের সুযোগ ব্যবহার ইতিবাচক প্রবণতায় আসতে বিলম্ব হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পের নাম করে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা এখনো নানান ধাঁচের কর রেয়াত সুবিধা নিচ্ছেন এবং যথেষ্ট কম কর দিচ্ছেন। শুল্ক ও কর রেয়াতের মাধ্যমে উল্টো প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। প্রত্যেক বাড়িওয়ালাকে করের আওতায় আনার কাজ শেষ হয়েও, এখনো শেষ  হয়নি এবং অনেককেই করের আওতায় আনা হয়নি। যেখানে যেখানে অর্থনীতি দৃশ্যমান হচ্ছে বা বড় হচ্ছে, সেগুলো আসলে করের আওতায় আনার ব্যাপারে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের  প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার দুর্বলতা বা অপারগতার সুযোগে রাজস্ব আয় অর্জিত হচ্ছে না।  আওতার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক একটি বিষয়ে অবশ্য অনেক উন্নতি হয়েছে, চাকরিজীবীদের সবাই করের আওতায় এসেছেন। আগে অনেকেই কর দিতেন না। দিতে চাইলেও তাগিদে ঘাটতি বা কমতি ছিল। এখন সরকারি-বেসরকারি সবাইকে কর দিতে বলা হচ্ছে। না দিলে, অফিস থেকে বেতন না দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। কর মেলায় দেখা যাচ্ছে, অনেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সহজে কর দিতে ভিড় জমাচ্ছেন। কর সংস্কৃতিতে এটি একটি ইতিবাচক এবং আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি।

কখনো দেখা যাচ্ছে, অফিসে কর্মীর কাছ থেকে কর কাটা হচ্ছে ঠিকই, সেই অর্থ সরকারি খাতে নিয়মিত যথাযথভাবে দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হচ্ছে না। অনেক প্রমাণ পাওয়া গেছে, উৎসে কর যারা কেটে নিয়েছে তারা ঠিকমতো কোষাগারে তা জমা দিচ্ছেন না, দিলেও বেশ বিলম্ব করছেন। অর্থাৎ এখানেও উৎসে কর কর্তনকারীর দায়িত্ববোধের ও কর বিভাগের তরফে মনিটরিংয়ের একটা দুর্বলতা রয়ে গেছে। আওতার আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, যাদের আয় বেশি এমন বড় বড় প্রফেশনের লোকজন ‘ন্যায্য দেয়’ করের আওতায় নেই। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উকিলসহ পেশাজীবী গোষ্ঠীর এখনো অনেকেই কর দেন না, আবার যারা বা দেন, সঠিক বা ন্যায্য পরিমাণে দেন না। এখানে করদাতা এবং কর আহরণকারী উভয় পক্ষের দায়দায়িত্ব যথাযথভাবে পরিপালিত হচ্ছে না। একই কথা প্রযোজ্য ভ্যাটের ক্ষেত্রেও। পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতা ভ্যাট দিচ্ছে। সার্ভিস নেওয়ার সময় ভ্যাট দিচ্ছে। কিন্তু যারা ভ্যাট নিচ্ছে, তারা রাষ্ট্রকে দিচ্ছে না। জনগণ ভ্যাট দিচ্ছে, অথচ সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সময়মতো কিংবা আদৌ যাচ্ছে না। ফলে নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্টতই উল্লেখ রয়েছে, কীভাবে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো এবং সরকারি কোষাগারে জমা নেওয়া নিশ্চিত হয়। ২০১২ সালে জারি হওয়া ভ্যাট আইনটি ২০১৯ এর আগে পুরোপুরি প্রবর্তন বা প্রয়োগ করা যায়নি। মাঝখানে এক দশক পার হলো। এরই মধ্যে অনেক কিছু বদলে গেছে। এই এক দশকে মানুষ পুরনো হারে বা পদ্ধতিতে ভ্যাট দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নতুন আইন প্রবর্তিত না হওয়ায় বাড়তি রাজস্ব ঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ ভোক্তা সবাই ভ্যাট দিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর আশাবাদ ব্যক্ত করা হয় বাজেটে নতুন ভ্যাট আইন প্রবর্তন হলে অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট বাবদ আয় হবে। এই বাড়তি আয় হবে ধরে নিয়ে কিন্তু ব্যয়ের বাজেট করা হয়। বাড়তি ভ্যাট অর্জিত না হলেও ঐ পরিমাণ ব্যয়ের বাজেট কিন্তু কাটছাঁট করা হয় না। ব্যাপক পরিমাণ সমভাব্য রাজস্ব ব্যবসায়ীদের কাছে কিংবা ভ্যাটদাতা পর্যায়ে অনাদায়ী রয়ে যায়।

পর পর কয়েক বছর হিসাব করলে অন্তত ৮০-১০০ হাজার কোটি টাকা। এই রাজস্ব কোথায়? ভ্যাট পণ্য বা সেবা গ্রহণকারীর কাছ থেকে কাটা করের টাকা, কিন্তু সেটি রাষ্ট্র পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কর ব্যবস্থাপনাকে জবাবদিহিমূলক করা যাচ্ছে না। আওতা সংক্রান্ত ওপরে উল্লিখিত জটিলতা বা সীমাবদ্ধতার কাদায় কর আয়ের বিপুল সম্ভাবনা আটকে যাচ্ছে, অপারগতার অবয়বে লাপাত্তা হচ্ছে। জবাবদিহিবিহীন অবয়ব অবকাঠামোকে স্বশাসিত, স্বয়ংক্রিয় ও স্বপ্রণোদিত করা যাচ্ছে না। কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ার ক্ষেত্রে, এটি অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।  বড় বড় প্রকল্পে শুল্ক ও কর ছাড়ের প্রভাবেও, কর জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির সম্ভাবনা ও সুযোগকে সীমিত করে দিচ্ছে।

লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত