দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও দলকে সুসংগঠিত করতে চলতি বছর জাতীয় কাউন্সিল করতে যাচ্ছে বিএনপি। দিন তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও আগামী ডিসেম্বরেই দলটির সপ্তম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘ ৯ বছর পর অনুষ্ঠেয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে জেলা কমিটির পাশাপাশি এর আওতাধীন কমিটিগুলো সম্পন্ন করার কার্যক্রম শুরু করেছেন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরা। ঈদুল আজহার পর জেলা কমিটিগুলোর পুনর্গঠন কাজ শুরু হবে এবং জাতীয় কাউন্সিলের আগে সম্পন্ন হবে। বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলায় রাজপথে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম কাউন্সিলের মাধ্যমে এমন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চান বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপি নেতারা বলছেন, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন, সাংগঠনিক পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন বিষয়ে এবারের কাউন্সিলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এবারের কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসবে। বিশেষ করে বিগত দিনে সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাদের দল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া কাউন্সিলের আগে ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণ বিএনপিসহ অঙ্গ সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।
তারা জানান, বিগত দিনে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের দলীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই কর্মসূচি ছিল সংকুচিত। সব আয়োজন ছিল সাদামাটা। তাই নিজেদের অনুকূল পরিবেশের কারণে এবার থাকবে ভিন্ন মাত্রা। উৎসবের আমেজে এবার কাউন্সিল হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারা অনুযায়ী ৮ বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা তারেক রহমান। তবে গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর গত ৯ জানুয়ারি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিনি ভারমুক্ত হয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। তার নেতৃত্বে এবার দলের প্রথম কাউন্সিল হবে।
সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিল হয়েছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কাউন্সিলের উদ্বোধন করেছিলেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হামলা-মামলার কারণে দীর্ঘকাল তা সম্ভব হয়নি। এর আগে ২০০৯ সালে দলের পঞ্চম কাউন্সিল হয়েছিল। আগামী কাউন্সিল হবে সরকারে থেকে দলের দ্বিতীয় কাউন্সিল। বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলের চতুর্থ কাউন্সিল করেছিল ১৯৯৩ সালে। ২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সর্বশেষ কাউন্সিলের পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থেকে ভারমুক্ত হন তিনি। এবারের কাউন্সিলে বিএনপি নতুন মহাসচিব পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল জানিয়েছেন, ‘আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। কাউন্সিলের পর অবসর নিতে চাই। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।’
কাউন্সিল সামনে রেখে মহাসচিব পরিবর্তনের বিষয়টিও এখন আলোচিত হচ্ছে। অনেকেই আভাস দিয়েছেন ‘নতুন মহাসচিব খোঁজা হচ্ছে’। তবে বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর। তিনিই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।
কাউন্সিলের বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে দলের হাইকমান্ড চলতি বছর দলের জাতীয় কাউন্সিল করার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশের সাংগঠনিক জেলাগুলোর কমিটি ও জেলার আওতাধীন ইউনিটগুলোর কমিটি পুনর্গঠন কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে দলের পক্ষ থেকে। আমরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছি। ঈদের পরে জোরেশোরে কাজ শুরু হবে বলে আশা করছি।’
এদিকে গত শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে (কেআইবি) বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সভায় চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাংগঠনিক কার্যক্রম, আগামী দিনের রাজনৈতিক কৌশল এবং সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় বিএনপি চেয়ারম্যান দলীয় নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করে তা পালনের নির্দেশনা দেন বলে জানিয়েছেন সভায় অংশ নেওয়া নেতারা। সভায় অংশ নেওয়া বিএনপির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নেতাদের বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে সরকারের গৃহীত কর্মসূচি জনগণকে জানানোর জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতাদের সাংগঠনিক কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে অঙ্গ সংগঠনগুলোর যে কমিটি রয়েছে সেগুলোর মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। এগুলোর খসড়া কমিটি চেয়ারম্যান করেছেন। এখন যাচাই-বাছাই চলছে। কাউন্সিলের আগেই অঙ্গ সংগঠনগুলোর নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে দলের কাউন্সিল নিয়ে আলোচনা হয়। সর্বশেষ কাউন্সিল কবে হয়েছে সে সম্পর্কে চেয়ারম্যান জানতে চেয়েছেন। তাকে সর্বশেষ কাউন্সিলের দিন তারিখ জানানো হয়েছে।’
সভায় অংশ নেওয়া একটি অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলতি বছরই কাউন্সিল করার বিষয়ে চেয়ারম্যান আগ্রহ দেখিয়েছেন। সে হিসেবে ডিসেম্বরে দলের কাউন্সিল হতে পারে।’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলতি বছরের মধ্যেই দলের সপ্তম কাউন্সিল হবে। ইতিমধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চলতি বছরের মধ্যেই কাউন্সিল করার কথা বলেছেন। সে মোতাবেক বছরের শেষ দিকে ডিসেম্বরে দলের কাউন্সিল হবে।’
এর আগে গত ৪ এপ্রিল শনিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘খুব দ্রুত আমরা দলকে কাউন্সিলের দিকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করব। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কাউন্সিল নিয়ে আলোচনা হয়।’ তিনি বলেন, বৈঠকের বিষয়টাই সাংগঠনিক ছিল। দলের রেগুলার কাজকর্ম চালু রাখার জন্য আমাদের দলের চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছিলেন। আমাদের দল সরকার গঠনের পর যে কর্মসূচি নিয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে তিনি দলের মতামত অর্থাৎ স্থায়ী কমিটির মতামত নিয়েছেন। সেই সঙ্গে অনেক সদস্য তাদের কিছু কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।’
এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কাউন্সিলের সব প্রস্তুতি গুছিয়ে আনতে আমাদের অন্তত কয়েক মাস সময় লাগবে।’
