বিদ্যুতের দাম

নিম্ন ও মধ্যবিত্তকে বাঁচাতে হবে

আপডেট : ১৪ মে ২০২৬, ০৭:৪৭ এএম

সীমিত আয়ের নাগরিকদের পকেটে ছুরি মারার উপায় বের করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধাপ পরিবর্তনের মাধ্যমে আয় বাড়িয়ে লোকসান সামলাতে একটি আবদার করেছে সংস্থাটি। তারা টার্গেট করেছে, প্রধানত অনিবার্য প্রয়োজনে যেসব গ্রাহক তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের। মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই শ্রেণির গ্রাহকই প্রায় ৬০ ভাগ। কারা তারা? যারা মূলত সীমিত আয়ের মানুষ কৃষক, সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবী অথবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী; অর্থনৈতিক বিবেচনায় যাদের আয় নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পর্যায়ে পড়ে। এমন পরিবারের অধিকাংশই বৈদ্যুতিক বাতি, ফ্যান, রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, ইন্টারনেটের রাউটার ও মোবাইল ফোনের চার্জে বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত রাখে। ওয়াশিং মেশিন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার এই পরিবারগুলোর প্রায় সবার ক্ষেত্রে অনেকটা বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে। কী করতে চায় পিডিবি? বর্তমান ব্যবস্থায় তৃণমূলের গ্রাহকরা শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, যারা প্রধানত অতি সীমিত আয়ের গ্রাহক। এর পরের দুই ধাপের গ্রাহক শূন্য থেকে ৭৫ এবং ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, যারা মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির।

২০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীরা উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত গ্রাহক হিসেবে পরিচিত। দেশ রূপান্তরে গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিডিবি বিদ্যুৎ বিল ধার্য করার ক্ষেত্রে আবাসিক গ্রাহকের দ্বিতীয় ধাপ শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট করতে চায়। এর মাধ্যমে খুচরা পর্যায়ে ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা আয় বাড়বে বলে মনে করে সংস্থাটি। সমস্যা হলো, শূন্য থেকে ৫০ পর্যন্ত যে ধাপটি এখন চালু আছে, তাতে সরকার ভর্তুকি দেয়। আর ২০০ ইউনিট পর্যন্ত যে দুটি ধাপ, সেখানে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি; যারা কৃষক, শ্রমজীবী ও চাকরিজীবীসহ বৃহত্তর গণমানুষের বড় অংশ। স্বল্প আয়ের নানা পেশার এই মানুষগুলোর বাস নগর-গ্রাম মিলিয়ে। সরকার যেখানে এমন মানুষদের জীবনে একটু স্বস্তি দিতে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলছে, সেখানে পিডিবি চলছে উল্টোপথে। ধাপ পরিবর্তনের মাধ্যমে পিডিবি বিদ্যুৎ বিল বাবদ এই ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নিতে চায়। এতে তাদের ওপর যে আর্থিক চাপ পড়বে, তা সামলানোর মতো আয় বাড়বে না বহু পরিবারে। পিডিবি উচ্চবিত্তের গ্রাহকদের টার্গেট করেনি। কেন? নাকি উচ্চবিত্তের নাগরিকদের সঙ্গে পিডিবির বিদ্যুৎ-প্রেম আছে? আরেকটি দিক হলো, বিদ্যুতের যারা খেলাপি গ্রাহক এবং মিটার রিডারদের ব্যবহার করে বিদ্যুৎ চুরির জন্য যারা সাধারণত অভিযুক্ত হন, তাদের বেশিরভাগ উচ্চবিত্তের। অথচ তাদের বিষয়ে পিডিবির কোনো মাথাব্যথা নেই। কৃষি খাত যে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাতেও নেই ভ্রুক্ষেপ।

সরকারের মূল নীতি হচ্ছে, সীমিত আয়ের বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের যতটা সম্ভব ভর্তুকি দিয়ে তাদের জন্য উৎপাদনমুখী ও স্বাভাবিক জীবনের সুযোগ বজায় রাখা। কারণ, কৃষিসহ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে গ্রাম-নগরের পরিশ্রমী এই মানুষরা, যাদের শ্রমে-ঘামেই আমরা খাদ্যশস্য থেকে শুরু করে যাবতীয় নিত্যপণের জোগান পেয়ে থাকি। ধাপ পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানো অন্যায্য হবে, সেটা পিডিবি ও সংশ্লিষ্টদের উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের বিবেচনায়, নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর আর্থিক চাপ না দিয়ে উচ্চবিত্তের ধাপে নজর দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের জন্য আরও কয়েকটি প্রশ্ন জনমনে আছে। বিশেষ করে, একবার ডিমান্ড-নোট চার্জ নেওয়ার পর প্রতিটি বিলেই কেন আবার এ খাতে টাকা নেওয়া হয়? বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী নিজেই মিটার কিনে দেন। তাহলে মিটার ভাড়া তারা কেন মাসে মাসে দেবেন? বিদ্যুতে মানুষকে স্বস্তি দিতে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত