বন্যায় বন্দি হাওর বাড়ছে ক্ষতি বাড়ছে দুঃখ

আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ১২:৩৪ এএম

দেশের পূর্বাঞ্চলের হাওর অঞ্চল বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, সিলেট ও কিশোরগঞ্জ আবার গভীর ও পরিচিত সংকটে নিমজ্জিত। এটি বিচ্ছিন্ন দুর্যোগ নয়; বরং হাওরের ভঙ্গুর ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ুগত বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক পুনরাবৃত্ত দুর্ভোগের চিত্র। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে, টানা বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে হাওরজুড়ে পানি দ্রুত বেড়ে গিয়ে গ্রাম, রাস্তা ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি গ্রাস করেছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে তখন, যখন কৃষকরা তাদের বছরের প্রধান ফসল বোরো ধান ঘরে তোলার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন। চোখের সামনে পাকা ধান ডুবে এক বছরের পরিশ্রম, মুহূর্তে পানির নিচে হারিয়ে গেছে। এই দুর্যোগের প্রভাব তাৎক্ষণিক নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি। পানি দ্রুত নামে না; সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকে স্থির। ফলে ঘরবাড়ি জলমগ্ন, মানুষ বিচ্ছিন্ন, জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। জীবিকা হারিয়ে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে শহরমুখী হয়। এইভাবে হাওরের বন্যা একটি সমন্বিত সংকটে রূপ নেয় যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং জীবিকা ধ্বংস একসঙ্গে আঘাত হানে। বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় গ্রাম, রাস্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মানুষ কার্যত দ্বীপের মতো অবস্থায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।

ফসল হারানোর ফলে, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। বোরো ধান বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের একটি বড় অংশ জোগান দেয়। এই ক্ষতি সরাসরি জাতীয় খাদ্য সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে। নিরাপদ পানির সংকটে পানির মূল উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। আর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে যায় এবং ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। একইসঙ্গে জীবিকা ধ্বংস হয়ে যায়। তখন কৃষকরা শুধু ফসল নয় গবাদিপশু, সঞ্চয় এবং অন্যান্য সম্পদ হারিয়ে ফেলেন। ফলে অনেক পরিবার শহরে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়। এ বছর বন্যা পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। হাওর অঞ্চলে অন্তত পাঁচটি নদী বিপদসীমা অতিক্রম করায়, প্লাবনের গতি আরও বেড়েছে। হবিগঞ্জে প্রায় ৩,৩৬০ হেক্টর জমি পানির নিচে চলে গেছে এবং প্রায় ১০,৮০০ টন ধান নষ্ট হয়েছে। আশপাশের জেলাগুলোতে ১০-১২টি বড় হাওর প্লাবিত হয়ে প্রায় ৫,০০০ হেক্টর পাকা ধান ডুবে গেছে। সুনামগঞ্জে ক্ষতির পরিমাণ ইতিমধ্যে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে প্রায় ৪০,০০০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি, প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা। এখনো পরিস্থিতি স্থিতিশীল নয়। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢল নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত করছে। অনেক জায়গায় এখনো অর্ধেক ফসল মাঠে রয়েছে, যা ডুবে গেলে ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বাড়বে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান, এই সংকটের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে। ২০২২ সালে হাওর অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ৫৩,০০০ হেক্টর জমি ডুবে যায় এবং প্রায় ১৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৪ সালে বহু-ধাপের বন্যায় প্রায় ৫.৮ মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৪,৪২১ কোটি টাকা। এই ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে, বন্যা এখন আর মৌসুমি ঘটনা নয় এটি প্রায় প্রতি বছর ঘটে যাওয়া পুনরাবৃত্ত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। কেন বাড়ছে এই দুর্যোগ?

হাওরের বন্যা একক কারণে ঘটে না; এটি একাধিক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণের সমন্বয়। প্রথমত, উজানে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল দ্রুত হাওরে নেমে আসে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন আরও অনিয়মিত ও তীব্র হচ্ছে। তৃতীয়ত, হাওরের ভৌগোলিক গঠনই এমন যে, সামান্য পানিতেই বিশাল এলাকা প্লাবিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো, নদীর নাব্য কমে যাওয়া, জলাবদ্ধতা এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন। ফলে প্রাকৃতিক ঝুঁকি দ্রুত বড় দুর্যোগে রূপ নেয়। হাওরের বন্যার প্রভাব তাৎক্ষণিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। বন্যাজনিত ক্ষতি কমাতে অভিযোজন ও প্রশমন দুই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অভিযোজন : ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে সহনশীলতা বাড়ানো স্বল্পমেয়াদি ও বন্যা-সহনশীল ধান, আগাম সতর্কবার্তা, টেকসই বাঁধ ও উঁচু আশ্রয়কেন্দ্র, বিকল্প জীবিকা (মাছ চাষ, হাঁস পালন), এবং বিল-খাল পুনরুদ্ধার। প্রশমন : ঝুঁকির মূল কারণ কমানে জলাভূমি সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও পানিসম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা জোরদার। বর্তমানের জন্য অভিযোজন, ভবিষ্যতের জন্য প্রশমন দুটোই একসঙ্গে জরুরি।

কৃষকদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগাম বপন, স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান ব্যবহার এবং ফসল বহুমুখীকরণ। মাছ চাষ, ভাসমান কৃষি এবং সমন্বিত চাষাবাদ আয় বাড়াতে পারে। পাশাপাশি আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবহার করে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। এনজিও ও আইএনজিওগুলোকে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো, প্রতিরোধমূলক বিনিয়োগ। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং কৃষকদের জন্য বীমা ও ভর্তুকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। হাওর অঞ্চলে বন্যা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ক্ষতি অনেক কমানো যায়। প্রধান করণীয়গুলো হলো সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা : নদী-হাওর-উজানের পানি একসঙ্গে বিবেচনায় এনে পরিকল্পনা ও পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে তথ্য আদান–-প্রদান জোরদার। টেকসই অবকাঠামো : সাবমার্জিবল বাঁধ মজবুত করা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা। আগাম সতর্কবার্তা : নির্ভুল পূর্বাভাস ও দ্রুত স্থানীয় পর্যায়ে বার্তা পৌঁছানো (এসএমএস, মাইকিং)। জলবায়ু সহনশীল কৃষি : স্বল্পমেয়াদি ও বন্যা-সহনশীল ধান, ফসলের সময়সূচি পরিবর্তন। প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান : বিল-খাল পুনঃখনন, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার। স্থানীয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ : স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কমিউনিটি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ’ নয়, বরং বন্যা সহনশীল হাওর গড়ে তোলা।  সময় এখন সিদ্ধান্তের : হাওরের বন্যা এখন আর কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি একটি জলবায়ু-প্রণোদিত মানবিক সংকট, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং উন্নয়নকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। আমরা কি কেবল ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেব, নাকি আগাম প্রস্তুতি নিয়ে ঝুঁকি কমাব? 

লেখক : জলবায়ুকর্মী এবং কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত