দেশের শিক্ষাবিষয়ক একটি দৈনিক এবং অনলাইন পত্রিকা গুরুত্বপূর্র্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে। তথ্যটি তাদের নিজেদের অনুসন্ধানের ফল, যা শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খবরটি হচ্ছে, চলমান এসএসসি পরীক্ষার বাংলা খাতা নেননি ২৩৫ জন শিক্ষক। ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকরা অনেকে বোর্ড খাতা পরীক্ষণ করতে চান না। প্রথমত তারা প্রাইভেট পড়ান। যাতে সমস্যা না হয়, সে জন্য তারা বোর্ড খাতা আনতে চান না। একে তারা বিরাট এক ঝামেলা মনে করেন। অথচ যা আনপ্রফেশনাল। আপনি একজন শিক্ষক অথচ পাবলিক পরীক্ষার খাতা পরীক্ষণ করবেন না। তাহলে আপনি শিখবেন কী করে? পাবলিক পরীক্ষার খাতা পরীক্ষণ করা মানে একজন শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা, একজন শিক্ষক সেখানে বহু ক্লু পেয়ে যান যেগুলো তার নিজের শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারেন, নিজের পেশাগত জীবনে বিভিন্নভাবে সেগুলো ব্যবহৃত হবে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী উত্তরপত্রে উত্তর সঠিকভাবে লিখতে পারে না, কীভাবে লিখতে হবে অনেকেই জানে না। তাদের শ্রেণিকক্ষে সেগুলো শেখাতে হয়। বোর্ডের খাতা থেকে অভিজ্ঞতা ও বাস্তব প্রমাণ নিয়ে একজন শিক্ষক তার নিজের শিক্ষার্থীদের সেগুলো শেখাতে পারেন। বোর্ডের খাতা পরীক্ষণ করা মানে এক ধরনের গবেষণা, প্রকৃত গবেষণা করা।
যেসব শিক্ষক এগুলোর ধারণ ধারেন না, তারা প্রকৃত শিক্ষক নন। দ্বিতীয়ত, তারা ভাবেন বোর্ডের খাতা দেখা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। এটি আরেক ধরনের হীন মানসিকতা। সরকার এখানে কী করতে পারে? সরকার শাস্তির কথা বলতে পারে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে শাস্তি দিতেও পারে। এবার এ পর্যন্ত যারা খাতা নেননি তাদের সময় দেওয়া হয়েছে, ওই সময়ের মধ্যে তারা খাতা না নিলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সরকার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। শিক্ষকদের নিজেদেরই উচিত, শিক্ষাদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বোর্ডের খাতা পরীক্ষণ করা। আমি দেখেছি, বহু সহকর্মী বোর্ডের খাতা নিতেন না, কারণ তাদের প্রাইভেট পড়াতে সমস্যা হবে। তাদের আমি প্রকৃত শিক্ষক বলি না। তারা প্রাইভেট পড়াবেন না, সেটিও বলছি না। কিন্তু খাতা তো দেখতে হবে। বহু লার্নিং সেখানে, এটি তাদের বুঝতে হবে। প্রথমত, শিক্ষকের এ ব্যাপারে মোটিভেটেড হতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও একটা তাগিদ থাকতে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক উপযুক্ত হলে, তারা যাতে বোর্ডের খাতা পরীক্ষণ করেন। বোর্ড কর্তৃপক্ষ তথা সরকারকেও এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উপায় চিন্তা করতে হবে। ট্রাডিশনাল উপায়ে খাতা পরীক্ষণ করার বিষয়টিতে পরিবর্তন করতে হবে। বোর্ডে একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয় কীভাবে খাতা দেখা হবে, কোন প্রশ্নে কীভাবে নম্বর দেওয়া হবে। কিন্তু সেই সভায় আমি নিজে দেখেছি অনেক শিক্ষক উপস্থিত থাকেন না, তারা শুধু বস্তাভরে খাতা নিতে আসেন বোর্ডের মিটিং শেষ হয়ে যাওয়ার পর। অনেকে নিজ শিক্ষার্থী, আত্মীয়-স্বজনদের দ্বারা খাতা পরীক্ষণ করিয়ে থাকেন। আর নিজেরা বহু ঝামেলার মধ্যে খাতা দেখেন বলে সেগুলোও অনেক সময় সঠিক হয় না। আর একটি বড় বিষয় হচ্ছে, প্রতি বছর বোর্ডের খাতা যে বছর মূল্যায়ন করা হয়, পরীক্ষকরা তার পরের বছরও সম্মানী পান না। এটি বোর্ডের কর্মকর্তা কর্মচারীদের গাফিলতি, গুরুত্ব না দেওয়া এবং অযোগ্যতা। ফলে বহু শিক্ষক খাতা পরীক্ষণে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। বোর্ডগুলোকে এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প পথও বের করতে হবে। অনেকে মনে করতে পারেন, শিক্ষক ছাড়া খাতা দেখা ঠিক হবে না। এই গ্রুপটি হবে অত্যন্ত প্রফেশনাল, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং তাদের কাজ প্রয়োজন আছে। প্রাইভেট পড়ানো শিক্ষকদের চেয়ে এবং অনভিজ্ঞ শিক্ষকদের চেয়ে এই গ্রুপটি অনেক ভালোভাবে খাতা পরীক্ষণ করতে পারবেন। প্রধান পরীক্ষক, বিষয়ভিত্তিক সিনিয়র শিক্ষক, এক্সপার্ট, বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সবাই ঘুরে ঘুরে দেখবেন, আলোচনা করবেন। তাতে খাতা দেখা ও নম্বর প্রদানের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকবে, বেশি হেরফের হবে না, যা বর্তমানে হয়; কারণ শিক্ষকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসে নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী খাতা দেখেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে খাতা দেখাসহ অন্যসব কাজও তারা করেন, ফলে সঠিক মূল্যায়ন খুব কম ক্ষেত্রেই হয়। রেজাল্ট তৈরি করা সংক্রান্ত অন্য কাজগুলো বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারী করবেন কিংবা আগে থেকে কম্পিউটারে করা থাকবে, শিক্ষকরা শুধু মূল্যায়ন করবেন।
প্রচলিত নিয়মে শিক্ষককে সব করতে হয়, ফলে বড় সময়ের বড় একটি অংশ এসব কাজ করতে চলে যায়। মূল্যায়ন করা হলে খাতাগুলো চেক রি-চেক করবে আরেকটি গ্রুপ, তারাও বোর্ডে অবস্থান করবেন। একজন শিক্ষক তার মুডের ওপর, অভিজ্ঞতা ও অনভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে খাতা দেখেন, যা বহু ধরনের অসামঞ্জস্যতা সৃষ্টি করে। এগুলো থেকে আমরা মুক্ত হবো, যদি বিকল্প বিষয় চালু করতে পারি। তাতে পরীক্ষার ফলও তাড়াতাড়ি দেওয়া সম্ভব হবে। সুতরাং বিশিষ্টজনদের আরও মতামত নিয়ে, পরীক্ষার খাতা দেখা সংক্রান্ত সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। যাতে শিক্ষকদের মধ্যে ওই বিষয়ে আগ্রহ জন্ম নেয়। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষকদের অনীহা যেন নতুন কোনো জটিলতার সৃষ্টি না করে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষকদের যে করেই হোক পরীক্ষার খাতা পরীক্ষণে অনীহা দূর করতে হবে।
