প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী অবস্থান দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে থেমে গেলে চলবে না। যে অপরাধী, তাকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। আপনারা আইনের লোক, কোনো বিশেষ দলের নন। কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী পরিচয় দেখে থমকে যাবেন না। যে অপরাধী, তাকে অপরাধী হিসেবেই গণ্য করবেন।’ গতকাল সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের সঙ্গে আমরা আপস করতে চাই না। অনেক সময় আমরা দেখেছি, আপনাদের একটি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাবশালী পরিচয় এ রকম বিষয় আপনাদের ফেস করতে হয়। আমি পরিষ্কারভাবে আজকের অনুষ্ঠানে বলতে চাই, দুর্নীতি- সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যে বা যারা অপরাধে লিপ্ত হবে তাকে আপনারা অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করবেন।’
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতেই একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ‘এটি কেবল একটি সেøাগান নয়, এটি আমাদের সবার প্রাণের আকাক্সক্ষা। আমি বিশ্বাস করি একজন নাগরিক হিসেবে এবং ইন জেনারেল একজন মানুষ হিসেবে আপনারা এই আকাক্সক্ষার প্রতিফলন চাইবেন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব। আর এই স্বপ্নের প্রথম ধাপই হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’
তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সরকার আপসহীন অবস্থানে রয়েছে। নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন, ‘প্রশাসনের প্রতিটি পদই গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র পদোন্নতি কিংবা পছন্দের জায়গায় পোস্টিং পাওয়ার জন্য তদবির করা পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করার নামান্তর। হয়তো চাহিদামতো পোস্টিং পেলে আপনি সাময়িকভাবে তুষ্ট হবেন, কিন্তু এটি আপনার প্রফেশনালিজমের ক্ষতি করা। যার যেখানে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, সেখানেই গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করুন। সততা, মেধা ও দক্ষতাই হবে নিয়োগ ও বদলির একমাত্র মাপকাঠি।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী পুলিশ কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, সরকার যেমন পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত, তেমনি প্রশাসনের কোনো পদই কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়।
প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন পাল্টে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে পুলিশিং আর কেবল শহর বা জেলার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। ‘ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম’ এখন বড় বাস্তবতা। কয়েক দশক আগের তুলনায় বর্তমানের চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি বিস্তৃত। তাই প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হতে হবে। সময়ের এই দাবি মেটাতে না পারলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
বিগত দেড় দশকের শাসনামলে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অপচয়ের অভিযোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে একটি বালিশ কেনা হয়েছে ৮০ হাজার টাকায়, ৩০ হাজার টাকার ড্রেসিং টেবিলের দাম দেখানো হয়েছে কয়েক লাখ টাকা। একইভাবে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পে গাছ লাগানোর নামে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। অপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণের বোঝা দেশের মানুষের ওপর চাপছে। এই অর্থ সাশ্রয় করা গেলে পুলিশ বাহিনীর আবাসন, পরিবহন ও আইটি ইউনিটের উন্নয়নে ব্যবহার করা যেত।’
রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রীদের জ্বালানি তেলের বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিজেও ব্যক্তিগত ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছেন।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরের পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর সৃষ্ট মব ভায়োলেন্সের ঝুঁকি পুলিশ ধৈর্য ও কৌশলের মাধ্যমে মোকাবিলা করেছে। পুলিশের আচরণের ওপরই সরকারের ভাবমূর্তি অনেকাংশে নির্ভর করে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের নৈতিক দায়িত্ব।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, অতিরিক্ত আইজিপি একেএম আউলাদ হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা।
এ সময় পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। পাশাপাশি দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশ সব সময় সরকারকে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তারা। জবাবে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ক্রমে পুলিশের দাবি পূরণের আশ্বাস দেন। উল্লেখ্য, গতকাল রবিবার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে চারদিনব্যাপী পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অপরাধ ঘটার পর নয়, আগেই প্রতিরোধে জোর দিতে হবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
অনুষ্ঠানে প্রচলিত প্রতিক্রিয়াশীল পুলিশিং থেকে বের হয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক প্রতিরোধমূলক পুলিশিং ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তা সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা যায়।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘গতানুগতিক পদ্ধতির বাইরে এসে আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমেই অপরাধের পূর্বাভাস এবং প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেয়, যা মূলত রিঅ্যাকটিভ (প্রতিক্রিয়াশীল) পুলিশিং। তবে বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো প্রিভেন্টিভ পুলিশিং বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা।’
তিনি উল্লেখ করেন, অপরাধ প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখতে হবে’ এমনটা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ব্যক্তিগত সততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই। বাহিনীর শৃঙ্খলার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। আপনাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বাহিনীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।’
