ষড়ঋতুর দেশে হাওরের যৌবনকাল বোধহয় বর্ষা। একদিন ঘোর বর্ষায় আমার সবসময়ের ভ্রমণসঙ্গী মাও বলছিল বেশ কিছু দিন কোথাও যাওয়া হয় না। কোথাও যেতে পারলে মন্দ হয় না। ভাবলাম কোথাও বেড়িয়ে আসি। যেই ভাবনা, সেই কাজ।
বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে, সঙ্গে মেঘের হুঙ্কা, তার মাঝেই আমরা বেরিয়ে পড়ি ঘুরতে, কিন্তু কোথায় যাব ঠিক করতে পারছিলাম না। আমাদের ড্রাইভার মামুন বলল, দাদা চলেন হাকালুকি হাওরে ঘুরে আসি। আমি ভাবলাম বর্ষায় হাওর অপরূপ রূপ ধারণ করে তাই আর না বললাম না। একদিকে বাইরে ভীষণ বৃষ্টি আর অন্যদিকে গাড়িতে আমরা শুনছি পাপিয়া সারোয়ারের ‘আজি ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে...’ এক অন্য রকম পরিবেশ। আমরা এগিয়ে চলছি বৃষ্টিস্নাত মহাসড়ক বেয়ে দূরের পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে ভেসে চলা কার্পাশ তুলার মতো মেঘ, দেখছি গাড়ির জানালা দিয়ে। মাইজগাঁও আসার পর বৃষ্টি কিছুটা কমেছে হঠাৎ দেখলাম পাশদিয়ে ট্রেন অতিক্রম করে যাচ্ছে। ড্রাইভার মামুনকে বললাম একটু সামনে গিয়ে নাশতা করব। ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারে পৌঁছে আল মুমিন রেস্টুরেন্টে বসে নাশতা করলাম গরম গরম পরোটা আর ডিম ভাজি দিয়ে। এরপর গেলাম নৌকাঘাটে, মানুষ কম তার পরেও বড় ছইওয়ালা ট্রলার নিলাম। চারদিকে থইথই পানি, সাগরের মতো ঢেউ আর দূরে দূরে ছোট ছোট হাওর দ্বীপ যে কারোর মনকে মুগ্ধ করবে। হাওর হলো এমন একটি বিস্তীর্ণ এলাকা, বৃষ্টি মৌসুমে থইথই পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়, সমুদ্রের মতো ঢেউ থাকে। হাকালুকি হাওর মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার পাঁচটি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত। ২৩৮টি বিল ও নদী মিলে তৈরি হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার একরের এ হাওর। বর্ষাকালে একে হাওর না বলে সমুদ্র বলা যায় অনায়াসে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ হাওরে নানা প্রজাতির মাছ রয়েছে। বর্ষায় থইথই পানিতে নিমগ্ন হাওরের জেগে থাকা উঁচু স্থানগুলোতে অনেক পাখির আশ্রয়স্থল। হাকালুকি হাওরের বিলের পাড় ও কান্দায় বিদ্যমান জলাভূমি-বন পানির নিচে ডুবে গিয়ে সৃষ্টি করেছে ডুবন্ত বন, যা মাছের আশ্রয়স্থল। বর্ষা মৌসুমে হাওর এলাকার মানুষ মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থাকে, এমন কি শিশু-কিশোরাও। আমাদের নৌকার মাঝি সুনীল শাহ আব্দুল করিমের গান ধরলেন ...গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান...। তিনি আরও জানালেন, হাকালুকি হাওরের নামকরণ নিয়ে মজার কল্পকাহিনি। হাওর শব্দের বংশপূর্ব শব্দ ছিল সাগর। এই সাগর থেকে পর্যায়ক্রমে সাগর>সাওর>হাওর শব্দে রূপান্তর হয়েছে। প্রচলিত একটা তথ্য আছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মহারাজা ওমর মানিক্যের সৈন্যদের ভয়ে বড়লেখা এলাকার কুকি প্রধান হাঙ্গর সিং তখনকার এই হাওরের জঙ্গলপূর্ণ ও কর্দমাক্ত এলাকায় ‘লুকি দেয়’ অর্থাৎ লুকিয়ে থাকে। কালক্রমে এলাকার নাম হয় ‘হাঙ্গর লুকি বা হাকালুকি’। আরও একটা কাহিনি প্রচলিত আছে। প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রচ- এক ভূমিকম্পে ‘আকা’ নামে এক নৃপতি ও তার রাজত্ব মাটির নিচে তলিয়ে যায়। এই তলিয়ে যাওয়া নিম্নভূমির নাম হয় ‘আকালুকি বা হাকালুকি’। আরও এক ইতিহাস থেকে শোনা যায়, বড়লেখা উপজেলার পশ্চিমাংশে ‘হেংকেল’ নামে আধিবাসী বাস করত। ওই আধিবাস এলাকার নাম ছিল ‘হেংকেলুকি’। এটি পরে ‘হাকালুকি’ নাম ধারণ করে। জনশ্রুতি আছে, এক সময় এই হাওরের কাছাকাছি বসবাসকারী কুকি ও নাগা উপজাতি তাদের ভাষায় এই হাওরের নামকরণ করে ‘হাকালুকি’ যার পূর্ণ অর্থ লুকানো সম্পদ। বর্ষাকালে এই হাওর ধারণ করে এক অনবদ্য রূপ।
পড়ন্ত বিকেলে রক্তিম সূর্যের আলো, আরেক দিকে ত্রিপুরা রাজ্যের ছোট-বড় পাহাড়ের ঢালে লালচে আকাশ দেখছিলাম। গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছে রাখাল। কোথাও জেলেরা তীরে নৌকা ভিড়াচ্ছে। একদল জেলে নৌকার বৈঠা কাঁধে একপ্রান্তে জাল অন্যপ্রান্তে মাছের ঝুড়ি বেঁধে গাঁয়ের বাজারের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। পাখির দলও ফিরছে তার ঠিকানায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য বিদায় নেবে। ঘনিয়ে আসবে সন্ধ্যা। আর আমাদেরও বাড়ি ফেরার সময় হলো।
কীভাবে যাবেন
হাকালুকি যাওয়ার সবচেয়ে ভালো ও আরামদায়ক যাত্রা হলো রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া উপবন এক্সপ্রেস। নামতে হবে মাইজগাঁও স্টেশনে। এটি সিলেটের ঠিক আগের স্টেশন। ভাড়া নেবে ৩৪০ টাকা। মাইজগাঁও থেকে দুটি উপায়ে যাওয়া যায় হাকালুকি।
এক. ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার হয়ে : মাইজগাঁও থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার, বাজারে নেমেই আল মুমিন রেস্টুরেন্টে বসে যাবেন। সেখানে ফ্রেশ হয়ে, হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা করে সামনের নৌকাঘাটে চলে আসুন। এখান থেকে নৌকা দরদাম করে উঠে পড়ুন সারা দিনের জন্য। বড় গ্রুপ হলে (১০/১৫ জন) বড় ছইওয়ালা ট্রলার নিন। দিনপ্রতি ভাড়া নিতে পারে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। কিছু খাবার এবং পানি কিনে নিন, কারণ হাওরে কোনো দোকানপাট পাবেন না। এবার নৌকায় উঠে কুশিয়ারা নদী পাড়ি দিয়ে হাওরে ঘুরে বেড়ান। কুশিয়ারা পারি দিতে প্রায় ৪০ মিনিট লাগবে।
দুই. গিলাছড়া বাজার হয়ে : কুশিয়ারা নদীর ৪০ মিনিট সেভ করতে মাইজগাঁও থেকে সরাসরি ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে চলে আসতে পারেন গিলাছড়া বাজারে। এখান থেকেই হাওর শুরু। তবে সমস্যা হলো, এখানে বড় নৌকা পাওয়া যায় না। নৌকা আনতে হবে সেই ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার থেকেই।
