সাদা ভিসি কালা ভিসি

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ০৭:২৮ এএম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরনো, কিন্তু নতুন নাটক চলে আসছে। ক্ষমতায় না থাকলে যা ‘অন্যায়’, বিরোধী দলে গেলে তা হয় ‘ন্যায়’। এ নাটকের সবচেয়ে পরিচিত মঞ্চটির নাম, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। উপাচার্য নিয়োগের প্রশ্নটি, দশকের পর দশক ধরে একই ছাঁচে ফেলা হচ্ছে। শুধু নামের আগে দল বদলায়, পদ্ধতি থাকে অবিকল। এবার সবাই ভেবেছিল বদলাবে। কিন্তু আবু সাঈদরা রক্তই দিয়ে  গেল। সেই রক্তের ফসল আর ঘরে এলো না। গত ১২ মে ২০২৬, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন।  সেখানে তিনি বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে শিক্ষক নিয়োগ হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে নিয়োগ হয়নি। রাজনৈতিক পক্ষপাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমরা যদি মেধা দেখে নিয়োগ দিতে পারি, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব। একজন প্রধানমন্ত্রীর মুখে এমন সংকল্প শুনলে, মন উৎফুল্ল না হয়ে পারে না। কিন্তু মাত্র দুদিন পর, ১৪ মে তারিখে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে একযোগে ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিল। একাধিক সংবাদমাধ্যম ও ছাত্র সংগঠনের বিবৃতি অনুযায়ী, নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রায় সবাই বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন, সাদা দল বা জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের পরিচিত মুখ ও সক্রিয় সংগঠক।

এর আগে মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। এই মানুষটি একাধারে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা সম্পাদক, বিএনপিপন্থি সাদা দলের সাবেক আহ্বায়ক এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ইউট্যাবের সভাপতি। একাধিক পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বাগেরহাট-৪ আসনে বিএনপির হয়ে সক্রিয় রাজনীতিও করেছেন। প্রশ্নটি সহজ। দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার, সবচেয়ে বড় যোগ্যতাটি কী ছিল তার? গবেষণাকর্ম, নাকি দলীয় পরিচয়? আর ৪২ পৃষ্ঠার সিভির ভিসি বলে একজন ভিসির অ্যাকাডেমিক যোগ্যতাকে যেভাবে তাচ্ছিল্যের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছিল, বাস্তবে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর তদন্ত হচ্ছে না কেন? তিনি যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তাহলে তদন্ত করে শাস্তি দিন। আর যদি অপরাধ প্রমাণিত না হয়, তাহলে তাকে সরানো হলো কেন? স্মৃতি একটু পেছনে নিয়ে যাই। আওয়ামী লীগের টানা ১৫-১৬ বছরের শাসনে,  উপাচার্য নিয়োগ বলতে বোঝানো হতো নীল দল বা বঙ্গবন্ধু পরিষদের আস্থাভাজন নাম খুঁজে বের করা। সেই দলীয়করণে বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক পুনর্বাসন কেন্দ্রে যেখানে ক্যাম্পাসে সহিংসতা ও সেশনজট ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। এর বিরুদ্ধে বিএনপি নেতারা বছরের পর বছর সোচ্চার ছিলেন।

প্রশ্ন হলো, আপনি যে প্রতিবাদের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বললেন, সেই গণতন্ত্রের নায়করাই তো এখন পাথরের মতো শক্ত দলীয় পরিচয় নিয়ে ভিসি হলেন। তাহলে এবার প্রতিবাদ নেই কেন?  যে বিপ্লবের কথা বলা হয় বৈষম্যহীনতার জন্য, সেই বিপ্লবের পতাকা হাতে নিয়ে একজন শিক্ষাবিদকে দলীয় ট্যাগ দিয়ে অপমান করার নাম সংস্কার নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, বিরোধী দলে থাকলে সবাই নীতির কথা বলে। আর ক্ষমতায় গেলে নীতির জায়গা নেয় দলীয় স্বার্থ। এর মধ্যে নতুন একটি কণ্ঠস্বর যোগ হয়েছে। ইউজিসির একজন সাবেক সদস্য প্রকাশ্যে বলেছেন, ইউনূস সরকারের আমলে উপাচার্য পদগুলো নাকি ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়েছিল। দাবিটি গুরুত্বপূর্ণ, যদি সত্য হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিনি তখন কোথায় ছিলেন? আমরা শুনতাম, পুরো ‘ইউজিসি’ একাই চালান একজন সদস্য। সেটা সত্য হোক বা না হোক, দায়িত্বে থাকাকালে যদি এই ভাগাভাগি ঘটেই থাকে, তাহলে সেটা আটকানোর দায়িত্ব কার ছিল? চেয়ার ছেড়ে বেরিয়ে এসে পুরনো প্রশাসনের দোষ বলা, রাজনৈতিক সুবিধার জন্য কাজে লাগে। কিন্তু নৈতিকভাবে এটি কতটুকু সৎ?

দায়িত্বে থেকে নীরব থাকা এবং দায়িত্ব শেষ হলে সরব হওয়া, এই দুটো মিলিয়েই তৈরি হয় বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির পরিচিত ছাঁচ। এখানে একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন তোলা দরকার। কোনো উপাচার্যের বিরুদ্ধে যদি সুনির্দিষ্ট দায় থাকে- যেমন আর্থিক অনিয়ম, অ্যাকাডেমিক দুর্নীতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা, তাহলে তদন্ত হোক, শাস্তি হোক। কিন্তু প্রমাণিত কোনো দায় না থেকেও কেবল সন্দেহজনক দলীয় পরিচয়ে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র আসলে একটি বার্তা দিল। বার্তাটি হলো, ভালো কাজ করলেও তোমাকে মানব না, যদি তুমি আমার দলের না হও। আর যতদিন আমাদের দলের কেউ না আসছে, ততদিন তোমাকে জামায়াত বানিয়ে রাজনীতি চালিয়ে যাব। এই ন্যারেটিভ কেবল অসৎ নয়, এটি বিপ্লবের সঙ্গে প্রতারণা। দলীয় হস্তক্ষেপের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষতি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট বাদ দিলে, কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক শীর্ষ হাজারেও নেই। অথচ এই একই সময়ে নর্থ সাউথ বা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।  কারণ সেখানে উপাচার্য নিয়োগে দলীয় ফোরামের হিসাব রাখতে হয় না। অ্যাকাডেমিক নেতৃত্ব রঙমুক্ত থাকলে কী হয়, সেই সাক্ষ্য দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই এখন দিচ্ছে।

প্রতি বছর হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশ এড়াতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিচ্ছেন। এটাই আসলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সবচেয়ে নিষ্ঠুর মূল্যায়ন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের রাজনীতিকরণ নিয়ে ঝষধঁমযঃবৎ ও জযড়ধফবং তাদের অপধফবসরপ ঈধঢ়রঃধষরংস গ্রন্থে দেখিয়েছেন, যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বায়ত্তশাসন হারিয়ে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন উপাচার্যরা মূলত পড়ৎব-বীঃবহংরড়হ হিসেবে কাজ করেন। অর্থাৎ তারা পরিণত হন কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বিস্তৃত হাতে। সেই অবস্থায় মেধাভিত্তিক নিয়োগ, গবেষণার বরাদ্দ এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য মূল্যায়ন, সবকিছুই দলীয় আনুগত্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ে যায়। তুরস্কে দলীয় উপাচার্য নিয়োগের ফলে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে পতন এবং মেধাবী অধ্যাপকদের দেশত্যাগ ঘটেছে। হাঙ্গেরিতে অরবান সরকারের হস্তক্ষেপ, সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটিকে বিদেশে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করেছে। ইতিহাসের এই উদাহরণগুলো একটাই কথা বলে, রাজনীতি যখন ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে যায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয় আর বিশ্ববিদ্যালয় থাকে না, হয়ে ওঠে দলীয় সাইনবোর্ড। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর এই ঘুণ কতটা গভীরে ঢুকেছে, তা বোঝা যায় একটি সহজ পার্থক্যে।

শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আসেন জ্ঞানের জন্য, কিন্তু অনেক উপাচার্য সেখানে যান ক্ষমতার পুরস্কার নিতে। ভবিষ্যতে তরুণ শিক্ষকরা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে দেখবেন, নাকি রাজনৈতিক সিঁড়ি হিসেবে সেই বার্তা প্রতিটি দলীয় নিয়োগের মধ্য দিয়ে একটু একটু করে তৈরি হয়। গুণীদের মর্যাদা দিলে, গুণীরা তৈরি হয়। অপমান করলে তারা চলে যায়। তাদের চলে যাওয়ার গন্তব্য হয় বিদেশ, যেখানে মেধার মূল্যায়ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কথা বলেছেন, সেটি নিঃসন্দেহে সঠিক। তার কথায় সদিচ্ছার আভাস স্পষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তার পারিপার্শ্বিকতা কি সেই সদিচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে দিচ্ছে? দলের ভেতরকার লবিস্ট, মনোনয়নপ্রত্যাশী শিক্ষক ফোরাম এবং পদের জন্য অপেক্ষারত নেতৃত্ব এই পারিপার্শ্বিক চাপ কখনো কখনো একজন নেতার সৎ সংকল্পকেও গ্রাস করে নেয়। নীতি আর পরিবেশের এই টানাপড়েনে শেষ পর্যন্ত পরিবেশই জেতে, কারণ পদের প্রলোভন সবসময় নীতির চেয়ে জোরালো। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার এই অসুখটা পুরনো। কিন্তু ইতিহাস বলে যে, বিপ্লব পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসে, সেই বিপ্লব যদি একই পুরনো ছাঁচে ঢালা হয়, তাহলে সে কেবল সরকার বদলায়, ব্যবস্থা বদলায় না। তাই-ই যদি হয়, তাহলে শহীদের রক্তের দায় কেউ শোধ করতে পারে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত