মহান আল্লাহর প্রজ্ঞা, প্রভুত্ব, একত্ববাদ ও পরিপূর্ণ গুণাবলির অন্যতম নিদর্শন হলো, তিনি কিছু সৃষ্টিকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনার প্রতিপালক যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন।’ (সুরা কাসাস ৬৮)
মহান আল্লাহর এই নির্বাচনের অন্যতম দিক হলো, সময় ও স্থানের নির্বাচন। সময়ের ক্ষেত্রে আমরা দেখি, আল্লাহ হজের মাস ও সম্মানিত মাসগুলোকে অন্যান্য মাসের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন। রমজানকে বছরের সব মাসের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। জুমার দিনকে সপ্তাহের সব দিনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। কোরবানির দিনকে অন্যান্য দিনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। আবার শবেকদরকে অন্যান্য রাতের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন।
স্থানগুলোর মধ্যেও আল্লাহ কিছু স্থানকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। এর অন্যতম উদাহরণ হলো, তিনি পৃথিবীর দেশগুলোর মধ্য থেকে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে নির্বাচন করেছেন পবিত্র নগরী মক্কাকে।
হে আল্লাহর বান্দারা! আজ আমরা এমন এক সময় প্রত্যক্ষ করছি, যখন সম্মানিত মাসের সঙ্গে সম্মানিত শহরের মিলন ঘটেছে। কতই না সুন্দর এই সমাবেশ, যা হৃদয়কে আনন্দিত করে এবং ইমানি অনুভূতিকে জাগ্রত করে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র কাবাগৃহকে আল্লাহ তোমাদের জন্য (জীবনে) প্রতিষ্ঠার উপকরণ করে দিয়েছেন। আর হারাম মাস, কোরবানির উদ্দেশে কাবায় প্রেরিত পশু এবং সেটাকে চিহ্নিত করার গলার মালাকেও। এটা এ জন্য যে, যাতে তোমরা জানতে পারো, যা কিছু আসমান-জমিনে আছে, আল্লাহ তা জানেন। আল্লাহ সব বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অবহিত।’ (সুরা মায়েদা ৯৬)
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘মুসলমানের কল্যাণ ও স্থিতি নির্ভর করে তাদের নবীর রেখে যাওয়া নিদর্শন ও শরিয়তের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার মাধ্যমে। তাদের দ্বীন-দুনিয়ার কল্যাণ, বিপদ-আপদ দূর হওয়া এবং অকল্যাণ থেকে নিরাপদ থাকা নির্ভর করে শরিয়তের বাস্তবায়ন ও তার প্রতিষ্ঠার ওপর। আর যখন তারা তা পরিত্যাগ করে, তা থেকে বিমুখ হয়, অন্য কিছুকে বিচারক মানে এবং আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কিছুকে গ্রহণ করে, তখনই তাদের ধ্বংস, দুর্ভোগ ও বিপদ নেমে আসে।’
হে ভাইয়েরা! সম্মানিত মাসগুলোর মর্যাদা সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জাহেলি যুগের আরবরাও এসব মাসকে সম্মান করত। তারা এ মাসগুলোতে রক্তপাত করত না, যুদ্ধ করত না, কারও সম্মানহানি করত না। এমনকি কেউ যদি তার পিতার হত্যাকারীকেও পেয়ে যেত, তবু তাকে হত্যা করত না।
হে আল্লাহর বান্দারা! মহান আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য মহিমান্বিত কিছু মৌসুম ও মর্যাদাপূর্ণ কিছু দিন নির্ধারণ করেছেন, যাতে তা অনুগত বান্দাদের জন্য কল্যাণ লাভের ক্ষেত্র হয় এবং প্রতিযোগিতাকারীদের জন্য প্রতিযোগিতার ময়দান হয়। ইবনে রজব (রহ.) বলেন, ‘এমন কোনো মর্যাদাপূর্ণ মৌসুম নেই, যাতে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য বিশেষ কোনো ইবাদত নির্ধারিত নেই। আবার এসব মৌসুমে আল্লাহর রহমতের বিশেষ কিছু পরশও রয়েছে, যা তিনি নিজ অনুগ্রহে যাকে ইচ্ছা দান করেন। সুতরাং সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে এসব মৌসুমকে কাজে লাগায় এবং তাতে বিভিন্ন ইবাদতের মাধ্যমে তার প্রতিপালকের নৈকট্য অর্জন করে। আশা করা যায়, সে এসব রহমতের পরশ লাভ করবে এবং এমন সৌভাগ্য অর্জন করবে, যা তাকে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ রাখবে।’
হে আল্লাহর বান্দারা! আমাদের অনুভব করা উচিত, আমরা এখন জিলহজের বরকতময় প্রথম দশ দিনের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছি। মহান আল্লাহ এর দশ রাতের শপথ করে বলেছেন, ‘শপথ ফজরের এবং দশ রাতের।’ (সুরা ফজর ১-২) অধিকাংশ আলেমের মতে, এই দশ দিনই হলো সেই নির্ধারিত দিনসমূহ, যেগুলোতে মহান আল্লাহ গবাদিপশুর ওপর তার নাম স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের মাঝে হাজ্জের ঘোষণা দাও, তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে, আর সব (পথক্লান্ত) শীর্ণ উটের পিঠে, বহু দূরের গভীর পর্বত সংকুল পথ বেয়ে। যাতে তারা তাদের জন্য (এখানে রাখা দুনিয়া ও আখেরাতের) কল্যাণগুলো প্রত্যক্ষ করতে পারে। আর তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিজিক দান করেছেন, নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে। কাজেই তোমরা (নিজেরা) তা থেকে খাও এবং দুস্থ-অভাবীদের খাওয়াও।’ (সুরা হজ ২৭-২৮)
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এই দশ দিনই সেই সময়, যেই সময়ে মহান আল্লাহ মুসা (আ.)-কে পূর্ণতা দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি মুসার জন্য ত্রিশ রাত নির্ধারণ করেছিলাম এবং তা আরও দশ রাত দিয়ে পূর্ণ করলাম। ফলে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় পূর্ণ হলো চল্লিশ রাতে।’ (সুরা আরাফ ১৪২) এই দশ দিনের মধ্যেই রয়েছে আরাফা ও কোরবানির দিন।
এই দশ দিন মর্যাদার দিক থেকে অত্যন্ত উচ্চ। এ সম্পর্কে আমরা আর কি-ই বা বলতে পারি! এর প্রকৃত মর্যাদা কোন ভাষায় তুলে ধরা সম্ভব! তবে আমাদের জন্য যথেষ্ট হলো, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী। তিনি বলেছেন, দুনিয়ার সর্বোত্তম দিন হলো এই দশ দিন। (মুসনাদে বাজজার)
তিনি আরও বলেছেন, আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কোনো দিনের আমল নেই। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়? তিনি বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়, তবে সেই ব্যক্তির কথা আলাদা, যে নিজের জান ও সম্পদ নিয়ে বের হলো, অতঃপর কিছুই নিয়ে ফিরে এলো না। (সহিহ বুখারি)
অতএব, এই দশ দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়। এ দিনগুলোর গুরুত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে কেবল বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা। দিনগুলো তাদের সামনে আসে, অথচ তারা তার মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারে না। কিন্তু সফল মুমিন এ দিনগুলোর মূল্য জানে, এর মর্যাদা উপলব্ধি করে। এটি তাদের জন্য নেক আমলের মৌসুম, যার জন্য প্রতি বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।
যখন আল্লাহ তাদের এ দিনগুলো পর্যন্ত পৌঁছে দেন, তখন তারা আগ্রহভরে ইবাদতে মনোনিবেশ করে। ইবনে ওমর ও আবু হুরায়রা (রা.) এই দশ দিনে বাজারে বের হতেন, তাকবির দিতেন। আর মানুষও তাদের তাকবির শুনে তাকবির দিত। সাহাবিরা এই দিনগুলোতে অধিক আমল করতেন।
এ দিনগুলো সংখ্যায় অল্প, কিন্তু শ্রেষ্ঠ। আদিকাল থেকে মহান প্রতিপালক তার প্রিয় বান্দাদের এ দিনগুলোর মাধ্যমে সম্মানিত করে আসছেন। সুতরাং আপনারা এ দিনগুলোতে আল্লাহর জন্য উত্তম আমল করুন।
এই বরকতময় দশ দিন হলো সময়ের অন্যতম উৎকৃষ্ট পর্ব। এর প্রতিটি মুহূর্ত ও ঘণ্টা কাজে লাগানো উচিত। এটি এমন এক উর্বর মৌসুম, যাতে আল্লাহর রহমতের পরশ লাভের জন্য নিজেকে উপস্থাপন করা বাঞ্ছনীয়।
ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, ‘জিলহজের প্রথম দশ দিনের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ সম্ভবত এটাই যে, এতে সব প্রধান ইবাদতের সমাবেশ ঘটেছে। যেমন নামাজ, রোজা, সদকা ও হজ। অন্য কোনো সময়ে এভাবে সব একত্র হয় না।’
হে আল্লাহর বান্দারা! আসুন, আমরা নফল ইবাদত ও নেক আমলের মাধ্যমে এ দিনগুলোকে কাজে লাগাই। যতটুকু সম্ভব নেক কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করি। যেমন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, এতিমদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করা, মানুষকে আহার করানো। এ দিনগুলোতে আমরা বেশি বেশি জিকির, দোয়া, কোরআন তেলাওয়াত, রোজা, তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য নেক কাজ করব। এমন সব কাজ করব, যাতে আমাদের কল্যাণ এবং অন্যদেরও উপকার হয়। যেমন সদকা, উপদেশ, দিকনির্দেশনা, শিক্ষা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা।
হে আল্লাহর বান্দারা! লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই মর্যাদাপূর্ণ দশ দিন বছরের শেষ দিকে আসে। যেন এটি অবহেলাকারী ও ত্রুটিকারীদের জন্য এক সুযোগ, যাতে বান্দা তার হারানো বিষয় পূরণ করে নিতে পারে এবং তার প্রতিপালকের মহিমা স্মরণ করে, তার ক্ষমা ও সন্তুষ্টির আশায় নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে।
জীবন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সময় একের পর এক চলে যাচ্ছে। প্রতিটি দিন অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ু কমছে, মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে, শরীর দুর্বল হচ্ছে, স্বাস্থ্য কমে যাচ্ছে, প্রতিবন্ধকতা বাড়ছে এবং ভালো কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
খালিদ ইবনে মাদয়ান (রা.) বলেন, ‘তোমাদের কারও জন্য যদি কল্যাণের কোনো দরজা খুলে যায়, তবে সে যেন দ্রুত তার দিকে এগিয়ে যায়। কারণ সে জানে না, কখন সেই দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।’
সুতরাং আমরা যেন আমাদের উপকারী বিষয়ের প্রতি যতœবান হই। খাঁটি তওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি। কারণ আল্লাহ আমাদের সবার ওপর তওবা ফরজ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা নুর ৩১)
১৫ মে শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন
মুফতি আতিকুর রহমান
