আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে ‘প্রোপাগান্ডা’ শব্দটি আলোচিত হয়। অর্থাৎ যখন থেকে মোবাইল, বহু টিভি চ্যানেল আর দেশ ডিজিটালাইজেশনের সূচনায় পা রাখল তখন থেকে ‘প্রোপাগান্ডা’ শব্দটি শিক্ষিত মানুষের মুখে শোনা যেত। যদিও গুজব বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো তথ্য বা অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা, আমাদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই ছিল। ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে দল এসব তো চলতই। এরপর প্রোপাগান্ডা শব্দটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে, আরও বছর দশেক পর। তখন অধিকাংশ ঘরেই মোবাইল এসেছে। জীনের বাদশারা গভীর রাতে ফোন দিতে শুরু করে আর চারদিকে শুধু প্রোপাগান্ডা চোখে পড়ে। খুব সূক্ষ্ম হিসাব কষে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়। এখন রাজনীতি থেকে শুরু করে, যুদ্ধক্ষেত্র সবখানেই চলে গুজবের নীতি! আর এর মাধ্যম হিসেবে সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। খুব সহজেই কোনো ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেটি দেখে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছড়ানোর আশঙ্কাও থাকছে। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল ঘটার সঙ্গে সঙ্গে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এত বেশি সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক ভিডিও এবং বার্তা ছড়িয়েছে যে, কোনটা ঠিক আর কোনটা ফেইক সেটি যাচাই করারও সময় পাওয়া যাচ্ছে না। খুব সতর্ক থাকতে হবে। ফ্যাক্ট চেক যতক্ষণে ভিডিও চেক করে ফেক বলছে, ততক্ষণে সেটি এত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে যে, সত্যি ঘটনা আর কেউ দেখছে না বা দেখা ও জানার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে একটি অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে কিছু মানুষ থেকে যাচ্ছে। যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ চলছে, সেখানেও গুজবের ডালাপালা শক্তভাবে বসে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধেও প্রোপাগান্ডার ব্যাপক প্রভাব ছিল। প্রোপাগান্ডা রয়েছে সবখানে। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সবখানেই এভাবে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, নিজের স্বার্থ হাসিল করা। এটি সারা বিশে^ই কম-বেশি প্রভাব ফেললেও আমাদের দেশে এর প্রভাব খুব মারাত্মক। প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা না করা এবং সামনে যা দেখছে বা শুনছে সেটিই একবাক্যে বিশ্বাস করা এই দুইয়ের কারণেই বেশি সমস্যা হচ্ছে। বিচার-বিবেচনা ছাড়াই বিশ্বাস করা, এক ধরনের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে।
শুধু বিশ্বাস করে চুপ থাকলে সমস্যা ছিল না। সেটি আবার শেয়ার করে দিচ্ছি। ফলে খুব দ্রুত কিছু বুঝে ওঠার আগেই, একটি ভুল উত্তেজনাকর ভিডিও সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। শুরু হচ্ছে উত্তেজনা। মানুষ ইচ্ছা করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম এখন ‘এআই’ বা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’। এত নিখুঁতভাবে ছবি বা ভিডিওগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে যে, সাধারণ মানুষের বোঝার উপায়ই থাকে না, কোনটা সত্যি আর কোনটা অসত্য। এমন কিছু বিষয় থাকে, যা যাচাই করার আগেই খুব বেশি ভাইরাল হয়ে যায়। গুজবের বা মিথ্যা তথ্যের ডালপালা আছে, পাখা আছে। আপনি ভাবতেও পারবেন না, সত্যের যত না দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা আছে তার থেকেও দ্রুতগতিতে গুজব ছড়ায়। দেশের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে, গুজব যেন ডালপালা মেলে বসে আছে। প্রতি ঘণ্টায় গুজব দেখছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হলো, গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। গুজব তথ্য কেউ যাচাই করছে না। না করেই অন্যের কাছে শেয়ার করছে। তারপর সেখান থেকে আরেকজনের কাছে। এভাবে একটি ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ফলে আমাদের ভুল ধারণা জন্মে। আমি অবাক হই, এই প্রজন্ম যারা সব যুক্তি-বিচার বিশ্লেষণের ক্ষমতা রাখে তারা সবচেয়ে বেশি গুজবে বিশ্বাস করছে। এক সময় কিন্তু এর উল্টোটা ছিল। যারা লেখাপড়া জানত না, গ্রামে বসবাস করত তারা গুজব দ্রুত বিশ্বাস করত। এখন হচ্ছে এর উল্টোটা। ক্ষতিটা এখানেই বেশি হচ্ছে। এর শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যা বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করছি, যা বোঝানোর চেষ্টা করছি সেটাই অনেকে বুঝছে। অথচ একটু যদি বিবেচনা করা যায়, তাহলেই কিন্তু এর সত্যতা বের করা সম্ভব। সত্য-মিথ্যা খুঁজে বের করা যায়। সেটাও আমাদের হাতের মধ্যেই আছে। অন্তত দেশের জন্য হলেও আমরা না হয় একটু তথ্য যাচাই করে নিলাম।
কোনো সেনসেটিভ তথ্য কেন আমরা সহজেই বিশ্বাস করব, সেই সহজ প্রশ্নটি মাথায় ঢোকে না। গুজব একটি পোকা, যা কানের কাছে সারাক্ষণ বাজতে থাকে। এই যে চলমান ঘটনা প্রবাহ তা নিয়েও প্রচুর গুজব ছড়িয়েছে এবং ছড়াচ্ছে। যারা গুজব ছড়ায়, তাদের থেকে একটু সাবধান থাকতে পারি। আমি নিজেও সেগুলো দেখি। কিন্তু বুঝতে পারি, এটা গুজব। মনে হয়, গুজব ছড়াতে এবং তা বিশ্বাস করতে আমরা বেশ পছন্দ করি। আগে-পিছে ভাবি না অথবা সত্য মিথ্যার ধার ধারি না। মোটামোটিভাবে একটা কথা ছড়িয়ে দিতে পারলেই হলো। এই যেমন এর আগে ছড়ানো হলো, ব্যাংকে টাকা রাখলে তা থাকবে না টাইপের মিথ্যা কথাগুলো ছড়ানো। কে, কীভাবে এটা ছড়িয়েছে জানি না। কিন্তু এটা যে একটা অসৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, সেটা বোঝা যায়। দেশের অর্থনীতি বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে সুগঠিত। অথচ পরিকল্পিতভাবে সেটাকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি করোনার মধ্যেও দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল। দেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে এসব গুজব ছড়ানো হয়। কে কী বলল, কেন বলল, তা যে অসম্ভব ব্যাপার এসব বিবেচনা না করেই আমরা ছুটতে থাকি। রসিয়ে রসিয়ে গল্প করি। গুজব ছড়িয়ে ফায়দা লুটতেও আমরা ওস্তাত। এমনকি বিশ্বে যখন ক্রান্তিকাল চলছে, তখন সবার স্বচ্ছ থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নানা ধরনের গুজব বাতাসে ভেসে বেড়ায়। যা রীতিমতো বিশ্বাস করা কষ্টকর, তবু সেই গুজবে নানা অনাকাক্সিক্ষত কর্মকা- ঘটছে। মানুষের প্রাণ যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। সেসব গুজবে কান দিয়ে মানুষ ও দেশের ক্ষতি হচ্ছে। গুজব বলতে সাধারণত বোঝায় কোনো ব্যক্তি, কোনো গোষ্ঠী বা কোনো দলের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত বা উদ্দেশ্যমূলক কোনো অপপ্রচার, যার পেছনে বেশিরভাগ সময়ই কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকে। কোনো অসত্য তথ্য বা প্রচার যা কারও ক্ষতির কারণ হতে পারে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায়ও বিঘ্ন হতে পারে। আমরা খুব সহজেই গুজবে কান দিই। আমাদের শিক্ষাদীক্ষার কোনো কিছুর প্রয়োগ না করেই বিশ্বাস করে নিচ্ছি। কোনো কিছু শুনলেই বিশ্বাস করতে হবে? যেখানে চোখে দেখেও আজকাল বিশ্বাস করাটা বেশ কষ্টকর। সেখানে কারও কাছ থেকে কিছু শুনেই সেটা বিশ্বাস করা এবং তা নিজের মতো প্রচারের কাজে লেগে পড়া? চিলে কান নিয়েছে শুনে কান উদ্ধারের জন্য সবাই চিলের পেছনে ছুটি। একবারও নিজের কানে হাত দিয়ে পরীক্ষা করার কথা মনে করি না!
যে বা যারা গুজব ছড়ায়, তারা আসলে শিক্ষিত এবং পরিকল্পিত। এর থেকেও বেশি আইটি জ্ঞানসম্পন্ন। আর এটা যখন অল্পশিক্ষিত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তখন আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে। আজকাল গুজব ছড়াতে ডিজিটাল মাধ্যমই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় গুজব ছড়াতে। কারণ এসব মাধ্যমে কোনো অসত্য তথ্য প্রচার করা দ্রুততর এবং তুলনামূলক গুজব সৃষ্টিকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সাময়িক নিরাপদে অবস্থান করতে পারে। গুজবের ক্ষেত্র আজকাল বিস্তৃত হয়েছে। রাজনীতি, ধর্মীয়, সামাজিক বা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে গুজব ছড়ানো হয়। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য থাকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার কাজে লাগিয়ে হীন স্বার্থ উদ্ধার করা। গুজব ক্ষেত্রবিশেষে অনেক নিরীহ মানুষের প্রাণ সংশয় পর্যন্ত হতে পারে। দাঙ্গা-হাঙ্গামার মতো পরিস্থিতিরও তৈরি হতে পারে। এটা হয়েছেও। গুজবের প্রধান মাধ্যম হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। আমাদের সাবধান থাকতে হবে। কর্তৃপক্ষও এসব গুজব সৃষ্টি করে আইনশৃঙ্খলার ব্যাঘাত যারা ঘটাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে নিজে থেকেই আমরা সচেতন হতে পারি। একবার দেশের স্বার্থের কথা যদি আমরা চিন্তা করি তাহলেই সব সম্ভব। যখন আমরা প্রত্যেকেই সমস্যা মুখোমুখি রয়েছি তখন গুজব ছড়িয়ে অন্যকে বিভ্রান্ত করার মতো খারাপ চিন্তা না করে একে অপরকে সাহায্য করার কথা ভাবি। সঠিক তথ্য দিই এবং নিজেও গ্রহণ করি।
গুজবে কান না দিয়ে সামনে দিনগুলোতে নিজেদের সচেতন করি। কোনো গুজব বিশ^াস করার আগে প্রত্যেকের উচিত, সেই ছড়ানো বিভ্রান্তি একবার হলেও ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া। গুজব হয় মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। যার পেছনে ছোটা কেবল সময়ের অপচয়ই নয় বরং থাকে জীবনের ঝুঁকি। আজকাল ডিজিটাল মাধ্যমে গুজব সৃষ্টি হচ্ছে খুব বেশি। যেহেতু আমাদের সবার হাতে হাতে এন্ড্রয়েট চালিত মোবাইল ফোন রয়েছে এবং শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত অধিকাংশ মানুষের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তাই মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য ছড়িয়ে দিতে বেশি সময় প্রয়োজন হয় না। খুব দ্রুত একজন থেকে অন্য জনে ছড়িয়ে পড়ে। তাই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া একটু সময়ের ব্যাপার। ডিজিটাল মাধ্যমে গুজব সৃষ্টিকারীরা প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষ হয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট, কোনো দুর্ঘটনা বা জনগণ বিভ্রান্ত হওয়া ছাড়া গুজব থেকে আর কিছু পাওয়া যায় না। তাই গুজবকে ত্যাগ করে সত্যের পথ ধরি। আমরা যারা গুজবকে সত্য বিবেচনা করে ছড়িয়ে দিই, তারা যেন সচেতন হই। অপতথ্য ছড়ানোর আগে একবার যেন ভাবি, এটা কি সম্ভব না অসম্ভব। নিজস্ব বিবেক দিয়ে যেন চিন্তা করি কোনটি গুজব আর কোনটি সত্য, তখনই উত্তর বেরিয়ে আসবে। সম্ভবত আগামীতে রাজনীতিতে প্রোপাগান্ডা হবে আরও বেশি ধ্বংসাত্মক এবং আক্রমণাত্মক। সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে, সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে। বিষোদগার ছড়ায় এমন ভিডিও বা ছবি বিশ্বাস করার আগে, যাচাই করা জরুরি। সত্যকে খুঁজতে হবে। সত্যই সুন্দর, সত্যে আশ্রয় করে মানব জাতি বেঁচে থাক। গুজবে কেবল ধ্বংস। সেটি আজ না হয় কাল। শুধু নিজেকে বিশ্বাস করুন।
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
