মায়ের ভালোবাসার প্রতিদান অসম্ভব 

আপডেট : ১০ মে ২০২৬, ০৭:২১ এএম

প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব মা দিবস। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; বরং মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ প্রকাশের এক অনন্য উপলক্ষ। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনে মা হচ্ছেন প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক, প্রথম ভালোবাসা এবং সবচেয়ে নিরাপদ বন্ধন। একজন মা তার সন্তানকে শুধু জন্ম দেন না; তিনি  লালন-পালন, চরিত্র গঠন করেন,  নৈতিকতা শেখান এবং জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে শক্তির উৎস হয়ে পাশে থাকেন। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, যে মা পরিবারকে সুস্থ, সুন্দর ও সুখী রাখতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন, সেই মায়ের নিজের স্বাস্থ্য, বিশ্রাম ও মানসিক সুস্থতা অনেক সময় অবহেলিত থেকে যায়। তাই বিশ্ব মা দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য, শুধু ফুল বা শুভেচ্ছায় সীমাবদ্ধ নয় বরং মায়ের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সুস্থতা নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এর বাস্তব মূল্য।

মা একটি পরিবারের মূল ভিত্তি। তার সুস্থতা মানে পরিবারের স্থিতি, সন্তানের নিরাপত্তা এবং সমাজের ইতিবাচক বিকাশ। একজন অসুস্থ মা শুধু নিজেই কষ্ট পান না; তার শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা পুরো পরিবারে প্রভাব ফেলে। তাই মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষা মানে একটি প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা। সমাজে অসংখ্য মা সংসার, সন্তান, কর্মজীবন ও সামাজিক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে নিজের প্রয়োজনকে গৌণ করে ফেলেন। অনেক মা পরিবারের অন্য সদস্যদের যত্ন নিতে গিয়ে নিজের অসুস্থতা লুকিয়ে রাখেন। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তশূন্যতা, অপুষ্টি, হাড়ক্ষয়, থাইরয়েড সমস্যা, মানসিক চাপ, বিষন্নতা, স্তন ক্যানসার ও জরায়ুমুখ ক্যানসারের মতো রোগ নীরবে বাড়তে থাকে। নারীর শরীর জীবনের বিভিন্ন ধাপে ভিন্ন ভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায় কৈশোর, গর্ভধারণ, মাতৃত্ব, সন্তান জন্মদান, স্তন্যদান,  মেনোপজ ও বার্ধক্য। প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন ভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা। বিশেষ করে, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সময় মায়ের যত্নে সামান্য অবহেলা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে এখনো মাতৃস্বাস্থ্য বড় চ্যালেঞ্জ।  অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা, নিরাপদ প্রসবের অভাব, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, কুসংস্কার ও দারিদ্র্য বহু মায়ের জীবনে ঝুঁকি তৈরি করে। তাই বিশ্ব মা দিবস আমাদের মনে করিয়ে  দেয় মায়ের সুস্থতা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন মায়ের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতায় বড় ভূমিকা রাখে। ফাস্টফুড, অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও অনিয়মিত জীবনযাপন শুধু ওজন বৃদ্ধি নয়, বরং হরমোনজনিত জটিলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে নিয়মিত ঘুম, পর্যাপ্ত পানি পান এবং মানসিক শান্তি একজন মাকে দীর্ঘ সময় সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

সুষম খাদ্য, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শারীরিক সক্রিয়তা, মানসিক বিশ্রাম এবং গর্ভকালীন যত্ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবারে মায়ের জন্য ‘নিজের সময়’ রাখা অত্যন্ত জরুরি, যা তার মানসিক পুনরুজ্জীবন ঘটায়। মায়ের প্রতি দায়িত্ব শুধু ভালোবাসার কথায় নয়; বরং বাস্তব যত্নে। তার চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা, পুষ্টি, নিরাপত্তা এবং মানসিক শান্তি নিশ্চিত করা সন্তানের দায়িত্ব। এই দিবস আমাদের শেখায়, মায়ের ভালোবাসার প্রতিদান কখনো পূর্ণভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তার স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব এবং সেটিই সবচেয়ে বড় কৃতজ্ঞতা। পৃথিবীর প্রতিটি মা সুস্থ, নিরাপদ, সম্মানিত ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ থাকুন এই  হোক বিশ্ব মা দিবসের অঙ্গীকার। কারণ একজন সুস্থ মা-ই পারে একটি সুস্থ পরিবার, মানবিক সমাজ ও সমৃদ্ধ পৃথিবী গড়ে তুলতে। মায়ের হাসিই পরিবারের শান্তি, আর মায়ের সুস্থতাই জাতির শক্তি।

লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি 

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত