কোরবানি মুসলিম উম্মাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি মহান আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ আনুগত্য, তাকওয়া ও আত্মত্যাগের এক অনন্য শিক্ষা। প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি আদায় করে থাকেন। কোরবানির মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে এবং নিজের ভেতরের কৃপণতা, অহংকার ও স্বার্থপরতাকে দূর করার শিক্ষা গ্রহণ করে। তাই একজন মুমিনের চিন্তা হওয়া উচিত, আমার কোরবানি কেমন হবে? তা কি শুধু লোক দেখানো, নাকি একান্তই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য?
কোরবানির ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। মানবজাতির প্রথম যুগেই হজরত আদম আলাইহিস সালামের দুই ছেলে হাবিল ও কাবিল মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি পেশ করেছিলেন। পরবর্তী সময় হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আল্লাহর নির্দেশে তার প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে কোরবানি করার জন্য প্রস্তুত হন। এই ঘটনা ছিল আনুগত্য ও আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত। মহান আল্লাহ তাদের এই একনিষ্ঠতা কবুল করেন এবং ইসমাইল আলাইহিস সালামের পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি করার ব্যবস্থা করেন। সেই স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতেই মুসলিম উম্মাহর জন্য কোরবানির বিধান চালু হয়েছে।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘অতএব তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা কাউসার ২) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, নামাজ ও কোরবানি দুটিই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই কোরবানি হতে হবে ইখলাসপূর্ণ এবং শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী।
আমাদের কোরবানি হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। সমাজে অনেক মানুষ আছে যারা লোক দেখানোর জন্য বড় বড় পশু কোরবানি করে। কেউ নিজের মর্যাদা প্রকাশ করতে চায়, কেউ প্রশংসা পাওয়ার আশায় দামি পশু কেনে। অথচ মহান আল্লাহ মানুষের ধন-সম্পদ বা পশুর আকার দেখেন না, তিনি দেখেন বান্দার অন্তরের তাকওয়া। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ ৩৭) অতএব আমাদের কোরবানি হতে হবে তাকওয়ার কোরবানি। সেখানে থাকবে না অহংকার, রিয়া বা প্রদর্শন।
আমাদের কোরবানি হবে হালাল উপার্জনের মাধ্যমে। হারাম টাকা দিয়ে কোরবানি করলে সেই ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। একজন মুসলমানের উচিত সৎপথে উপার্জিত অর্থ দিয়ে পশু ক্রয় করা। কেননা আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন। তাই কোরবানির আগে আমাদের নিজেদের উপার্জনের উৎস যাচাই করা প্রয়োজন।
আমাদের কোরবানি হবে সুন্নাহসম্মত। কোরবানির পশু হতে হবে ত্রুটিমুক্ত ও নির্দিষ্ট বয়সের। পশুকে অযথা কষ্ট দেওয়া যাবে না। জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে হবে এবং দয়া ও কোমলতার আচরণ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা যখন জবাই করো, উত্তমভাবে জবাই করো।’ (সহিহ মুসলিম) এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয়, ইসলাম পশুর প্রতিও দয়া ও মানবিক আচরণ করতে নির্দেশ দিয়েছে।
আমাদের কোরবানি হবে আত্মত্যাগের প্রতীক। কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিজের মনের পশুত্বকে জবাই করাই প্রকৃত শিক্ষা। হিংসা, অহংকার, লোভ, বিদ্বেষ, অন্যায় ও পাপাচার থেকে নিজেকে মুক্ত করাও কোরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য। যদি কোরবানি করার পরও মানুষের চরিত্রে পরিবর্তন না আসে, তবে সেই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হয় না।
আমাদের কোরবানি হবে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যম। ইসলাম সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। কোরবানির গোশত আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিবদের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে সমাজে সৌহার্দ্য সৃষ্টি হয়। অনেক দরিদ্র মানুষ আছে, যারা সারা বছর ভালো খাবার খেতে পারে না। কোরবানির সময় তারা গোশত খাওয়ার সুযোগ পায়। তাই কোরবানি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, এটি সামাজিক কল্যাণেরও এক মহান ব্যবস্থা।
আমাদের কোরবানি হবে অপচয়মুক্ত। বর্তমানে দেখা যায়, কেউ কেউ কোরবানিকে প্রতিযোগিতার বিষয় বানিয়ে ফেলে। অতিরিক্ত খরচ, অহেতুক জাঁকজমক ও অপচয়ের মাধ্যমে ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। অথচ ইসলাম অপচয়কে পছন্দ করে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল ২৭) তাই কোরবানিতে সরলতা ও সংযম বজায় রাখা উচিত।
আমাদের কোরবানি হবে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব। কোরবানির পর অনেক জায়গায় রাস্তাঘাট নোংরা হয়ে যায়, দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় এবং মানুষের কষ্ট হয়। অথচ ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ইমানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই কোরবানির বর্জ্য যথাযথভাবে পরিষ্কার করা, পরিবেশ রক্ষা করা এবং অন্যের অসুবিধা না করা আমাদের দায়িত্ব।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের কোরবানি হবে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম। কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। একজন মুমিন যখন আন্তরিকতার সঙ্গে কোরবানি আদায় করে, তখন তার অন্তরে আল্লাহভীতি বৃদ্ধি পায় এবং ইমান মজবুত হয়। কোরবানি আমাদের শিক্ষা দেয়, আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিতে হবে।
কোরবানি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি ইমান, তাকওয়া, আত্মত্যাগ ও মানবতার শিক্ষা। তাই আমাদের প্রত্যেকের চিন্তা করা উচিত, আমার কোরবানি কি সত্যিই আল্লাহর জন্য? আমার কোরবানির মাধ্যমে কি আমি তাকওয়া অর্জন করছি? যদি কোরবানি আমাদের জীবনকে আল্লাহমুখী করে তোলে, অন্যের উপকারে আসে এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, তবেই সেই কোরবানি হবে সফল ও কবুলযোগ্য। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইখলাসের সঙ্গে সুন্দরভাবে কোরবানি আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর
