কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে চলার সংস্কৃতি থেকেই দুর্নীতির জন্ম।
সোমবার (১১ মে) বিকেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।
পোস্টে তিনি বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনে বলেছিলাম, পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে চলার সংস্কৃতি থেকেই দুর্নীতির জন্ম। পরে বাস্তব চিত্র জেনে বুঝলাম, এই ‘ম্যানেজ’ করার প্রয়োজনটাই আসলে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার ফল।
পুলিশের অপর্যাপ্ত বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে জানা গেল, খুন ও ডাকাতির মতো গুরুতর মামলার তদন্তে একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে মাত্র ৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়। অথচ একটি মামলার তদন্ত শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যায়, এর মধ্যে একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তাও বদল হন। স্বাভাবিকভাবেই এত অল্প বরাদ্দে কয়েকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতেই পুরো অর্থ শেষ হয়ে যায়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অর্থ পাচারের মতো জটিল ও সংবেদনশীল মামলার তদন্তে বরাদ্দ মাত্র ৩ হাজার টাকা। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য উদ্ঘাটন করে আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করার জন্য এই পরিমাণ অর্থ বাস্তবতার সঙ্গে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে অপরাধ প্রমাণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবীরা সপ্তাহে দুই দিন ছুটি পান এবং নির্ধারিত কর্মঘণ্টা অনুসরণ করেন, কিন্তু পুলিশের ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটি প্রায় নেই। জনবল সংকট ও জরুরি সেবার প্রকৃতির কারণে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা হয়তো অনিবার্য, কিন্তু তার যথাযথ প্রতিদান, ওভারটাইম, অবশ্যই নিশ্চিত করা উচিত। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের জন্য মানসম্মত, স্বাস্থ্যকর ও সম্মানজনক খাবারের ব্যবস্থাও তাদের প্রাপ্য অধিকার।
বিভিন্ন তদন্তে ব্যয় তাদের ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকেই জেনেছি, মামলার কাজে আদালতে যাতায়াত, সাক্ষ্য প্রদান কিংবা তদন্ত সংক্রান্ত বিভিন্ন খরচের জন্য অনেক ক্ষেত্রে কোনো সরকারি বরাদ্দ থাকে না। ফলে এসব ব্যয় তাদের ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয়। প্রশ্ন হলো, একজন সরকারি কর্মচারী কেন নিজের পকেট থেকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করবেন? বিশেষ করে কনস্টেবল, এএসআই বা এসআই পদে কর্মরতদের সীমিত বেতনে তা কতটা সম্ভব?
জনগণের একটি বড় অংশ এখনও বিপদে পড়লে পুলিশের কাছে যেতে দ্বিধা বোধ করে বলে তিনি বলেন, জনগণের একটি বড় অংশ এখনও বিপদে পড়লে পুলিশের কাছে যেতে দ্বিধা বোধ করে। এই অবিশ্বাস দূর করা জরুরি। এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ প্রথমেই পুলিশের শরণাপন্ন হতে আস্থা পায়। এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন, পুলিশকে ‘না’ বলতে শেখাতে হবে। আইনবহির্ভূত বা অন্যায় কোনো নির্দেশ এলে তা প্রত্যাখ্যান করার মানসিকতা ও সাহস থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মহল পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বেআইনি কাজ করাতে চায়। এমনকি আমরা, জনপ্রতিনিধিরাও, কখনও কখনও অজান্তেই এই সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাই। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বেআইনি নির্দেশ মানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলে তিনি বলেন, পুলিশ অবশ্যই সরকারের ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আইনসম্মত নির্দেশ পালন করবে, এটাই শৃঙ্খলার ভিত্তি। তবে বেআইনি নির্দেশ মানার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে না। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে গ্রেপ্তার করা বা হয়রানি করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এই অবস্থান বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ সদস্যদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বেআইনি আদেশ প্রত্যাখ্যান করার কারণে তারা কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন। একই সঙ্গে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন ও পদোন্নতি নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে তিনি পুলিশের পেশাগত স্বাধীনতা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে বলেন, পুলিশের পেশাগত স্বাধীনতা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের অঙ্গীকার। তবে আজ একজন পুলিশ অফিসারের বক্তব্য শুনে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা যেভাবে পুলিশের জন্য এই স্বাধীনতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চাই, পুলিশ বাহিনী নিজেও কি তা অর্জনে সমানভাবে প্রস্তুত?
