নদীশাসনের টাকায় মুজিব ভাস্কর্য

আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

‘বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’-এর নাম ব্যবহার করে প্রকল্প গ্রহণ ও যেনতেন উপায়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় তার কন্যা শেখ হাসিনার সর্বশেষ শাসনামলে একটি সাধারণ প্রবণতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এর অংশ হিসেবে সারা দেশে মুজিব ভাস্কর্য নির্মাণ ও ম্যুরাল তৈরির হিড়িক পড়ে। বহু মূল প্রকল্পে বরাদ্দ না থাকলেও প্রকল্প থেকে টাকা সরিয়ে ভাস্কর্য ও ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়েছে, এমন উদাহরণ অনেক। পদ্মা বহুমুখী সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার মতো স্থানীয় পর্যায়ের তুলনামূলকভাবে ছোট প্রকল্প থেকেও টাকা সরিয়ে ভাস্কর্য ও ম্যুরাল নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গত এক বছরের অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।

পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রায় শেষ হয়ে এলে দেখা গেল সেতুটির ‘উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের’ জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। সেতুর দুই প্রান্তে মুজিবের দুটি ভাস্কর্য নির্মাণের প্রসঙ্গ সামনে আনলেন তখনকার সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এজন্যও কোনো বরাদ্দ ছিল না। তখন প্রকল্পের নদীশাসন অংশের অর্থ থেকে ১১৭ কোটি  টাকা কেটে নিয়ে নদীর দুই পাড়ে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়। এই অর্থ থেকেই সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের খরচ মেটানো হয়। শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তার সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুদক তদন্ত শুরু করে। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আখতারুল ইসলাম ওই সময়ে অনুসন্ধানের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

সংস্থাটির একজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি টিম এসব অভিযোগের অনুসন্ধান করছে। অনুসন্ধানে সেতু প্রকল্পের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধান শেষে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে এবং তার ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তেই নয়, মুজিববর্ষকে সামনে রেখে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বেতার ভবন ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে এবং ৬৪ জেলায় ব্যাপকভাবে ভাস্কর্য নির্মাণ ও ম্যুরাল তৈরি করা হয়েছে। সারা দেশে স্থানীয় পর্যায়ে সব মিলিয়ে ১০ হাজারের বেশি ম্যুরাল ও ভাস্কর্য নির্মাণে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এক্ষেত্রে অর্থ সংস্থান করা হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং জেলা পরিষদের তহবিল থেকে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে।

দুদকের তথ্য বলছে, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে নদীর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে টোলপ্লাজার কাছে দুটি উদ্বোধনী কমপ্লেক্স নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সেতু কর্তৃপক্ষ। সেখানে আধুনিক স্থাপত্যের বিভিন্ন নকশা, উদ্বোধনী স্তম্ভ এবং মুজিব ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাস্কর্য স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী উদ্বোধনী কমপ্লেক্সের স্থাপত্য ও কাঠামোগত নকশা যাচাইয়ের পর তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়। সেখান থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর নদীশাসন কাজের জন্য নিযুক্ত চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড প্রকল্পের নির্মাণসংশ্লিষ্ট চারটি ব্যত্যয় ঘটানোর জন্য (ভ্যারিয়েশন অর্ডার) অনুমোদন চায়। নদীশাসন কাজের মোট চুক্তি মূল্যের কোনো পরিবর্তন না করে চারটি ‘ভ্যারিয়েশন অর্ডার’ তৎকালীন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর অনুমোদনের মাধ্যমে সম্পন্ন করে সেতু কর্তৃপক্ষ। এই প্রক্রিয়ায় নদীশাসনের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি অংশ ভাস্কর্য নির্মাণ ও উদ্বোধনী আয়োজনে ব্যয় করা হয়।

দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সেতু প্রকল্পের প্রতিটি অংশের জন্য আলাদা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু উদ্বোধন ও ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য কোনো বরাদ্দ ছিল না। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বাজেট না থাকায় নদীশাসনের জন্য রাখা বরাদ্দ থেকে ১১৭ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, নদীশাসন কাজের অর্থ ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। সেই অর্থ ভাস্কর্য নির্মাণ ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্যয় করা শুধু অনিয়ম নয়, এটি দুর্নীতি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। জানা গেছে, পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের নদীশাসন কাজের মূল চুক্তি মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রায় ৮ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এরপর প্রথম দফায় প্রায় ৮৭৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় প্রায় ২৪৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা বাড়ানো হয়। এতে মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ হাজার ৮৩৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়।

শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালনের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত মুজিববর্ষ ঘোষণা দেয়। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে মুজিববর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় এর মেয়াদ প্রায় ৯ মাস বাড়িয়ে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, মুজিববর্ষ উপলক্ষে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জেলা-উপজেলা প্রশাসন, এমনকি অনেক স্থানে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়েও ম্যুরাল ও ভাস্কর্য নির্মাণ হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত