ইসরায়েল ও লেবানন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়াতে সম্মত হয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে দুই দিনব্যাপী আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) নিশ্চিত করেছে। এই চুক্তির ফলে দুই দেশের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আরেকটু দীর্ঘায়িত হলো।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এই আলোচনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা আশা করি এই আলোচনা দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে। এর মাধ্যমে একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার পূর্ণ স্বীকৃতি নিশ্চিত হবে এবং তাদের যৌথ সীমান্তে প্রকৃত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।’
গত ১৬ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে চুক্তি সত্ত্বেও ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে অনবরত পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। এমনকি গত বুধবারও লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৮টি শিশুসহ মোট ২২ জন নিহত হয়েছেন।
সংকট নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আগামী জুন মাসে তারা পুনরায় এই আলোচনার ‘রাজনৈতিক প্রক্রিয়া’ শুরু করবে। এর পাশাপাশি, আগামী ২৯ মে পেন্টাগনে উভয় দেশের সামরিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা’ শুরু করা হবে বলে মুখপাত্র টমি পিগট যোগ করেন।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে উভয় পক্ষই। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার এই আলোচনাকে ‘গঠনমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম তার দেশের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে এই আলোচনায় ‘আমাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে আমরা সমস্ত আরব এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনকে একত্রিত করার’ আশা রাখছি।
তবে ১৬ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকেই লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তে হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই গোলাগুলির খবর পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরায়েল বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে তাদের বিমান ও কামান হামলা আরও জোরদার করেছে। ইসরায়েলের দাবি, তারা হিজবুল্লাহর যোদ্ধা এবং তাদের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালাচ্ছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বেসামরিক নাগরিক এবং চিকিৎসকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ এনেছে, যা ইসরায়েল জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যৎ হিজবুল্লাহ হামলা নস্যাৎ করতে তারা দক্ষিণ লেবাননে একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করতে চায়।
এই বাফার জোন তৈরির প্রক্রিয়ায় দক্ষিণ লেবাননের বিস্তূর্ণ এলাকার পুরো গ্রাম ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, যা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজায় যে ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছিল তার সঙ্গে মিল রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ধ্বংসযজ্ঞ ‘যুদ্ধাপরাধের’ শামিল হতে পারে। ইসরায়েল বরাবরের মতোই এই অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে।
এদিকে হিজবুল্লাহও বসে নেই। তারা রকেট এবং ড্রোন ব্যবহার করে লেবাননের অভ্যন্তরে থাকা ইসরায়েলি সেনা এবং উত্তর ইসরায়েলে নিজস্ব পাল্টা হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ লেবানন মূলত দেশটির শিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্রভূমি, যেখান থেকে হিজবুল্লাহ তাদের সিংহভাগ সমর্থন পেয়ে থাকে। বর্তমানে এই অঞ্চলটি ক্রমাগত ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের শিকার হচ্ছে।
ভয়াবহ এই সংঘাতের কারণে লেবাননজুড়ে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন- অর্থাৎ ১০ লাখেরও বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। বাস্তুচ্যুতদের বেশিরভাগই দক্ষিণ লেবানন, পূর্বাঞ্চলীয় বেকা উপত্যকা এবং বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলী (যা দাহিয়েহ নামে পরিচিত) এলাকার বাসিন্দা, যেখানে হিজবুল্লাহর শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে।
চলতি বছরের ২ মার্চ এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। এর ঠিক দুই দিন আগে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর একটি হামলা চালিয়েছিল। তারই প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে। জবাবে ইসরায়েল লেবাননজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা এবং দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে অন্তত ২,৮৯৬ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, একই সময়ের মধ্যে তাদের ১৮ জন সেনা এবং ৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি
