বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের পেস আক্রমণের ত্রাতা মারুফা আক্তার। ২০২৩ সালে আইসিসির বর্ষসেরা উদীয়মান নারী ক্রিকেটারের পুরস্কারে মনোনয়ন পেয়েছিলেন বাংলাদেশের এই পেসার। গ্রামের সাধারণ কৃষক পরিবারের একজন মেয়ে হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া পরিসরে পৌঁছানোর এই যাত্রা দেশের লাখো মেয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে। লিখেছেন আহমেদ রবিন
একটি মেয়ে কৃষিজমি তৈরিতে তার বাবাকে সহায়তা করছে। শরীরের অর্ধেকটা তার কাদায় একাকার। তবু সমস্ত শক্তি দিয়ে মই টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বছর কয়েক আগে এমনই এক ছবি সামাজিক মাধ্যমে রীতিমতো ভাইরাল হয়েছিল। মেয়েটির নাম মারুফা আক্তার। আজ যিনি ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চ দাপিয়ে বেড়ানো এক তুখোড় ক্রিকেটার।
ফসলের মাঠ থেকে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে মারুফার গল্পটা ঠিক এমনই। যে গল্প শুনে সবাই বিস্মিত হতে বাধ্য হবে। অনুপ্রাণিত তো করবেই। মাত্র ২১ বছর বয়সে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের পেস আক্রমণের ত্রাতা তিনি। অথচ জাতীয় দলে এসেছেন ৪ বছরও হয়নি। এই অল্প সময়েই বেশ জোরালোভাবে নিজের ছাপ রেখেছেন। ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর ডানেডিনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় মারুফার। ১১ ডিসেম্বর একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে হয় ওয়ানডে অভিষেক। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ৩৫টি ওয়ানডে ও ৩৭টি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন এই ডানহাতি মিডিয়াম পেসার। দুই ফরম্যাটে তার উইকেট যথাক্রমে ২৯ ও ২৮টি।
এই পরিসংখ্যান আসলে একজন মারুফাকে বোঝাতে মোটেও যথেষ্ট নয়। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ নারী দল স্পিনার নির্ভর। পেস বোলিংয়ে একটা লম্বা সময় পর্যন্ত কোনো বিকল্পই ছিল না। এমন একটা সংকটময় সময়েই মারুফার আবির্ভাব ঘটে, যিনি শুধু জোরে বল করতে পারেন এমন নয়। দেখার মতো রানআপ, বলের ওপর দারুণ নিয়ন্ত্রণ ও সুইং একজন প্রকৃত পেসারের মধ্যে যেসব গুণাগুণ থাকা প্রয়োজন, তার সবই যেন বিদ্যমান মারুফার মধ্যে। সবচেয়ে বেশি যেটা বিদ্যমান, সেটি হলো জয় করার মানসিকতা। যে মানসিকতার জন্য মারুফা আজ এত দূর। না হলে করোনাকালে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করে ভাইরাল মেয়েটি এত অল্প সময়ে দেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার হয়ে উঠতে পারেন? যাকে নিয়ে বিশ্বনন্দিত ক্রিকেট ব্যক্তিত্বরা প্রশংসা করতে বাধ্য হন।
ঢেলাপীর গ্রামের মেয়েটি
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার ঢেলাপীর গ্রামের মেয়ে মারুফা। যে সময়টায় তিনি নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছিলেন, তখনো তার নামের সঙ্গে ক্রিকেটার পরিচয়টা ছিল। কারণ তখন তিনি বয়সভিত্তিক দলে খেলতেন। তবে পয়ের নিচে মাটি খুঁজে পাওয়ার জন্য লড়ছিলেন। সেই লড়াইটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের ছিল। একদিকে বাবা আইমুলল্লাহ একজন বর্গাচাষি। তাদের চার ভাই-বোনকে নিয়ে বড় সংসার সামলাতে বেশ হিমশিম খেতে হয় বাবাকে। সেখানে মারুফার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা তার জন্য ছিল বিলাসিতা। তাছাড়া এলাকার লোকজনও মারুফার ছেলেদের মতো করে খেলার মাঠে ছুটে বেড়ানো পছন্দ করত না।
তবে এসব বাধা উপেক্ষা করেই মারুফা বিভিন্ন জায়গায় খেলতেন। সৈয়দপুরে স্থানীয় কোচ ইমরানের কাছে হাতেখড়ি হয় তার। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্পেও সুযোগ পান তিনি। কিন্তু সেবার ভর্তি হওয়া হয়নি তার। তবে পরের বছর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে মেয়েদের প্রিমিয়ার লিগে সুযোগ পান মারুফা। যদিও সেবার একটি মাত্র ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাতে নিজেদের প্রতিভার ঝলকটা মেলে ধরতে পারেননি। তবে খুলনা বিভাগী দলের হয়ে করা দারুণ পারফরম্যান্সে ২০১৯ সালেই অনূর্ধ্ব-১৮ দলে সুযোগ পান। সেখান থেকে জায়গা করে নেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলে।
প্রথম উড়ান
করোনার বাধায় থমকে সে সময় থমকে গিয়েছিল অনেক কিছু। মারুফা সেই সময় বাড়ি ফিরে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে মন দিয়েছিলেন। তবে মনে তার ক্রিকেটার হওয়ার বাসনা জেগে ছিল। আর স্বপ্নের পেছনে ছুটতে জানলে, একদিন না একদিন সাফল্য আসেই। মারুফার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। ২০২১ সালে বিকেএসপিতে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। ২০২২ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে দুর্দান্ত বোলিংয়ে হন সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। ওই বছর ডিসেম্বরেই ১৭ বছর বয়সে সিনিয়র জাতীয় দলে অভিষেক হয় তার। ২০২৩ সালের শুরুতে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে মারুফা দারুণ নৈপুণ্য মেলে ধরেন। নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ছিলেন তিনি। ওই পারফরম্যান্স তাকে সিনিয়র জাতীয় দলেও নিয়মিত মুখ হয়ে উঠতে বড় ভূমিকা রাখে। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ শেষ করে ফেব্রুয়ারিতে সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যান মারুফা। এই আসরও বসেছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়। নিজের বিশ্বকাপ অভিষেক ম্যাচেই ২৩ রান খরচায় ৩ উইকেট শিকার করে আলো কাড়েন তিনি। টি-টোয়েন্টিতে এখন পর্যন্ত সেটিই তার সেরা বোলিং রেকর্ড। ২০২৩ সালেই ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডেতে প্রথম জয়ের স্বাদ পায়। যে ম্যাচে ২৯ রানে ৪ উইকেট শিকার করে ম্যাচসেরা হন মারুফা। ওয়ানডেতে এখন পর্যন্ত সেটিই তার সেরা বোলিং।
প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপ
২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো খেলেছেন ওয়ানডে বিশ্বকাপ। এখানেও নজর কাড়েন তিনি। যদিও পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জয় ছাড়া দল হিসেবে বাংলাদেশ তেমন ছাপ রাখতে পারেনি। তবে একজন মারুফা টুর্নামেন্টজুড়েই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ইনিংসের প্রথম ওভারের শেষ দুই বলে দারুণ দুটি ডেলিভারিতে তুলে নিয়েছিলেন উমাইমা সোহেল ও সিদরা আমিনের উইকেট। সুবাদে ম্যাচসেরার
স্বীকৃতিটাও মারুফার হাতে ওঠে। মারুফার ওই দুটি উইকেট শিকারের ভিডিও শেয়ার করে লঙ্কান কিংবদন্তি লাসিথ মালিঙ্গা প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন।
আইসিসির প্রামাণ্যচিত্রে মারুফা
মারুফার এই হার না মানা জীবনের গল্প নিয়ে ২০২৫ সালে আইসিসি একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করে। ৩ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের এই প্রামাণ্যচিত্র অনেককে কাঁদিয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রে মারুফা বলেছিলেন, ‘আমার বাবা কৃষক। আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। যে গ্রামে বড় হয়েছি, সেখানকার লোকজনকেও আমরা সেভাবে পাশে পাইনি। বেশির ভাগ মানুষই আমাদের কোনো অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করত না। কারণ ভালো জামাকাপড় নেই আমাদের। একটা সময় ঈদে নতুন জামা কেনার মতো টাকাও ছিল না আমাদের।’ কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদেছিলেন মারুফাও। তিনি ক্রিকেট খেলতেন বলে প্রতিবেশীদের চক্ষুশূলও ছিলেন তার বাবা-মা। মারুফা বলেছিলেন, ‘আব্বা যখন বাসায় থাকত না, বাজারে যেত, তখন মাকে এসে অনেকে অনেক কথা বলত। অনেক খারাপ খারাপ কথা বলত, যেগুলো মেনে নেওয়ার মতো না। আমার মা রুমে গিয়ে কান্না করত। আমি আবার গিয়ে এক কোনায় কান্না করতাম, যে আমার জন্য এত কিছু হচ্ছে।’
তবে মারুফা স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি। ‘আমি ভাবতাম আমি একদিন ভালো কিছু করে দেখাব। এখন আমরা যে রকম অবস্থাতে এসেছি, অন্যরা এখন সে রকম জায়গায় নেই। আমি যেভাবে ফ্যামিলিকে সাপোর্ট করছি, অনেক ছেলেও হয়তো সেভাবে পারছে না। এটা অন্যরকম একটা শান্তি দেয়। ছোটবেলায় ভেবেছি মানুষ কবে আমাদের এভাবে দেখবে, হাততালি দেবে। কিন্তু এখন টিভিতে নিজেকে দেখলে লজ্জা লাগে।’ বলতে বলতে হেসেছিলেন মারুফা।
মারুফার সেই হাসিমুখটাই এখন সবাই দেখতে চায়। বল হাতে চিতার বেগে ছুটে ব্যাটারদের বুকে কাঁপন ধরাচ্ছেন, উইকেটপ্রাপ্তির পর দুহাত মেলে সতীর্থদের সঙ্গে আনন্দে মাতছেন। মারুফা মানেই এখন এমন ছবি। বিশ্বমঞ্চে যিনি আরও সফল হবেন, এমনটাই চাওয়া সবার।
