রাজনীতিতে পুরনো এক সংজ্ঞায় বলা হতো, এটি জনসেবার মাধ্যম। কিন্তু চারপাশের বাস্তবতার দিকে তাকালে, এই সংজ্ঞা এখন প্রায় কল্পকথার মতো শোনায়। আজকের পৃথিবীতে পশ্চিম থেকে পূর্ব, উন্নত থেকে উন্নয়নশীল, সব ধরনের রাষ্ট্রেই যে রাজনৈতিক ধারাটি সবচেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তার করেছে, তার নাম ‘পপুলিজম’। আর এই পপুলিজম কোনো সুচিন্তিত দর্শন নয়, কোনো আদর্শ নয় এটি একটি কৌশল। জনগণের আবেগকে পুঁজি করে ক্ষমতার মসনদ দখলের সুচতুর কৌশল। বিশে^র দিকে তাকালে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বলে শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘদিনের হতাশাকে ভোটে রূপান্তরিত করেছেন। ভারতে নরেন্দ্র মোদি হিন্দুত্বের আবেগকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে, টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসেছেন। হাঙ্গেরিতে ভিক্তর অরবান ইউরোপীয় উদারনৈতিক মূল্যবোধকে ‘বিদেশি চাপিয়ে দেওয়া আদর্শ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নিজের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে বৈধতা দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ আরও কাছের। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতির একটি রাজ্যেও ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি কতটা গভীরে প্রোথিত হতে পারে, সেটা সাম্প্রতিক বছরগুলো দেখিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ এই স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এখানে পপুলিজমের শিকড় আরও গভীরে।
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে, গ্রামবাংলায় একটি বিশেষ ধরনের প্রচারণা ছড়িয়ে পড়েছিল। শেখ হাসিনা নাকি কুকুরের মাথায় টুপি পরিয়েছেন, ভারতে গিয়ে সিঁদুর পরেছেন, এমন ছবিসহ লিফলেট গ্রামের ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময় প্রমাণিত হয়, সেগুলো ছিল পরিকল্পিত মিথ্যাচার। কিন্তু সেই মিথ্যার ভেতরেও, একটি গভীর পপুলিস্ট কৌশল কাজ করছিল। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে, তাদের রায়কে নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে দেওয়া। তখন হয়তো বিষয়টা স্পষ্ট ছিল না, কিন্তু পেছন ফিরে তাকালে বোঝা যায়, সেই প্রচারণা গ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর কম প্রভাব ফেলেনি। যেটাকে ‘emotional framing’ বলা যায়। অর্থাৎ তথ্যের বদলে অনুভূতিকে বার্তা হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল, সেটিই এখানে ঘটেছিল। জর্জ লাকফ তার Don’t Think of an Elephant গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, রাজনৈতিক বার্তা তথ্যের চেয়ে অনুভূতি ও ভাষার কাঠামোর ওপর নির্ভর করে বেশি মানুষ তথ্য বিচার করে নয়, বরং পরিচিত আবেগের ছাঁচে ফেলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০১ সালের ওই লিফলেট প্রচারণা ঠিক এই কৌশলের একটি প্রয়োগ ছিল। অপরদিকে শেখ হাসিনার দীর্ঘ ষোলো বছরের শাসনামলেও পপুলিজম ভিন্নরূপে হাজির ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বারবার রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। একাত্তরের প্রতি জাতির যে আবেগ ও শ্রদ্ধা, তাকে দলীয় স্বার্থের হাতিয়ারে রূপান্তরিত করতে করতে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, এই চেতনার কথা উচ্চারণ করলেই, একটি বড় অংশের মানুষ তাকে দলীয় প্রচারণা ভাবতে শুরু করেছে। আর্নেস্তো লাক্লাউ তার ‘Populist Reason’ গ্রন্থে বলেন, পপুলিস্ট রাজনীতি সবসময় একটি শক্তিশালী প্রতীক বা স্মৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এবং সেই প্রতীকটিকে নিজের একচেটিয়া সম্পত্তি হিসেবে দাবি করে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ব্যবহার এই তত্ত্বের একটি জীবন্ত উদাহরণ। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কার্ড ও ভাতাকেন্দ্রিক কার্যক্রমকে ঘিরে যে রাজনীতি গড়ে উঠেছে, সেটিও এই ধারারই সম্প্রসারণ। বিষয়টা অনেকটা পোস্টপেইড ভোট সংগ্রহের মতো। পপুলিস্ট রাজনীতির সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো, এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাস করে নেয়। স্টিভেন লেভিটস্কি ও লুকান ওয়ে তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, পপুলিস্ট শাসকরা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র ও নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসেন। একজন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যখন সভায় বলেন, তারা দলের মানুষ, তখন সেটা শুধু একটি বেফাঁস মন্তব্য নয়, সেটা একটি প্রতিষ্ঠানের আত্মসমর্পণের প্রকাশ্য ঘোষণা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে যখন বলা হয় যে, রাজনীতি করলে ভিসি হওয়া যাবে না, এটা কোথায় আছে?
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তাহলে ক্লাস ছেড়ে রাজনীতি আমি করব না কেন? আর তাই শিক্ষকরা ক্লাসরুমের চেয়ে নেতার পেছনে বেশি সময় দেন আর শিক্ষার্থীরাও মেধার চেয়ে রাজনৈতিক সংযোগকে বড় পুঁজি মনে করতে শেখেন। এই সংকট কেবল বাংলাদেশের নয়। ফারিদ জাকারিয়া তার ‘The Future of Freedom’ গ্রন্থে সতর্ক করেছিলেন, গণতন্ত্র শুধু ভোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা illiberal democracy’তে পরিণত হয়। বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই চিত্রের প্রতিফলন বারবার দেখা গেছে। ‘পপুলিস্ট রাজনীতি’ মানুষকে কখনো প্রকৃত রাজনৈতিক শিক্ষা দেয় না। এই বৃত্ত ভাঙার পথ সহজ নয়। তবে শুরুটা হতে পারে, স্বীকার করার মধ্য দিয়ে পপুলিজম কোনো সমাধান নয়, এটি একটি মনোযোগ সরানোর কৌশল মাত্র। দীর্ঘমেয়াদে যে রাজনীতি নাগরিককে ভোটার নয়, একজন সচেতন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করবে, যে রাজনীতি কার্ড ও স্লোগানের বদলে নীতি ও প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রে রাখবে, সেই রাজনীতির চর্চা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু সেই পথ কে দেখাবে, কোথা থেকে সেই উদ্যোগ আসবে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
লেখক: প্রভাষক গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
