আল্লাহর কাছে জীবন ভিক্ষা চাইছেন মা

আপডেট : ১০ মে ২০২৬, ০৭:২০ এএম

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় গত বৃহস্পতিবার রাতে দুর্বৃত্তের ছোড়া গুলিতে আহত হওয়া ১১ বছরের শিশু রেশমি আক্তারের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে শিশুটির চিকিৎসার বিষয়ে চমেক হাসপাতালে একটি উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল বোর্ড বসে। এরপর চিকিৎসকরা জানান, রেশমির চোখ ভেদ করে মস্তিষ্কে আটকে থাকা গুলিটি এখনই বের করা সম্ভব নয়।

মেডিকেল বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ডা. কে এম বাকি বিল্লাহ গণমাধ্যমকে জানান, ‘গুলিটি রেশমির বাঁ চোখ দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অংশ ছেদ করে মাথার পেছনের অংশে আটকে আছে। এ মুহূর্তে অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করতে গেলে প্রচ- রক্তক্ষরণের আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে। এ ছাড়া তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হতে শুরু করেছে। বর্তমান অবস্থায় তাকে কেবল লাইফ সাপোর্টে রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।’

গতকাল বিকেলে চমেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় আইসিইউর বাইরে বোনের জন্য অঝোর কাঁদছেন বড় ভাই ফয়সাল। তার পাশেই মেয়ের জীবন ভিক্ষা চেয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছেন মা সখিনা বেগম। আইসিইউ থেকে গাউন পরা কেউ বের হতে দেখলেই ছুটে যাচ্ছেন বাবা রিয়াজ আহমেদ। কান্না থামছে না আত্মীয়স্বজনেরও। এতে ভারী হয়ে উঠে হাসপাতালের পরিবেশ।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ শিশু রেশমির অবস্থা সংকটাপন্ন। গুলি শিশুটির চোখ দিয়ে মস্তিষ্কের ভেতর ঢুকে যাওয়ায় বের করা যায়নি। ঘটনার রাতেই রেশমিকে নিয়ে হাসপাতালে আসে তার পরিবার। তাকে নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে আইসিইউ না পেয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায় তারা। আইসিইউ খালি হলে তাকে আবার গত শুক্রবার চমেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।’

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রেশমি ব্যারিস্টার মিল্কি মেমোরিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। ঘটনার দিন রাত ৯টা ১০ মিনিটের দিকে তার মা সখিনা  বেগম তাকে পাশের দোকান থেকে পান আনতে পাঠান। রৌফাবাদ বিহারি কলোনির গলিতে তখন মুখে মাস্ক পরা একদল দুর্বৃত্ত হাসান রাজু নামে এক যুবককে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ছিল। রেশমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি তার বাঁ চোখ ভেদ করে মাথার ভেতরে ঢুকে যায়। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ রাজু মারা যান। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে রেশমি সবার ছোট। তার বাবা রিয়াজ আহমেদ সবজি বিক্রি করেন। রিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার মেয়ে বাঁচবে কি না আল্লাহ ভালো জানেন। তবে যারা আমার মেয়েকে গুলি করেছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

আইসিইউর সামনে গিয়ে দেখা যায়, চমেক হাসপাতালের ফ্লোরে বসে অঝোর কাঁদছেন রেশমির মা সখিনা  বেগম। সামনে যাকে পাচ্ছেন তার কাছে মেয়ের জন্য দোয়া চাচ্ছেন। আর ‘রেশমি, রেশমি, আমার রেশমি’, বলে কাঁদছেন। এ সময় স্বজনরা তাকে সান্ত¡না দিচ্ছেন। রেশমির বড় ভাই ফয়সাল বলেন, ‘আমার বোনটা লাইফ সাপোর্টে। সে কোনো নড়াচড়া করছে না। জানি সন্ত্রাসীদের বিচার হবে না, তাই বিচারও চাই না। আল্লাহ যেন আমার বোনকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন, সেটাই ফরিয়াদ।’

রেশমির খালু মনসুর আলম জানান, এখন পর্যন্ত চিকিৎসায় ৬০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। রেশমির বাবা প্রতিবন্ধী, শাক বিক্রি করে পরিবার চালান। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার-দেনা করে চিকিৎসার খরচ চলছে। রেশমির চিকিৎসার দায়িত্ব যেন সরকার নেয়।’ 

এ ঘটনায় গতকাল সকালে রেশমির মা সখিনা  বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা করেছেন। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আবদুল করিম জানান, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত