বেভারেজে বাড়তি কর, চাপে ভোক্তা

আপডেট : ০৯ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

বিদেশি বিনিয়োগ, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্ব আহরণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বেভারেজ বা পানীয় খাত, গভীর সংকটের মুখোমুখি। এফএমসিজি খাতের এই শিল্পের ওপর করের বোঝা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পানীয়র খুচরা মূল্য সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বেভারেজ শিল্প খাতে জড়িতদের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে কোমল পানীয়ের ওপর আরোপিত মোট করভার দাঁড়িয়েছে, আনুমানিক ৫৩ শতাংশে যা কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বরং বিশ্বের মধ্যেও অন্যতম সর্বোচ্চ। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়, এই করের পার্থক্য আকাশছোঁয়া। উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতে বেভারেজ শিল্পে করের হার ৪০ শতাংশ ও নেপালে ৩৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনামের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে, এই করভার মাত্র ২০ শতাংশের কাছাকাছি। উচ্চ করের এই বিশাল ব্যবধান, দেশি উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে ভোক্তাদের ওপর তারা বাড়তি মূল্যের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।

গত তিন অর্থবছরে বেভারেজ শিল্পের ওপর, ধারাবাহিকভাবে করের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আগে এই খাতে ন্যূনতম কর ছিল, মোট বিক্রির ওপর শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশ যা ছিল অন্যান্য শিল্পের সমান। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হঠাৎ করেই তা ৫ গুণ বাড়িয়ে ৩ শতাংশ করা হয়। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সম্পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেভারেজ কনসেনট্রেটের ওপর কাস্টমস ডিউটি ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর সঙ্গে প্রতি স্তরে ১৫ শতাংশ ভ্যাট তো আগে থেকেই কার্যকর রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফিকির (এফআইসিসিআই) মতে, ন্যূনতম কর ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি করা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও অযৌক্তিক। এই অস্বাভাবিক করনীতির ফলে, কোম্পানিগুলো লোকসান এড়াতে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে যা সরাসরি ভোক্তাদের পকেটে আঘাত হেনেছে। অনিশ্চিত ও উচ্চ করনীতির কারণে, নতুন বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন এবং বিদ্যমান বিনিয়োগগুলো এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভিয়েতনামে এফডিআই জিডিপির ৪ শতাংশের ওপরে হলেও, বাংলাদেশে তা মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ; যার অন্যতম কারণ হিসেবে এই জটিল করব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়।

সরকার কর বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই শিল্প থেকে, সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছিল ১ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ন্যূনতম কর ৫ গুণ বাড়ানোর পর দেখা যায়, রাজস্ব আয় ২০ শতাংশ কমে ১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও এই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত ছিল। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাড়তি করের কারণে দাম বেড়ে যাওয়ায়, বাজারে পানীয়র চাহিদা কমে গেছে। ফলে উৎপাদন ও বিক্রি হ্রাস পাওয়ায় সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, অতিরিক্ত কর আরোপ রাজস্ব বৃদ্ধির কার্যকর উপায় নয়। বর্তমানে এই খাতের ব্যবসার আকার ১০ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। বেভারেজ শিল্পের জন্য ঘোষিত সরকারি নীতিমালার মধ্যেও ব্যাপক অসামঞ্জস্য লক্ষ করা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় উৎপাদনের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হলেও, এর পরের বছর (২০২৫-২৬) আমদানি করা প্রস্তুত পানীয়ের ওপর সম্পূরক শুল্ক ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে। এটি স্থানীয় শিল্পকে উৎসাহিত করার ঘোষিত নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের অন্যায্য ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে কোমল পানীয়ের তুলনায় আইসক্রিমে চিনির মাত্রা বেশি থাকলেও, সেখানে সম্পূরক শুল্ক কমানো হয়েছে।

উচ্চ করের চাপে বৈধ কোম্পানিগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন বাজারে অবৈধভাবে বিদেশি বেভারেজ ও এনার্জি ড্রিংকস প্রবেশ করছে। যার ফলে সরকার আরও রাজস্ব হারাচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অনেক সময় স্থূলতা বা স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বলে, এই খাতে কর বাড়ানো হয়। তবে পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশে বছরে মাথাপিছু কোমল পানীয় গ্রহণের হার মাত্র ৮ দশমিক ৪ গ্লাস এবং বার্ষিক ক্যালরি গ্রহণের ক্ষেত্রে এর অবদান ০.০৫ শতাংশের কম। ফলে স্থূলতার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা নগণ্য। ফিকির মতে, উচ্চ করের কারণে সাধারণ মানুষ এখন বোতলজাত পানির মতো প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেও চাপের মুখে পড়ছে। টাকার অবমূল্যায়ন এবং কাঁচামালের খরচ বৃদ্ধির ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এই শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। এই বিশাল কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ রক্ষা করতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর কাঠামো যৌক্তিক করার দাবি জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

তাদের প্রধান প্রস্তাবগুলো হলো মোট বিক্রির ওপর ন্যূনতম কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনা, সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা, বেভারেজ কনসেনট্রেটের ওপর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে পুনরায় ১০ শতাংশ করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে বোতলজাত পানির ওপর থেকে সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা। বিনিয়োগকারীদের মতে, এই কর সমন্বয় করা হলে, বাংলাদেশকে থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগিতামূলক বাজারের কাতারে নেওয়া সম্ভব হবে। করের হার যৌক্তিক করা হলে পণ্যের দাম কমবে। এর ফলে বাজারে চাহিদা ও উৎপাদন বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে করের ভিত্তি বড় হওয়ার মাধ্যমে, এটি সরকারের রাজস্ব আয় বহুগুণ বৃদ্ধি করবে এবং একটি স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করবে। বিশ্লেষকদের মতে, চড়া মূল্যস্ফীতির সময়ে এ ধরনের কর বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত