কলম্বিয়া মানেই গতি, ছন্দময় ফুটবল আর ল্যাটিন ঘরানার শৈল্পিক আক্রমণের এক অনবদ্য প্রদর্শনী। বিশ্ব ফুটবলে ‘লা ট্রাইকলর’ খ্যাত দলটির ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে। সেবার তরুণ হামেশ রদ্রিগেজের জাদুকরী পারফরম্যান্সে পুরো ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তারা। উরুগুয়েকে বিদায় করে সেবারই প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে (শেষ আট) পৌঁছায় কলম্বিয়া, আর টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ৬টি গোল করে গোল্ডেন বুট জিতে নেন হামেশ।
তবে ২০১৪ সালের সেই সোনালি সাফল্যের পর কলম্বিয়ার বিশ্বমঞ্চের পথচলাটা ছিল বেশ উত্থান-পতনের। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে তারা রাউন্ড অব ১৬-তে ইংল্যান্ডের কাছে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয়। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে, যখন বাছাইপর্বের বাধা টপকাতে না পেরে মূল পর্ব থেকেই দুর্ভাগ্যজনকভাবে ছিটকে যায় তারা। তবে কাতার বিশ্বকাপের টিকিট না পাওয়ার সেই তীব্র আক্ষেপ ভুলে এবার দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কলম্বিয়া। ২০২৬ বিশ্বকাপের দক্ষিণ আমেরিকান বাছাইপর্বে প্রধান কোচ নেস্তর লরেঞ্জোর অধীনে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে রুখে দিয়ে দাপটের সঙ্গে মূল পর্বের টিকিট কেটেছে তারা। উত্তর আমেরিকার মাটিতে নিজেদের ইতিহাসের সেরা কোয়ার্টার-ফাইনালের সাফল্যকে ছাড়িয়ে নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যেই এবার মাঠে নামবে দলটি।
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে কলম্বিয়া ফুটবল দল বর্তমানে এক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দলটিতে অভিজ্ঞ বিশ্বমানের তারকা এবং একঝাঁক উদীয়মান তরুণ প্রতিভার এক অসাধারণ সংমিশ্রণ ঘটেছে, যা তাদের এবার টুর্নামেন্টের অন্যতম বিপজ্জনক দল হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। বর্তমানে ফিফা র্যাংকিংয়ের ১৩ নম্বর স্থানটি ধরে রাখা কলম্বিয়ার ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ র্যাংকিং ছিল ৩ (আগস্ট ২০১৬)।
নেস্তর লরেঞ্জোর দর্শন
২০২২ সালের জুলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর কলম্বিয়ার ফুটবলকে সম্পূর্ণ পুনরুজ্জীবিত করেছেন প্রধান কোচ নেস্টর লরেঞ্জো (যিনি খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৯০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে রানার্স-আপ হয়েছিলেন)। তিনি দলের ঐতিহ্যবাহী ল্যাটিন পাসিং ফুটবলের সঙ্গে আধুনিক গতি ও কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবলের এক দারুণ ভারসাম্য প্রবর্তন করেছেন। লরেঞ্জোর কৌশলে রক্ষণভাগ নিিদ্র রেখে উইং দিয়ে বিদ্যুৎগতির আক্রমণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তিনি খেলোয়াড়দের মাঠে নিজেদের স্বাভাবিক সহজাত ড্রিবলিং ও সৃজনশীলতা প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা দেন, যার প্রমাণ মিলেছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভেনিজুয়েলার বিপক্ষে তাদের ৬-৩ ব্যবধানের মহাকাব্যিক জয়টিতে, যেখানে লুইস সুয়ারেজ একাই করেছিলেন ৪ গোল।
মূল ভরসা হামেশ ও দিয়াজ
বর্তমান কলম্বিয়ার আক্রমণভাগের মূল নিউক্লিয়াস এবং বায়ার্ন মিউনিখের বিশ্বমানের উইঙ্গার লুইস দিয়াজ। বাছাইপর্বে দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৭টি গোল করা এই তারকার বাম প্রান্ত ধরে ক্ষিপ্রগতি এবং ডিফেন্স ভেঙে ফেলার ক্ষমতা কলম্বিয়ার আক্রমণের প্রধান অস্ত্র। আর মাঝমাঠে দলের আসল চালিকাশক্তি ও অভিজ্ঞ অধিনায়ক ৩৪ বছর বয়সী হামেশ রদ্রিগেজ। বর্তমানে মিনেসোটা ইউনাইটেডে খেলা এই প্লে-মেকারের নিখুঁত পাসিং ও সেট-পিস নেওয়ার দক্ষতা এখনো প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি। তাদের সঙ্গে মাঝমাঠে দারুণ ভরসা দিচ্ছেন বেনফিকার শক্তিশালী সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার রিচার্ড রিওস। রক্ষণভাগে ইয়ারি মিনা ও ডাভিনসন সানচেজ এবং গোলপোস্টে অভিজ্ঞ ক্যামিলো ভারগাস সামলাবেন কলম্বিয়ার দুর্গ।
