নাম তার জরদ মথন

আপডেট : ১০ মে ২০২৬, ০৮:১০ এএম

এগারো বছর আগের কথা। বিরল ও দুর্লভ কয়েকটি পতঙ্গের খোঁজে ভোর থেকে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ছড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। এরই মধ্যে দুইবার পুরো ছড়া চক্কর দিয়ে ফেলেছি। প্রচুর রঙিন রঙিন পতঙ্গ দেখেছি এবং ছবিও তুলেছি প্রচুর। এভাবে পতঙ্গ খুঁজতে খুঁজতে সকাল ১১টা ৫৫ মিনিটে উদ্যানের মসজিদের পেছনের ছড়ায় এসে পৌঁছলাম। ছড়াটি বাঁশঝাড়ের নিচ দিয়ে চলে গেছে। মাঝে মাঝেই বাঁশপাতার ফাঁক গলে চমৎকার রোদ এসে পড়ছে ছড়ার ভেজা বালুর ওপর। আর তাতে ছড়ার বালু সোনার মতো চকচক করছে। চমৎকার দৃশ্য!

সেই দৃশ্য উপভোগ করতে গিয়েই ভেজা বালুর রস চুষতে দেখলাম হলদে-সাদা-চকলেট রঙে রাঙানো চমৎকার একটি পুরুষ পতঙ্গকে। এই ঘটনার ঠিক দুই বছর আগে লাউয়াছড়াতেই একটি পুটুস বা পঞ্চফুলী (লান্টানা) গাছের রঙিন ফুলের রস চুষতে দেখেছিলাম একই প্রজাতির খানিকটা হালকা বর্ণের স্ত্রী পতঙ্গ টিকে।

লাউয়াছড়ায় দেখা এই পতঙ্গগুলো এ দেশের বহুল দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন প্রজাপতি জরদ মথন। পশ্চিমবঙ্গে এর নাম খয়রিকাপাস। ইংরেজি নাম ঈযড়পড়ষধঃব অষনধঃৎড়ংং। পিরিডি (চরবৎরফধব) গোত্রের প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম অঢ়ঢ়রধং ষুহপরফধ (আপিয়াস লিনসিডা)। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ওদের দেখা মেলে।

জরদ মথন মাঝারি আকারের প্রজাপতি। প্রসারিত অবস্থায় সামনের দুই ডানার বিস্তার ৪৫-৫৫ মিলিমিটার। সামনের ও পেছনের ডানার খাঁজকাটা চকলেট প্রান্তিক পাড়সহ পুরুষের ওপরটা সাদা। সামনের ডানার শীর্ষে রয়েছে হলদে ফুটকি। পেছনের ডানার নিচটা উজ্জ্বল লেবু হলুদ। অন্যদিকে স্ত্রীর ডানার ওপরটা কালো ধুলোযুক্ত এবং এতে ক’টি প্রশস্ত সাদা দাগ দেখা যায়। পেছনের ডানার নিচটা হালকা হলদে ধুলোযুক্ত ও ডানার শিরাগুলো সুস্পষ্ট।

প্রজাপতিটিকে দেশের উত্তর-পূর্ব (সিলেট বিভাগ), দক্ষিণ-পূর্ব (চট্টগ্রাম বিভাগ) ও মধ্যাঞ্চলে (ঢাকা বিভাগ) দেখা যায়। এরা আর্দ্র বনাঞ্চল বেশি পছন্দ করে। অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ও দ্রুত উড়ে। পুরুষগুলোকে সচরাচর একাকী বা দলে আর্দ্র মাটি বা বালুর রস চুষতে দেখা যায়। অন্যদিকে স্ত্রী প্রজাপতিকে বনের ধারে ফুলের রস চুষতে দেখা যায়।

বরুন ও বিভিন্ন প্রজাতির আষাঢ়ী গাছ প্রজাপতিটির পোষক গাছ। স্ত্রী প্রজাপতি এসব গাছের পাতার এক প্রান্তে গুচ্ছাকারে টাকু আকারের ডিম পাড়ে। সদ্য পাড়া ডিমগুলো সাদাটে হলেও তা এক রাতের মধ্যে কমলা রং ধারণ করে। ডিম ফুটে মাত্র দু’দিনে শুককীট বের হয়। সদ্য ফোটা শুককীট মাত্র ১.৩ মিলিমিটার লম্বা হয়।

শুককীটের স্বচ্ছ দেহটিতে কিছু লালচে দাগ থাকে। আট থেকে সাড়ে আট দিনে ১.৩ মিলিমিটারের স্বচ্ছ শুককীট পাঁচবার খোলস পাল্টে ৩৪ মিলিমিটার  হয়ে যায়। পোষক গাছের পাতা খেয়ে ও পাঁচবার খোলস পাল্টে শুককীট মূককীটে পরিণত হয়। সবুজাভ মূককীট পাতার উপরদিকে সবুজ রঙের শক্ত খোলসে নিজেকে আবৃত করে ফেলে। প্রায় পাঁচ দিন পর মূককীটের খোলস কেটে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি বের হয়ে আসে। জীবন চক্র সম্পন্ন হতে মাত্র ১৫-১৬ দিন সময় লাগে।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত