ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, চীন এই যুদ্ধে ইরানের পক্ষে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রয়েছে। কারণ বেইজিংয়ের জন্য সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর পরিণতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে সরাসরি লড়াইয়ে না থাকলেও ইরানকে সম্পূর্ণ একা ছেড়ে দিতে রাজি নয় চীন। মূলত বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য ঠেকিয়ে রাখতেই বেইজিং কৌশলগতভাবে তেহরানের পাশে দাঁড়িয়েছে।
অধ্যাপক সেলুমের মতে, চীন ইতোমধ্যে কূটনৈতিক ময়দানে ইরানের বড় ঢাল হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানবিরোধী বিভিন্ন প্রস্তাবে বেইজিং তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে তেহরানকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করার লক্ষ্যে যেসব প্রস্তাব তোলা হয়েছিল, চীন সেগুলোতে জোরালো বাধা দিয়েছে। বেইজিংয়ের এই অবস্থানের মূল উদ্দেশ্য হলো এমন এক ভারসাম্য রক্ষা করা যাতে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটন একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে না পারে। রাজনৈতিক এই সমীকরণটি চীনের জন্য একদিকে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে বিশ্বরাজনীতিতে তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে চীন ইরানকে সরাসরি ভারী সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা না করলেও পর্দার আড়ালে কারিগরি সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অধ্যাপক সেলুম উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা বেশ কিছু চীনা কোম্পানি সম্ভবত ইরানকে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। এটি চীনের একটি সুচিন্তিত কৌশল, যার মাধ্যমে তারা সরাসরি সংঘাতের দায় না নিয়েও ইরানের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে। এই কারিগরি সহযোগিতা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের বিপরীতে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টা।
চীনের এই দ্বিমুখী নীতি-একদিকে সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলা এবং অন্যদিকে কূটনৈতিক ও কারিগরি পন্থায় ইরানকে সমর্থন দেওয়া-বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বেইজিং চায় না যে তেহরানের পতন হোক বা ইরান পুরোপুরি মার্কিন বলয়ে চলে যাক। কারণ ইরান চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং জ্বালানি শক্তির বড় উৎস। ফলে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও চীন যেভাবে পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছে, তা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরানকে অনেকটা স্বস্তি দিচ্ছে। এই জটিল সমীকরণটি আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সূত্র: আল জাজিরা
