প্রচ্ছদ রচনা

এআইয়ের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত, কী ভাবতেন ঠাকুর

আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম

রবীন্দ্রসংগীত শুনছিলাম। ‘আয় তবে সহচরী হাতে হাত ধরি ধরি’। ১৮ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ এই গান লিখেছিলেন। কিন্তু গানটা গাইছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সুরেলা নারীকণ্ঠে এআই বিনিয়ে বিনিয়ে গাইছে। এই গান কৌশিকী চক্রবর্তীর গলায় অসাধারণ, কিন্তু এআইয়ের গলার গাওয়াটাও শুনতে অসুবিধা হচ্ছে না। একেবারেই অমানবীয় বা যান্ত্রিক শোনাচ্ছে না।

এআইয়ের গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীতটা শুনতে অস্বস্তি হয় না বলেই চিন্তায় অস্বস্তি বাড়ে।

ওস্তাদেরা যুগ যুগ সাধনা করে যে বিদ্যা আয়ত্ত করেন—হোক তা গান বা বিজ্ঞান—এখন এআইয়ের কল বা মেশিন তা অবলীলায় নকল করছে। এক নিমিষে উগরে দিচ্ছে। ওস্তাদির যুগ কি তাহলে শেষ? আত্মা ও যন্ত্রের মধ্যে তাহলে সম্পর্ক কী দাঁড়াচ্ছে? ওস্তাদ তাহলে কে? সবাই যদি ‘সুনো’ অ্যাপ দিয়ে গান বানায় আর ‘সোরা’ অ্যাপ দিয়ে ভিডিও বানায় তাহলে শিল্প, মুনশিয়ানা, ওস্তাদির এলাকা কোথায়? কোনো এক অভাবিত যুগান্তর চলে এলো?

১৯৯৯ সালে মাকসুদুল হক একবার ‘না চাহিলে যারে পাওয়া যায়’ গানটি নতুন ধরনে গেয়ে রবীন্দ্রপ্রেমীদের ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন। ২০১৩ সালে এক টকশোতে মাকসুদের সঙ্গে এক বিতর্কে মিতা হক প্রশ্ন তোলেন, রবীন্দ্রনাথ যেখানে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সর্বাঙ্গসুন্দর সেখানে রবীন্দ্রনাথে কিছু যুক্ত করা যায় কেমনে, কেউ যদি নিজেই রবীন্দ্রনাথ ২ না হয়? প্রয়াত শিল্পী মিতা হক ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের ভক্তিময়ী সাধক, যার আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের মহিমা বা অরা-র প্রতি নিবিষ্টতা ও জযবার অভিব্যক্তি ছিল প্রবল। তার স্মৃতি স্মরণ করে আজ এআইয়ের জমানায় রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে প্রযুক্তি ও জমানার সম্পর্ককে হয়তো নতুন করে ভাবার অবকাশ আছে।

প্রযুক্তির সঙ্গে হয়তো শিল্প ও সত্তার একটা সম্পর্ক আছে। এখন যেমন এআই এসে সব পাল্টে দিচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের জমানাতেও এ রকম একটা যুগান্তর ঘটেছিল। তাই রবীন্দ্রনাথ নতুন পন্থায় ভাবতে আশকারা পেয়েছিলেন শিক্ষা, সত্তা ও অভিব্যক্তির সম্পর্ক নিয়ে। সেই গল্পই এখানে করব। তবে সে আলাপে যাওয়ার আগে রবীন্দ্রনাথের ‘তোতা-কাহিনী’ গল্পটা একটু মনে করিয়ে দিই। গল্পের কাহিনি এ রকম :

রাজার এক পাখি। পাখির যা ফিতরত, সে কেবল নাচে গায় চেঁচিয়ে বেড়ায়। রাজার পছন্দ হলো না পাখির এই বেতরিবত ব্যবহার। তিনি পাখিটাকে শিক্ষিত করতে বললেন। রাজার হুকুম শুনেই পণ্ডিতের দল রাশি রাশি কেতাব ঠেসতে লাগলেন পাখিটার মুখে। পাখি না পারে লাফাতে, না ডানা ঝাপটাতে, না চেঁচাতে। শেষে কেতাবি শিক্ষার চোটে পাখিটা মরেই গেল।

এই গল্পের তাৎপর্য কী? এই গল্পের শানে নজুল মূলত রবীন্দ্রনাথের এই প্রশ্ন যে, বিদ্যা বা শিক্ষা আসলে কী জিনিস? তা কি মানুষের ফিতরত, সহজ বা স্বভাবের আদল, নাকি কেতাব বা পুঁথিগত সংস্কারের চর্বিতচর্বণ? বিদ্যা কি সহজ স্বভাবের অনুসারী নাকি তা কেতাবি সংস্কারের বিষয়? সহজ আর সংস্কার দুইটা শব্দ বাংলা ভাষায় চণ্ডীদাস বা লালনে পাওয়া যায়।

রাজার পাখির গল্পটা রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন রোমান্টিক শিক্ষাতত্ত্ব খোলাসা করতে। আঠার শতকের আলোকায়ন বা এনলাইটেনমেন্টের জমানায় যন্ত্রসভ্যতা ও যুক্তিবাদের যে উল্লম্ফন ঘটে, তার প্রতিক্রিয়ায় যন্ত্র ও যান্ত্রিক যুক্তিবাদের খপ্পর থেকে মানুষের সহজ স্বভাবকে পুনরুদ্ধার করার যে তাগিদ জাগে তাকেই রোমান্টিক চিন্তা বলা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ কিয়দংশে এই চিন্তার গ্রাহক ছিলেন।

সহজ ও সংস্কারের সম্পর্ক সিধা নয়। তারা জড়াজড়ি করে থাকে। শিল্পকলা ও শিক্ষা প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ মোটাদাগে রোমান্টিক অর্থে সহজবাদী বা স্বভাববাদী ছিলেন। কিন্তু এই যে সহজ বা স্বভাবের দিকে যাত্রা, এই যাত্রা সম্ভব হয়েছিল কিছু ‘সংস্কারে’র ফলে। প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, জনপরিসর ইত্যাদির যে সংস্কার উপনিবেশের জমানায় ঘটেছিল, তারই ফলে ব্যক্তিসত্তার নতুন ধরনের বিন্যাস ও বিকাশ ঘটেছিল। এই জমানায় রবীন্দ্রনাথের পয়দায়েশ। নতুন যুগের সন্তান হিসাবে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যা বা শিল্পের নতুন বিন্যাসের কথা ভেবেছিলেন। পণ্ডিতি, ওস্তাদি, ঐতিহ্য, পরম্পরা, তুরাস-তকলিদের চর্বিতচর্বণ ছেড়ে তিনি শিল্পের মধ্যে নতুনের আবাহন করতে চাইলেন। এই নতুন বিন্যাসের দুটি বৈশিষ্ট্য হলো গণতন্ত্রায়ন [ডেমোক্রেটাইজেশন] ও ব্যক্তিকরণ [ইন্ডিভিজ্যুয়েশন]।

রবীন্দ্রনাথ শিল্প বা শিক্ষার পরিসরে ব্যক্তির বিকাশ চাইলেন এবং এক ধরনের গণতন্ত্রও কামনা করলেন। ওস্তাদির নিগড়ে বাঁধা পড়তে তিনি নারাজ। নতুন ব্যক্তিসত্তা ও জনপরিসরের বিকাশের মুখে রবীন্দ্রনাথ শিল্পের নতুন বিন্যাসের সন্ধান করতে গিয়ে ওস্তাদি এবং পরম্পরাবাহী বিদ্যার প্রতিকল্প হিসেবে ‘আনাড়ি’র ধারণাটা সামনে আনলেন। নিজেকে তিনি ঘোষণা দিলেন আনাড়ি বলে। আমজনতার অংশ হিসেবে আনাড়ি সৃষ্টিশীলতাকে একটা ডেমোক্রেটিক রেটোরিক আকারে আঁকড়ে ধরলেন তিনি। লিখলেন, ‘বর্তমান যুগের প্রধান সর্দার হচ্ছে ডিমোক্রেসি—অতএব, এ যুগে আনাড়িরও কথা বলিবার অধিকার আছে। এমন কি, তার অধিকারই বেশি।’ এই আনাড়ি যদি নাও জানে, তার ঘটে বিদ্যা কমও থাকে, তাতেও ক্ষতি নাই।

যান্ত্রিক শাস্ত্রের বিরুদ্ধে রবি দোহাই মেনেছেন আত্মস্থ অভিজ্ঞতার। ‘আমার অভিজ্ঞতায় যাহা মিলিয়াছে তাহা শাস্ত্রের সঙ্গে মেলে না।’ (‘সঙ্গীতের মুক্তি’) ওস্তাদিকে যান্ত্রিকভাবে আয়ত্ত করার বদলে আনাড়ি হওয়াই হতে পারে স্বকীয়তার দরজা।

বুঝে শুনেই তিনি নিজেকে আনাড়ি হিসাবে গড়ে তোলেন, বলছেন রবীন্দ্রনাথ। আত্মজৈবনিক প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন তাঁর ছোটবেলায় তাদের বাসায় ভারতের নানা এলাকা থেকে ওস্তাদ আসতেন গান শেখাতে। তাঁর ভাইরা শিখতেন। কিন্তু তাঁকে শেখাতে এলেই তিনি দৌড়ে পালাতেন। ‘ওস্তাদিয়ানার জালে বাঁধা’ পড়তে চাননি। বাইরে থেকে শুনে শুনে কিছু কিছু শিখেছেন মাত্র। (‘গীতালি’, ‘আলাপ-আলোচনা’)কেন এই পলায়ন? তিনি পুনরাবৃত্তি করতে চান না, তাই। ‘ক্ল্যাসিক্যাল আমাদের কাছে দাবি করে নিখুঁত পুনরাবৃত্তি।’ (‘নিখিলবঙ্গ সঙ্গীত সম্মেলন’) সে রকম করাটা রবীন্দ্রনাথের মতে জড়পদার্থের স্বভাব। ওস্তাদদের রক্ষণশীলতার মূল্য পুরনো বিদ্যাধারাকে রক্ষায়, ব্যাকরণের বিশুদ্ধতা বাঁচানোয়। ‘চিরপ্রচলিত প্রথার কাঠামোর মধ্যে শ্রেণিবদ্ধভাবে ধরে রাখার কাজে।’ (‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীতশিক্ষা’) তাই ওস্তাদরা ‘শাসনকেই বড়ো বলিয়া জানে, প্রাণকে নয়।’

শাসন ভেঙে স্বভাবকে মুক্ত করতে হবে, তবেই ব্যক্তির মুক্তি—এটাই রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাবনা। ওস্তাদি সংগীত বনাম স্বভাবজাত সংগীতের তফাৎ বোঝাতে রবীন্দ্রনাথ বাংলা গান ও হিন্দুস্তানি গানকে আলাদা করেছেন। হিন্দুস্তানি সংগীতে তিনি দেখেছেন নিছক সুরের যান্ত্রিক কালোয়াতি, কৌশলের অর্থহীন ওস্তাদি। এই যান্ত্রিকতার চূড়ান্ত স্ফুর্তি দেখা যায় যন্ত্রসংগীতে, অর্থাৎ মানুষের জবান মুছে যেখানে শুধুই সুরের যান্ত্রিক খেলা। সংস্কৃত ভাষার মতোই এই সংগীতশাস্ত্রও মৃত, নিষ্প্রাণ মমির মতো দেহ মাত্র। এই ‘নিজীব’ ব্যাকরণসর্বস্ব ওস্তাদি গান ‘বৈঠকখানার ভোগবিলাস’ মাত্র, তাতে জনগণের প্রাণের সুর নাই। এই গানে সুরের ওপর জোর দিতে গিয়ে ভাব ও অর্থ হারিয়ে ফেলে। সুরপ্রধান হিন্দুস্তানি গানের আজগুবি লিরিকের মজার মজার কিছু বিদ্রূপাত্মক উদাহরণ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ নানা লেখায়—যেমন : ‘পরজ রাগিণীতে একটা হিন্দি গান জানতুম, তার বাংলা তর্জমা এই—কালো কালো কম্বল, গুরুজি, আমাকে কিনে দে, রাম-জপনের মালা এনে দে আর জল পান করবার তুম্বী।’ (‘সুর ও সংগতি’)

রবীন্দ্রনাথের প্রশ্ন হলো, এগুলি কীরকম আর্ট? আর্টের মূল কাজ ওস্তাদি নামক যান্ত্রিক দক্ষতার কচকচি নয় রবীন্দ্রনাথের কাছে। বরং ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ, মুক্তি, স্বাধীনতা। স্রষ্টা-পাঠকের পারস্পরিক ‘হৃদয়বেদ্যতা’ই গানের উদ্দেশ্য। সেখানে ওস্তাদের যে আত্মস্থ বিদ্যার আড়ম্বর সেটা গোলমাল তৈরি করে।

ওস্তাদের সমস্যা কী? কোথায় সে ছোট? রবির মতে, ‘ওস্তাদির চেয়ে বড়ো একটা জিনিস আছে, সেটা হচ্ছে দরদ। সেটা বাইরের জিনিস নয়, ভেতরের জিনিস। সেটা হলো সহৃদয়হৃদয়বেদ্যতা।’ (‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীতশিক্ষা’) হৃদয়ের ভাব ও স্বাভাবিকতাই শিল্পের প্রধান চরিত্র হওয়া উচিত। হিন্দুস্তানি গানে হৃদয়ের স্ফুর্তি নাই। সেই গান শিবের মতো বিশুদ্ধ, নিষ্ক্রিয় ও অচল। বিপরীতে বাংলা গান হলো ‘উমা’ যাতে প্যাশন বা সংরাগ আছে। আছে ভাব ও কাব্যরস, আছে ব্যক্তির হৃদয়প্রসূত জবানি (‘আলাপ-আলোচনা’)।

গানে সহজ ও সংস্কার দুই-ই থাকে। যেসকল দ্বিভাজন [বাইনারি] আশ্রয় করে রবীন্দ্রনাথ ভাবতেন সেগুলির মধ্যে তিনি উপায়ের ওপর উদ্দেশ্যকে, কৌশলের ওপর কলাকে, যন্ত্রের ওপর আত্মাকে, পুনরুৎপাদনের ওপর নতুন সৃষ্টিকে, সংস্কারের ওপর সহজকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু হৃদয়, সহজ বা আত্মাকে গুরুত্ব দিলেও, কলায় উপায়, উপকরণ, কৌশল, যন্ত্র, ব্যাকরণ ইত্যাদিকে তিনি এড়াতেও পারেননি। গানে ও কাব্যে ছন্দ ও রাগরাগিণীর ব্যাকরণ বা ‘দস্তুর’কে অস্বীকার করা তো অসম্ভব। তাহলে রাগরাগিণীর ব্যাকরণের সঙ্গে হৃদয়ের কিমিয়া ঘটবে কীভাবে? বিষ আর সুধা আলাদা হবে কীভাবে?

রবীন্দ্রনাথের সমাধান হলো, পুরনো উপকরণগুলিকে ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোষ বা মডিউল করে তাদের নিয়ে নানা সুর-সংস্থানের কাটুমকুটুম করতে হবে। এটাকেই স্টিগলার বলেন উপরি-পয়দায়েশ [এপিফাইলোজেনেসিস]। রবীন্দ্রনাথের মতে, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে রাগরাগিণীগুলি একেকটা আস্ত ফালির মতো, কিন্তু ঠাটগুলি যদি ইটের মতো হয় তাহলে ইট বা কোষের মতো সাজিয়ে সেগুলিকে নানা রূপ দেওয়া যায়। ইটের মতো ‘দানাবাঁধা সুরগুলিকে নানা আকারে সাজাইয়া রচয়িতা গান বাঁধেন।’ (‘সঙ্গীতের মুক্তি’)

ফলে বিদ্যমান উপকরণ বা পরম্পরাবাহিত জিনিসের নবায়িত [পুনঃ] উৎপাদন হলো রবীন্দ্রনাথের মূল দাবি। তাহলেই গানে প্রাণ থাকবে এবং তা সমাজের সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে, পরিবর্তন হবে যেন তা ‘সমাজের উপর নিজের প্রভাব বিস্তৃত করিতে পারে ও তাহার উপরে সমাজের প্রভাব প্রযুক্ত হয়।’ (‘সঙ্গীত ও ভাব’) অতীতের কাছে ঋণ ও দাস্যবৃত্তি আমাদের নিজেদের আত্মপ্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ‘আমি জয়জয়ন্তীর কাছে এমন কী ঘুষ খাইয়াছি যে তাহার এত গোলামি করিতে হইবে?’ (‘সঙ্গীত ও ভাব’)

রবীন্দ্রনাথের গরজ হলো ‘যা কিছু আছে’ তাই যেন ‘আমাদের উপর প্রভুত্ব’ না করে, বরং আমরা ‘তার উপর একটু হাত চালাইতে’ পারি। শাস্ত্রছাড়া ও বাঁধনহারা হলেই আত্মপ্রকাশ ও সৃষ্টির উদ্যম। রবি বলছেন, ‘এইরূপ স্বাতন্ত্র্যের উদ্যমকেই ইংরেজিতে রোমান্টিক মুভমেন্ট বলে।’ (‘সঙ্গীতের মুক্তি’) পুরনো পুনরুৎপাদন বা পুনরুৎপত্তি না করে তা থেকে ‘নববৃষ্টির প্রেরণা’ পেতে হবে। তানসেন শিখতে হবে ‘তাঁদের সুরের শ্রাদ্ধ’র জন্য নয় বরং ‘নবজন্ম আবাহন করতে।’ (‘আলাপ-আলোচনা’) ওস্তাদের আত্মস্থ বিদ্যার পুনরুৎপাদনের চেয়ে জীবন ও যুগের উপযোগী নতুন কৌশল-গ্রাহী বিদ্যাই গুরুত্বপূর্ণ। (‘আলাপ-আলোচনা’)

রবীন্দ্রনাথের এই রোমান্টিক চিন্তা ব্যক্তির বিকাশের সাফাই হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই চিন্তার ফাঁকটা এখানে যে তা ঘট, স্বভাব, আত্মসত্তা বা সহজকে শাশ্বত ধাত আকারে ভেবে নেয়। কিন্তু আদতে, সহজ আগাম কোনো শাশ্বত স্বভাব আকারে ব্যক্তির মধ্যে নিহিত থাকে না। বরং যেকোনো পট (সংস্কার, প্রযুক্তি, মাধ্যম, কারুবন্ধন, শাস্ত্র, সংশয় বা আধার) যে আধেয়কে চাপা দিয়ে রাখে সেটাই সহজ। এ কারণেই ব্যক্তির জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সহজের জন্ম হয় না, বরং সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গেই সহজের জন্ম হয়।

মজার ব্যাপার হলো, রবীন্দ্রনাথের এই যে সহজ ও স্বভাবের অযান্ত্রিক-অকৃত্রিম অভিব্যক্তির ধারণা এবং কালোয়াতি করা পুনরুৎপাদনমূলক ওস্তাদদের প্রতি বিরক্তি, তার এই নতুন চিন্তা সম্ভব হয়েছিল কলের আবির্ভাবের দ্বারা। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, সবকিছু ভুলে গেলেও লোকে তার গান ভুলবে না। মজা করে এখানে বলে রাখা যায় যে, তার গানকে অমন অবিস্মরণীয় করার ক্ষেত্রে সহায় হয়ে এসেছিল যন্ত্র।

ওস্তাদদের আত্মস্থ বিদ্যার যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি ও পুনরুৎপাদনের বিরোধিতা করা রবীন্দ্রনাথ নিজের সহজ ও হৃদয়প্রসূত ভাবকে যন্ত্র বা কলে বিধৃত করেছিলেন। কেউ কেউ লিখেছেন যে, ১৮৯১ সালে জগদীশচন্দ্র বসু প্রথম যে গান ফোনোগ্রাফ যন্ত্রে রেকর্ড করেন সেটা ৩১ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথেরই গান। গ্রামোফোনের বিকাশ হলে পরে শিল্পীরা যেন বিনা অনুমতিতে তার গান রেকর্ড করা বন্ধ করেন এ জন্য উকিলের সহায়তাও নিয়েছিলেন তিনি, এবং লাভ করেছিলেন গীতিকার হিসেবে প্রথম সম্মানী।

নিজের গান রেকর্ড করার দ্বারা রবীন্দ্রনাথ আসলে কী করলেন? গায়কের আত্মস্থ বিদ্যার যে কর্তাসত্তা সেটার ওপরে রচয়িতার সার্বভৌমত্ব জারি করলেন রবীন্দ্রনাথ, আর এই কাজে সহায় হলো ভাল্টার বেনিয়ামিন কথিত ‘কলের নকল’ [টেকনোলজিক্যাল রিপ্রডিউসিবিলিটি]।

রবীন্দ্রনাথ সোৎসাহে লিখেছেন যে, ‘বিশেষ বিশেষ গান শুনিবার জন্যই এখনকার লোকের আগ্রহ, রাগরাগিণীর জন্য নয়। সেই-সকল বিশেষ গানের জন্যই গ্রামোফোনের কাটতি।’ (‘সঙ্গীতের মুক্তি’) একদিকে গায়কের যান্ত্রিক দক্ষতার বিরক্তিকর চালিয়াতি আরেকদিকে গ্রামোফোনের নিঃশর্ত যান্ত্রিক আনুগত্য। এই দুই নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ঈষৎ টানাপড়েন পাওয়া যায় যখন তিনি বলেন যে গান গাওয়ার বেলায় ‘গায়কের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অগত্যা মানতেই হবে’। গায়কের ‘ব্যাখ্যা রচয়িতার অন্তরের সঙ্গে না মিলতেও পারে’, কারণ ‘গায়ক তো গ্রামোফোন নয়।’ (‘ছিন্নপত্রাবলী’)

