অনিয়ম, অবহেলা ও নীতি সহায়তার অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা খোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিষয়টিকে স্বাগত জানালেও তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী নেতারা বন্ধ কারখানা খোলার আগে বন্ধের উপক্রম কারখানাগুলোকে জরুরি সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রস্তাব দিয়েছেন।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে তার সঙ্গে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নেতাদের পৃথক পৃথক বৈঠকে তারা এ প্রস্তাব দিয়েছেন।
বৈঠকে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন, বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু এবং বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নিজ নিজ সংগঠনের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
বৈঠক শেষে বিজিএমইএ সভাপতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের একটা সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল। সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও খাতসংশ্লিষ্ট যেসব সমস্যা রয়েছে, সেসব বিষয়ে আলোচনা করেছি। সবচেয়ে বেশি যেটা আলোচনা হয়েছে, সেটা হচ্ছে রপ্তানি খাতকে বৈচিত্র্যকরণ (ডাইভারসিফিকেশন) করা। উনি (প্রধানমন্ত্রী) বলেছেন, শুধু তৈরি পোশাক নির্ভরশীল হলে হবে না। সেক্ষেত্রে আমরা বলেছি, পলিসি সাপোর্ট (নীতি সহায়তা) লাগবে। এটাও বলেছি যে, আমাদের মধ্যে অনেক পটেনশিয়াল মেম্বার আছেন, যারা আরএমজির বাইরে ইনভেস্ট করতে চান। সেক্ষেত্রে ওনার তরফ থেকে এক ধরনের মোটিভেশন লাগবে। এ প্রসঙ্গে উনি বলেছেন পরবর্তীতে তিনি আমাদের একটা লম্বা সময় দেবেন, যাতে আমরা মেম্বারদের মোটিভেট করতে পারি। মূল ব্যবসার সঙ্গে অন্যান্য পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য তৈরি করতে পারি।’
মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন ‘দ্বিতীয়ত, বন্ধ কারখানার বিষয়ে কথা হয়েছে। বন্ধ ফ্যাক্টরি খোলার ব্যাপারে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটাকে আমরা সমর্থনের পাশাপাশি ফ্যাক্টরি সিলেকশনের ক্ষেত্রে খুব সাবধানী হওয়ার জন্য বলেছি; যাতে এ সুযোগে কেউ যেন টাকা সরিয়ে নিতে না পারে। আমরা বরঞ্চ জোর দিয়েছি যেসব ফ্যাক্টরি এই মুহূর্তে সমস্যাগ্রস্ত, বন্ধ হওয়ার উপক্রম তাদের পলিসি সাপোর্ট দেওয়ার জন্য। তাহলে ফ্যাক্টরিগুলা বন্ধ হবে না। উনি (প্রধানমন্ত্রী) এটার ব্যাপারে বলেছেন অবশ্যই দুটি বিষয় একসঙ্গে দেখা হবে। এক্ষেত্রে আমাদের অগ্রাধিকার ছিল, যারা এখন সমস্যা মোকাবিলা করছেন, তাদেরকে যাতে সাহায়তা দেওয়া হয়।
বৈঠকে বাজেট বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বাজেট নিয়ে ইতিমধ্যে অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যানকে জানিয়েছি, নতুন করে উনাকে জানাইনি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঘুরে ফিরে একটাই বিষয় বলেছি, আমরা পলিসি সাপোর্ট চাই। সরকার এখন অর্থ সহায়তা দেওয়ার জন্য তৈরি না, সেটা আমরা বুঝি। আমরা চাই সরকার যেন অবকাঠামো খাতে দ্রুত বিনিয়োগ করে। বিশেষ করে জ্বালানি ও ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে এবং বন্দর সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে জোর দেয়, যাতে আমাদের ব্যবসার খরচটা কমে আসে। এটাই আমাদের চাওয়া। তবে এক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। উনি (প্রধানমন্ত্রী) বলেছেন অনেক সমস্যা ইতিমধ্যে সরকার চিহ্নিত করেছে, যা পর্যায়ক্রমে সমাধান করবেন।
বৈঠকের বিষয়ে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রধামন্ত্রী খুব আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের কথা শুনেছেন। তিনি কম বলেছেন, শুনেছেন বেশি। নেতারা কারখানা চালুর বিষয়টিকে স্বাগত জানালেও বন্ধের পথে থাকা বা উপক্রম হওয়া কারখানার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন। এ ছাড়া আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতার প্রসঙ্গও এসেছে। বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, ‘আমরা বলেছি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের সহায়তা করে না। ফলে কারখানা মালিকরা সমস্যায় পতিত হচ্ছেন। আরেকটি বিষয় বলেছি বিদ্যমান কর ব্যবস্থাপনার সংস্কার প্রসঙ্গে। আমরা বলেছি, এ কর কাঠামো দিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। এ ক্ষেত্রে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি দরকার।’ তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী সব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। আলোচ্য বিষয়গুলোয় তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বাণিজ্যমন্ত্রীকে নির্দেশনা দিয়েছেন। আর ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবগুলো সমস্যা চিহ্নিত করে লিখিতভাবে জমা দেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। আগামী দুই-চার দিনের মধ্যে তারা লিখিতভাবে জামা দেবেন। তিনি বলেন, ‘আলোচনা সংক্ষিপ্ত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছেন, ঈদের পর খাতভিত্তিক অংশীজনদের জন্য আলাদা সভার আয়োজন করবেন; যেখানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষ ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন এবং সেই আলোচনায় সমস্যার কারণ চিহ্নিতকরণ ও সমাধান ঠিক করা হবে।’
এদিকে গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের লবণচাষিদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে বৈঠক করেছেন। সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রহিম খান, শিল্প সচিব ওবায়দুর রহমান, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে লবণচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। এ ছাড়া লবণচাষিদের জীবনমান উন্নয়নে করণীয় বিষয়েও আলোচনায় হয়।
