বিপন্ন শৈশব চাই মানবিক অধিকার

আপডেট : ০৯ মে ২০২৬, ১২:০৫ এএম

মানবিক অধিকার হারিয়ে অভিযুক্ত মায়ের সঙ্গে কারাগারে যেসব শিশু বড় হচ্ছে তাদের শৈশবকাল বিপন্ন। তারা মায়ের সোহাগ পেলেও, মুক্তজীবনের যে আনন্দ পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে আইনে বলা হয়েছে, ‘ভিন্নতর যা কিছুই থাকুক না কেন তাদের বিদ্যমান আইনের আওতায় রাখতে হবে।’ কারাবিধিতে আছে, ৬ বছর পর্যন্ত মায়ের সঙ্গে শিশুরা থাকতে পারে। কিন্তু আইন প্রয়োগে ২০১৩ সালের শিশু আইনের প্রতিফলন দেখা যায় না কারাগারে। হত্যা মামলার আসামি হিসেবে নিম্ন আদালতে ফাঁসির দ-াদেশপ্রাপ্ত ফেনীর সোনাগাজীর কামরুন নাহার মনির ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। মনি তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে কারাবরণ করলেও তার মামলাটি হাইকোর্টে ওঠেনি ৬ বছরেও। মনি এখন তার শিশুকে নিয়ে কাশিমপুরের মহিলা কারাগারের কনডেমড সেলে আছেন। কারা প্রকোষ্ঠের নির্জন সেলে মনির সঙ্গে বড় হচ্ছে তার সন্তান। সে কেবল কারাগারের চার দেয়ালই দেখে বড় হচ্ছে, মুক্তজীবনের যে স্বাদ পাওয়ার মানবিক অধিকার তা সে পাচ্ছে না। সারা দেশের কারাগারগুলোতে বন্দি বিপন্ন জীবনযাপন করছে ২৯৯ শিশু। প্রতিনিয়তই ব্যাহত হচ্ছে তাদের শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারাপাত।

কারাবিধি অনুযায়ী ৬ বছর পর্যন্ত শিশুদের রাখতে পারেন মায়েরা। কেন্দ্রীয় কারাগারগুলোতে শিশুদের তেমন কোনো বিনোদন ও শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। নেই স্কুলিং। নেই শিক্ষক। কিছু শিক্ষিত অভিযুক্ত আসামিকে দিয়ে শিশুদের শিক্ষা কাজ চালানো হচ্ছে, যা অনিয়মিত। নিষ্পাপ শিশুরা কেন কলুষিত পরিবেশে বড় হবে এই প্রশ্ন তুলেছেন বিএইচআরএফের চেয়ারপারসন এলিনা খান। আর এই প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা নূর খান লিটন বলেছেন, এটা শিশুদের মানবাধিকারের চরম বিচ্যুতি। এটা জেনেও, না দেখার ভান করে সরকার ও কারা কর্র্তৃপক্ষ। কামরুন নাহার মনির সঙ্গে ৬ বছর ধরে রয়েছে তার সন্তান, তার এখন যাওয়ার জায়গা নেই। কারণ মনির সঙ্গে স্বামীর বিয়ে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। সে বাইরের মুক্তজীবনে এলেও চলমান সমাজ-সংসারে সে এক বিপন্ন শিশু হিসেবেই থাকবে। সমাজও তাকে সহজভাবে মেনে নেবে, তাকে স্নেহ-মায়া ও ভালোবাসা দিয়ে বড় করে তুলবে, সে সুযোগও নেই। মনির যে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার তাও আইনি ফাঁকে পড়েছে। ৬ বছর ধরে কেন তার মামলাটি হাইকোর্টে ওঠেনি, এর জবাব কে দেবে? আমরা কি আদালতকে এই প্রশ্ন করতে পারি যে, কেন নারী আসামিদের সঙ্গে থাকা শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত মানবিক পরিবেশের জেল বা সংশোধনাগার তৈরি করা হয়নি?

কেন দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ ওই নারীকে কারাগারে পাঠানো জরুরি হলো? যে অপরাধের কারণে মনি অভিযুক্ত ও ফাঁসির আসামি হিসেবে দ- পেয়েছেন, তার অপরাধ কি জেলজীবনের মধ্যেই রাখা যেত না? মামলার তদবিরের অভাবে ও তদবিরের কারণে নিম্ন আদালতের রায় ফাঁসিতে নিষ্পত্তি হয়েছে, উচ্চ আদালতে তা রিভিউ করা ছিল অতীব জরুরি বিষয়। কেন না, মনির সঙ্গে আছে শিশু এবং অন্য নারী আসামিদের সঙ্গেও আছে শিশু। বিচার তো মানবিকতার ঊর্ধ্বে নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন মানবিকতা আইনের ঊর্ধ্বে। মানুষ আগে, তার কল্যাণেই আইন ও তার প্রয়োগ করতে হবে। আমরাও এটাই বিশ্বাস করি। শিশুর অধিকার, তার বেড়ে ওঠার মুক্তজীবনের জন্য যা কিছু করা দরকার, নগর-গ্রামের শিশুদের জন্য সেই মানবিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ কায়েম করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি সত্যিকার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত