ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে উচ্চফলনশীল শস্য জাত, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ছে। সৃষ্টি হচ্ছে নানা স্বাস্থ্য সমস্যা, সঙ্গে পরিবেশগত বিপর্যয়। প্রযুক্তিভিত্তিক এই কৃষির বিপরীতে গত শতকে জাপানে প্রাকৃতিক কৃষির চর্চা শুরু করেছিলেন মাসানোবু ফুকুওকা। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে এখন তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে। লিখেছেন এনাম-উজ-জামান
জমি চাষ করে, বীজ বুনে, সেচ ও সার দিয়ে যে ফসল পাওয়া যায়, কোনো কিছু না করেও যদি একই ফল পাওয়া যায় তাহলে কি আর কেউ সাধ করে এত পরিশ্রম করবে? মাসানোবু ফুকুওকার প্রাকৃতিক
কৃষির দর্শন অনুযায়ী, এই চেষ্টাকৃত কৃষি থেকে প্রাপ্ত খাদ্যপণ্যে মানবসম্পদ ও সময়ের অপচয় ঘটে। রাসায়নিক সার ও হাইব্রিড বীজ ব্যবহারের ফলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে। তার থেকে যে স্থানে যে শস্য প্রাকৃতিকভাবে বিনা আয়াসে উৎপাদিত হয় ক্ষুন্নিœবৃত্তির জন্য সে খাদ্যই গ্রহণ করা উচিত। এই যুগান্তকারী বক্তব্য দানকারী জন্মেছিলেন ১৯১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, জাপানের মাতসুয়ামা শহরের ষোল মাইল দূরে ইয়ো নামক এক মফস্বল শহরতলিতে। মাসানোবুর বাবা কামেইচিসি ফুকুওকা ছিলেন নগরপ্রধান। মা শাচিএ ইশসিকি ছিলেন সামুয়াই বংশোদ্ভূত, শিক্ষিত, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারী। মাসানোবু ইয়োর স্থানীয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য মাতসুয়ামা শহরে যান। তার ভালো লাগত সাহিত্যের শিক্ষকের সহজ-সরল জীবনদর্শনের কথা। সাহিত্যের শিক্ষকের কথায় তার মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে, সুখী জীবনযাপন করতে বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই।
আধুনিক কৃষিশিক্ষায় পাঠ গ্রহণ
মাসানোবুর পরিবার ছিল কৃষিভিত্তিক পরিবার। পরিবারের হাল ধরার জন্যই তাকে গিফু কৃষি মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি আধুনিক, প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এ সময় মাঞ্চুরিয়ানরা জাপান আক্রমণ করে। মাসানোবুসহ মহাবিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে সে সময় বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়।
গিফু মহাবিদ্যালয়ে মাসানোবু অধ্যাপক মাকাতো হিউরার অধীনে উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করেন। স্নাতক পাস করার পর অধ্যাপক মাকাতো হিউরা তাকে ওকায়ামা কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। পরে ইয়োহামা শুল্ক দপ্তরে উদ্ভিদ পরিদর্শক বিভাগে চাকরির ব্যবস্থাও করে দেন। এই বিভাগের কাজ ছিল আমদানিকৃত উদ্ভিদের গুণাগুণ যাচাই করা। এভাবে পার হয় দুই বছর। তৃতীয় বছরে মাসানোবু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। সংক্রামক রোগ ভেবে শহুরে বন্ধুরা তাকে পরিত্যাগ করে। তার দিন কাটতে থাকে একাকী, অপরিচ্ছন্ন হাসপাতালের নির্জন, শীতল প্রকোষ্ঠে। তার বয়স তখন মাত্র ২৫ বছর।
ফিরে এলেন মৃত্যুর দরজা থেকে
বেশ কিছুদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে মাসানোবু অবশেষে সুস্থ হন। হাসপাতাল ত্যাগ করার পর থেকেই তার মন বিক্ষিপ্ত থাকত সবসময়। কাজে মন নেই। ভাবেন, এই জীবনের উদ্দেশ্য কী? ভাবলেন, তিনি মরে গেলে মা ছাড়া কারা কাঁদত? তিনি তেমন কাউকে খুঁজে পেলেন না। বিগত জীবন সম্পর্কে এমন নিদারুণ রূঢ় উপলব্ধি তাকে বিমূঢ় করে দিল। তিনি পাহাড়ের পাদদেশে একটি এলম গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়লেন। পরদিন সকালে তিনি দেখলেন সূর্যের আভা। পাখিরা গান গাইছে। তবু সবকিছু ছাপিয়ে মাসানোবুর মনে হলো, এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই নেই। মানুষের কিছু করার নেই। কিছু করতে যাওয়া মানে হলো নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করা মাত্র। তিনি পরে লিখেছেন, তার মনে হয়েছিল তিনি যে সব ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন তা ছিল নিছক মনগড়া। সেদিন সকালে যেন তার সব যন্ত্রণা, স্বপ্ন আর বিভ্রম অদৃশ্য হয়ে গেল, যাকে ‘প্রাকৃতিক সত্য’ বলা যেতে পারে তা প্রকাশিত হলো।
নতুন দর্শন লাভ
নতুন এই উপলব্ধির পরে তার পক্ষে সম্ভব হলো না পুরনো যাপিত জীবনে ফিরে যাওয়া। কিছুদিন উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ালেন, কিছুদিন বাবার কমলা বাগানে কমলা চাষের দায়িত্ব নিলেন কিন্তু কিছুই করলেন না। ছেলের এমন উদাসীন জীবনযাপন বাবা কামেইচিসির জন্য সম্মানজনক ছিল না। কিছুদিন পরে মাসানোবু রোগ ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের প্রধান হওয়ার আমন্ত্রণ পান। বাবার ইচ্ছানুসারে তিনি সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন।
কোচিতে মাসানোবু ফুকুওকা এবং তার সহকর্মীদের কাজ ছিল বৈজ্ঞানিক কৃষিতে অগ্রগতির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা। কৃষকদের আধুনিক চাষের পরামর্শ দিলেও ফুকুওকা তার নিজস্ব উপলব্ধিগত গবেষণা অব্যাহত রাখেন। তিনি কম্পোস্ট, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ছাড়া উৎপন্ন ফসলের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষকৃত ফসলের ফলনের তুলনা করেন। তিনি দেখেন যে, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে যে ফলন পাওয়া গেছে তা এসব ব্যবহার না করে যে ফলন পাওয়া গেছে তার থেকে খুব বেশি না। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যয় হিসাব করলে দুই পদ্ধতির ফলন সমান। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে এলেন যে, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার অধিক ফলন দিতে পারে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তাদের পারিবারিক জমির তিন ভাগের দুই ভাগই হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। এই অল্প জমিতেই তিনি প্রাকৃতিক কৃষি শুরু করেন। পরের কয়েক বছর তিনি লক্ষ্য করতে থাকেন তার ছোট খামারে কোন কোন উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে। সেসব উদ্ভিদের বীজ সংগ্রহ করে বীজগুলোকে মাটি ও প্রাণিজ বর্জ্যরে সাহায্যে ছোট ছোট বল তৈরি করতেন। এগুলো ছড়িয়ে দিতেন জমিতে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কার করেন প্রাকৃতিক কৃষির নিয়ম।
ক. প্রকৃতি নিজে নিজেই আবাদ করে। বৃক্ষ বা চারাগাছের শেকড়, পোকামাকড় আর ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ারাই যেটি করতে পারে, আলাদাভাবে মানুষের সেটি করার দরকার নেই। মাসানোবুর প্রাকৃতিক কৃষির প্রথম সূত্র হলো, মাটিতে লাঙল চালানো যাবে না।
খ. মাসানোবু লক্ষ করেন, সারের প্রয়োজন তখনই হয় যখন মাটির প্রাকৃতিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। এই ক্ষমতা কোনো সারেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এমনকি হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা বা কম্পোস্ট সারও খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে না। তার কৃষির দ্বিতীয় সূত্র হলো, কোনো রাসায়নিক বা কম্পোস্ট সার ব্যবহার করা যাবে না।
গ. ফুকুওকা লক্ষ করেন, যখন তিনি লাঙল চাষ বন্ধ করেন, তখন আগাছার সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পায়। লাঙল আসলে গভীরভাবে পড়ে থাকা আগাছার বীজকে আলোড়িত করে এবং তাদের অঙ্কুরিত হওয়ার সুযোগ দেয়। লাঙল দিলেই যে আগাছা নির্মূল হবে এমন নয়। রাসায়নিক ভেষজনাশকও আগাছার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শক্তি নয় কারণ তা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে এবং মাটি ও পানিকে বিষিয়ে ফেলে। সহজ উপায় হলো, আগাছা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার চেষ্টা না করা। সদ্য বপন করা জমিতে খড় বিছিয়ে আগাছা সফলভাবে দমন করা যায়। তার তৃতীয় সূত্র হলো, আগাছা নিয়ন্ত্রণ করতে লাঙল দিয়ে চাষ বা আগাছানাশক ব্যবহার করা যাবে না। খড় বিছিয়ে দিলেই আগাছা মাড়িয়ে নতুন চারাগাছ উঠবে।
ঘ. ফুকুওকার চতুর্থ সূত্র হলো, জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না। কীটপতঙ্গ ফসলের ক্ষতি করলেও কীটনাশক ছিটানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কীটনাশক কীট নিয়ন্ত্রণে স্বল্প সময়ে ফল দিলেও তা প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘমেয়াদে জমির ক্ষতিই করে।
প্রাকৃতিক কৃষির এই সূত্র অবলম্বন করে তিনি কাক্সিক্ষত ফল পান। তিনি লক্ষ করেন এর ফলে মাটির গুণাগুণ যেমন বছরের পর বছর অক্ষুণœ থাকছে, তেমনি ফলনেও কোনো তারতম্য ঘটছে না। ফসলও অন্য যেকোনো পদ্ধতিতে চাষকৃত ফসলের তুলনায় বেশি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু।
নতুন দর্শনের প্রচার
মাসানোবু ফুকুওকা তার গবেষণালব্ধ জ্ঞান নিজের কাছে গোপন করে রাখেননি। বই, গান, শ্লোক প্রভৃতি রচনা ও পরিবেশনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন অন্যদের মধ্যে। প্রাকৃতিক কৃষি নিয়ে তার বই ‘দ্য ওয়ান-স্ট্র রেভল্যুশন : অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ন্যাচারাল ফার্মিং’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে, জাপানি ভাষায়। একই বছরে ‘দ্য ন্যাচারাল ওয়ে অফ ফার্মিং- থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস অব গ্রিন ফিলোসফি’ বইটির জাপানি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৮ সালে প্রথম বইটির ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হলে সারা বিশে^ কৃষিচিন্তার জগতে দারুণ আলোড়ন ওঠে। কৃষি সম্পর্কে প্রচলিত সব ধারণা ভেঙে পড়ে। কৃষি গবেষকদের কৌতূহল মেটাতে তিনি ছুটে গেছেন বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে। প্রাকৃতিক কৃষির রূপকার হিসেবে বিশ^ব্যাপী সমাদৃত এই জাপানি কৃষিবিদ ও দার্শনিক ২০০৮ সালের ১৬ আগস্ট ৯৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রাকৃতিক কৃষি কি চাহিদা পূরণে সক্ষম?
১৯৭৯ সাল থেকে ফুকুওকা বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন, বক্তৃতা করেছেন তার দর্শন, জীবনযাপন ও প্রাকৃতিক কৃষি নিয়ে। শুধু বক্তৃতার মধ্যেই তার কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে সে দেশের কৃষি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন আর সে দেশের ঊষরভূমিকে সবুজ করতে ছড়িয়ে দিয়েছেন বীজ। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের বীজ সংগ্রহও করতেন। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখেন তার সর্বশেষ গ্রন্থ ‘সয়িং সিডস ইন দ্য দেজার্ট’। প্রাকৃতিক কৃষি বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে পারবে কিনা সে প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি এ বইতে। তিনি এ বইতে বলেন, অল্প জায়গায় অধিক শস্য ফলানোর চেষ্টার মাধ্যমে নয় বরং ঊষর জমিকে প্রাকৃতিক কৃষির মাধ্যমে সবুজায়নের ফলে এই চাহিদা পূরণ হতে পারে।