তবু রবীন্দ্রনাথের যে হৃদয়বেদ্যতার সাধনা, সেখানে গায়ক যেহেতু গৌণ আর রচয়িতা মুখ্য, ফলে গানের মধ্যে গায়কের হৃদয় বা স্বভাবের প্রক্ষেপের এলাকা কম রেখেছেন তিনি। রচয়িতারই শাসন জারি করেছেন তিনি। ফলে গায়কীর অবিকল পুনরুৎপাদনের জন্য বিশ্বভারতীসহ এক প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্রয়ের নিয়ন্ত্রণ কায়েম হলো। নজরুলের গানেরও স্বরলিপি হয়েছিল, তবে শোনা যায় যে, ইন্দুবালা, আঙ্‌গুরবালারা নজরুলের গান আসরে গাওয়ার সময় কিছুটা সুরবিহার [ইম্প্রোভাইজেশন] করে গাইতেন। রবীন্দ্রনাথের গানে সুরবিহার করায় বিধিনিষেধ ছিল।

মোদ্দা কথা দাঁড়াচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ গান তথা কলাবিদ্যা বা ললিতকলার যে গণতন্ত্রায়ন, ব্যক্তিকীকরণ, আনাড়িকরণের প্রবক্তা ছিলেন, সেটা সম্ভব হয়েছিল একদিকে ওস্তাদ নামক ঘটপটের মামুলিকরণের দ্বারা এবং অন্যদিকে মুদ্রণযন্ত্র, ফোনোগ্রাফ, গ্রামোফোন ইত্যাদি প্রযুক্তির বিকাশের ফলে।

অর্থাৎ আত্মস্থ বিদ্যার যন্ত্রস্থকরণের দ্বিমুখী ফল ফলেছিল। এ যেন এক সুধাবিষ বা সুধামৃত বা বিষুধ। একই সঙ্গে সুধা বা ওষুধ এবং বিষ বা গরল। এই যন্ত্রের বিকাশের ফলে ওস্তাদি পেল লয়, আনাড়ির হলো জয়, এবং অভিব্যক্তিমূলক গানের হলো অতিশয়। নতুন প্রযুক্তি বা কারুকৌশলের সমাবেশ কীভাবে নতুন ধরনের ব্যক্তিকীকরণ সম্ভব করে তোলে, তার দারুণ নমুনা এটা।

আজ আমরা এআইয়ের যুগে এসে ঠেকেছি যখন গানের বাণী, সুর, গায়কী, পরিবেশন সবকিছুই যন্ত্রায়িত হয়ে গিয়েছে। এই যন্ত্র মেকানিক্যাল নয় বরং ইলেকট্রিক্যাল বা সাইবারনেটিক। অর্থাৎ ওস্তাদের মতো যান্ত্রিক পুনরুৎপাদন করে না সে, বরং সৃষ্টিশীল পুনরুৎপাদনও তার আয়ত্ত।

নব্বইয়ের দশক বা শূন্য দশকে মাকসুদের মতো গায়ককে যেমন তার সৃষ্টিশীল কেরদানির জন্য নিশানা করা গিয়েছিল, এআইয়ের যুগে সেই সুযোগও হয়তো কমে আসবে। এআইয়ের যে যন্ত্রস্থ ওস্তাদি, তাকে আশ্রয় করে মানুষ কি নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা নতুন কোনো আনাড়ি স্বভাবকে আরও খোলাসা করতে পারবে? নতুন কোনো সহজ, নতুন কোনো গণতান্ত্রিকতা কি সম্ভবপর হবে? জন্ম নেবেন রবীন্দ্রনাথ-তুল্য নতুন কোনো অরা-সম্পন্ন শিল্পস্রষ্টা? নাকি অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাস পেয়ে মানুষের ছাপড়িকরণ ঘটবে? আজ রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকলে কী ভাবতেন এই প্রশ্ন নিয়ে?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত