মানুষ শান্তির খোঁজে সারা জীবন ব্যয় করে। কেউ মনে করে বিপুল অর্থ-সম্পদের মাঝেই সুখ-শান্তি নিহিত। কেউ ক্ষমতার উচ্চ আসনে বসে শান্তি খোঁজে বেড়ায়। আবার কেউ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলে প্রশান্তি লাভের আশায়। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম, বাহ্যিক চাকচিক্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেক মানুষের অন্তরের অস্থিরতা গভীর হতে থাকে। দিন শেষে মানুষ যখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিভৃত কক্ষে ফিরে আসে, তখন চারপাশের কোলাহল থেমে গেলেও মনের ভেতরের ঝড় থামে না। চোখে ঘুম আসে না। বুকের ভেতর থাকে অজানা চাপা কষ্ট। অদৃশ্য ভয় ও শূন্যতা কুরে কুরে খেতে থাকে। হাসিতেও ঝুলে থাকে বিষন্নতা। আত্মবিশ্বাসের আবরণেও লুকিয়ে থাকে হতাশা। বর্তমান বিশ্বে এই মানসিক অস্থিরতা কেবল দুই-একজন মানুষের সমস্যা নয়। বরং এটা একটা মহামারীর রূপ ধারণ করেছে।
বাহ্যিক উন্নয়ন, প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও আধুনিকতার চমক সত্ত্বেও মানুষের হৃদয় থেকে শান্তি হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবারে অশান্তি, সম্পর্কের টানাপড়েন, তরুণ সমাজের হতাশা, উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা ও আত্মিক শূন্যতা দিন দিন বেড়েই চলছে। মানুষ সবকিছু পেয়েও যেন কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছে।
প্রশান্তির চাবিকাঠি : প্রশান্তির চাবিকাঠি আমাদের নাগালের বাইরের কোনো জিনিস নয়। মহান আল্লাহ মানবজাতিকে অন্ধকারে ছেড়ে দেননি। বরং তিনি আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন ইসলাম নামক এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়, বরং এটি এমন এক সুশীতল ছায়া, যেখানে ক্লান্ত হৃদয় খুঁজে পায় প্রশান্তি, বিপর্যস্ত মন খুঁজে পায় স্থিরতা, আর দিশেহারা মানুষ পায় জীবনের প্রকৃত অর্থ।
মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা : মানুষের ফিতরাত তথা সৃষ্টিগত স্বভাবের মধ্যেই প্রশান্তি লাভের তীব্র আকাক্সক্ষা গেঁথে দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তাদের ইমানের সঙ্গে আরও ইমান বৃদ্ধি পায়।’ (সুরা ফাতহ ৪)
শান্তি কোনো বাহ্যিক উপকরণের নাম নয়। দেশের মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে দেখা যায়, নুন আনতে পান্তা ফুরালেও অনেকের চেহারায় অদ্ভুত এক তৃপ্তি থাকে। আবার আলিশান প্রাসাদে থেকেও অনেকের ঘুম ওষুধের ওপর নির্ভরশীল। এখান থেকেই প্রমাণ হয়, শান্তি বাজার থেকে কেনা যায় না, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বিশেষ নেয়ামত।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও অস্থিরতার কারণ : আজকের সমাজে আমরা এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার, পরশ্রীকাতরতা এবং আকাশচুম্বী উচ্চাকাক্সক্ষা আমাদের শান্তিময় জীবনকে বিষিয়ে তুলছে।
জাগতিক মোহ ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা : পাশের বাসার মানুষটি নতুন গাড়ি কিনলে নিজের ভেতরে যে অতৃপ্তি তৈরি হয়, তা থেকেই অশান্তির শুরু। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের চেয়ে নিম্নস্তরের মানুষের দিকে তাকাও (পার্থিব বিষয়ে), তবেই তোমরা আল্লাহর নেয়ামতকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে না।’ (সহিহ মুসলিম)
পারিবারিক বিচ্ছেদ ও একাকিত্ব : পরিবার ভেঙে আলাদা হয়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে একাকিত্ব বাড়ছে। আপনজনদের সান্নিধ্যহীন জীবন মানুষকে হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সুদ ও হারামের প্রভাব : দেশের অর্থনীতিতে সুদের ব্যাপকতা বস্তুগুলো থেকে বরকত কেড়ে নিয়েছে। হারাম উপার্জন মানুষের মনে অশান্তি ও অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়।
প্রকৃত শান্তির উৎস : মহান আল্লাহ মানব জাতিকে শান্তির একটি চিরন্তন ফর্মুলা দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরেই অন্তরগুলো প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ ২৮)
জিকির মানে শুধু তাসবিহ পাঠ নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মহান আল্লাহকে স্মরণে রাখা। একজন রিকশাচালক যখন তপ্ত রোদে ঘামতে ঘামতে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলেন, তখন তার হৃদয়ে যে শীতলতা নেমে আসে, তা কোটি টাকার এসিতেও সম্ভব নয়। মানুষের ইমানি শক্তিই তাদের অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও শান্ত রাখে।
মুমিনের প্রশান্তির মহৌষধ : অস্থিরতা দূর করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো নামাজ। যখনই রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো সংকটে পড়তেন, তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। তিনি বেলাল (রা.)-কে বলতেন, ‘হে বেলাল, আজানের মাধ্যমে আমাদের প্রশান্তি দাও।’ (আব দাউদ)
দিন-রাতের সঠিক ব্যবহার : শান্তিময় জীবনের জন্য মহান আল্লাহ একটি রুটিন করে দিয়েছেন। সুরা নাবায় বলা হয়েছে, ‘আমি রাতকে করেছি আবরণস্বরূপ এবং দিনকে করেছি জীবিকা অর্জনের সময়।’ (সুরা নাবা ১০-১১)
আধুনিক বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের এক বড় সমস্যা হলো রাত জাগা। পশ্চিমা সংস্কৃতি অনুকরণ করতে গিয়ে আমরা রাতকে কাজের এবং দিনকে ঘুমের সময় বানিয়ে ফেলেছি। এর ফলে শরীরে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা সরাসরি মানসিক বিষন্নতার কারণ। ইসলামে এশার পর দ্রুত ঘুমানো এবং শেষ রাতে বা ভোরে জাগ্রত হওয়ার প্রতি উৎসাহ রয়েছে, যা শারীরিক ও মানসিক শান্তির অন্যতম সোপান।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা
