বেশি বেতনে চাকরির লোভ দেখিয়ে দেশ থেকে মানুষ পাচার নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পাশের দেশ ভারত থেকে শুরু করে কিছুটা দূরে মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, সুদূর অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা পর্যন্ত পাচারের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। পাচারকারীরা গোপনে তৎপরতা চালায়। তবে সবই যে পুরোপুরি গোপনীয়তার মধ্যে ঘটে, এমন নয়। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার চোখের সামনেই মানব পাচার হচ্ছে। পাচারে জড়িত চক্রগুলো আশাবাদ, হুমকি ও নির্যাতনের জাল ছড়িয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের খপ্পরে পড়ে বহু লোক প্রাণ হারাচ্ছেন। অনেক পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। কিন্তু এসব কাহিনীর যেন শেষ নেই! ঘটেই চলেছে একের পর এক, নির্বিঘেœ, প্রতিকারহীনভাবে।
দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত ‘স্বপ্ন যখন মরণফাঁদ’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ বেতনে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর কথা বলে একটি চক্র ধাপে ধাপে বিকাশের মাধ্যমে ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চার মাসে। এ ঘটনায় নিঃস্ব হয়ে পড়েন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোহাম্মদ সামাল। গত ১৫ মার্চ তিনি সরাইল থানায় মামলা করেন। এই একটি ঘটনা থেকে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে। কেন ৬০ লাখ টাকা দিয়ে তিনি বিদেশে যেতে চাইলেন? উন্নত ভবিষ্যতের মোহে, নাকি লোভে পড়ে? অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার মোহে থাকায় তার নিজের বা পরিবারের কারও মনে কি এমন প্রশ্ন আসেনি যে, এতে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি আছে? একটি চক্রের সঙ্গে এক ব্যক্তি বা পরিবারের চার মাসে ৬০ লাখ টাকা লেনদেনে অস্বাভাবিকতা থাকার কথা। মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সংস্থা বিকাশের প্রক্রিয়ায় কি এমন লেনদেন সন্দেহ তৈরি করার কথা নয়? এর বাইরে বিমানবন্দর ও স্থলসীমান্ত হয়ে বিদেশ যাওয়ার পথে এয়ারলাইনস ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কড়া নজরদারির মধ্যেও পর্যটক, শিক্ষার্থী ও কর্মী সাজিয়ে চক্রগুলো টার্গেট নারী-পুরুষকে পাচার করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়া প্রকৃত পর্যটক, শিক্ষার্থী ও কর্মীকে তাদের প্রাসঙ্গিক অনুমতি, কাগজপত্র এবং পাসপোর্টে ভ্রমণের তথ্য দেখে চিহ্নিত করা সম্ভব। একইভাবে এয়ারলাইনস ও সরকারের প্রশিক্ষিত কর্মকর্তাদের কাছে নকল পর্যটকসহ পাচারের জন্য টার্গেট হিসেবে আনা ব্যক্তি চিহ্নিত করা মোটেই কঠিন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পাচারকারী ও তাদের টার্গেট ব্যক্তিরা ইমিগ্রেশন পার হওয়ার প্রক্রিয়ায়ই তেমন একটা ধরা পড়ে না কেন? এর পরিণতিতে এসব ব্যক্তি লিবিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে পাচারকারীদের কাছে বন্দি হয়। নিজের অজান্তে অন্য চক্রের কাছে বিক্রি হচ্ছেন। অপহৃত হন। নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। দেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে তাদের মুক্ত করতে হচ্ছে। এমনকি সাগরে ডুবে মারাও গেছেন, বাংলাদেশের এমন নাগরিক অসংখ্য। বলা হচ্ছে, দেশের অনেক ট্রাভেল ও রিক্রুটিং এজেন্সি মানব পাচারে জড়িত। বিমানবন্দরগুলোতেও মানব পাচারকারী গ্রুপ সক্রিয় আছে। বেবিচক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ বিভিন্ন এয়ারলাইনস ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ১১২ জনকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। প্রশ্ন হলো এর কোনো শেষ আদৌ আছে?
মানব পাচারের অভিযোগে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে ৩৪৪ জন। বলা হচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানব পাচার প্রতিরোধে ‘কঠোর’ হচ্ছে। পাচারকারীদের তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। ২ হাজার ৪৯২টি ট্রাভেল রিক্রুটিং এজেন্সি নজরদারিতে আছে। অনেক এজেন্সির কর্ণধারদের ‘রাজনৈতিক মতাদর্শ’ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লাইসেন্সের ঠিকানা অনুযায়ী অনেক মালিকের অফিস খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। তাহলে কী দেখে লাইসেন্সগুলো দেওয়া হয়েছিল? রাজনৈতিক পরিচয়? পাচারকারীদের কারও কারও রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে। আমরা চাই, দলমত নির্বিশেষে তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক। এই বিচার এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলেই যেন সীমিত না থাকে। মানুষের জীবন ও প্রাণ নিয়ে যারা খেলে, তাদের সবার জন্য কঠোর সাজা নিশ্চিত করা হোক।
