বিয়ের বরযাত্রী হিসেবে ওরা সকালের ফ্লাইটে সৈয়দপুর পৌঁছেছে। কাজিনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া ছাড়াও নিজেরা দুটো দিন থেকে এখানকার রেলওয়ে কারখানা, চিনি মসজিদ, রামসাগর আর কান্তজিউ মন্দির দেখে যাওয়ার ইচ্ছায় একটা হোটেল নিয়েছে। বরের ফার্স্ট কাজিন হিসেবে এই বিয়েতে ফারহানের একসাইটমেন্ট অনেক বেশি।
উত্তরবঙ্গে শীত ও গরম দুটোই বেশি পড়ে। এখন শীতকাল। ঢাকার চেয়ে তাপমাত্রা অনেক হিম। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে যাওয়ার সময় চারপাশের চওড়া সড়কে নানা রঙের ফুলের গাছ। ফারহান রিকশা থামিয়ে নেমে যায়। রাস্তার পাশে একটি ধুলো ভরা গাছ থেকে একটা হলুদ গাঁদা ফুল ছিঁড়ে আনে।
‘তোমার জন্য শীত শহরের তাজা ফুল,’ স্ত্রীর দিকে ফুল বাড়িয়ে দিয়ে বলে।
‘ধন্যবাদ,’ মুখে হাসি চেপে নবনী বলে।
রিকশা চলতে শুরু করেছে। ফারহান উদাস ভঙ্গিতে কণ্ঠে দুঃখের ভাব ফুটিয়ে বলে, ‘জীবনে কোনো দিন তুমি আমাকে একটা ফুল উপহার দাওনি।’
চলন্ত রিকশার গতিতে গায়ে পেঁচানো শালের ফাঁক দিয়ে সকালের কনকনে হাওয়া ঢুকে যাচ্ছে। ফারহানের গায়ের সঙ্গে আরেকটু চেপে বসে নবনী কণ্ঠস্বর থেকে হাসি মুছে ফেলার চেষ্টা করে। বলে, ‘ওহ, সত্যি নাকি? কোনো দিন দেই নাই? একটাও না?’
ফারহান এরপর একে একে সময় ও ঘটনা বলে যেতে থাকে। প্রেমের সময় থেকে আরম্ভ করে বিয়ের পরের গত তিনটি বছরে কতবার সে নবনীর জন্য ফুল কিনেছে অথবা চুরি করেছে সব যেন মুখস্থ করে রেখেছে সে।
ফারহানের অভিমানের ফিরিস্তি শেষ হওয়ার আগেই তারা হোটেলে পৌঁছে গেছে। এটি একটি হেরিটেজ রিসোর্ট, চারপাশে চমৎকার খোলা জায়গা, সুইমিংপুল, একটা শান্তি শান্তি ভাব ছড়ানো।
নবনী একটু ফ্রেশ হয়ে দুপুরের দাওয়াতের জন্য রেডি হতে আরম্ভ করে। পাশে বসে ফারহান, বরাবরের মতো, ওদের পরিবার ও আত্মীয়দের সবার নানান গল্প শোনাতে থাকে। নবনীও প্রায়ই স্বামীকে নিজের পরিবার ও আত্মীয়দের অনেক গল্প বলে। কিন্তু ওদের দুজনের গল্পগুলো দুই ধরনের। ফারহানের জীবনের গল্পগুলো শুধুই আনন্দের—এসব গল্পে আত্মীয়দের সবার মধ্যে ভীষণ হৃদ্যতা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা। কিন্তু নবনীর গল্পগুলোর নব্বই ভাগই ব্যথার, যন্ত্রণার ও আর্তনাদের। কিছু অনিবার্য কারণে নবনীর মা তার ধনী ব্যবসায়ী স্বামীকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন, নবনীরা চার ভাইবোন তখন স্কুল ও কলেজে পড়ে। বাবার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর নবনীরা একই পৃথিবীর কুৎসিততম চেহারা দেখেছে। ইংলিশ মিডিয়ামের লেখাপড়া বন্ধ করে মফস্বলের স্কুলে পড়তে যাওয়ার হতাশা সহ্য করেছে। ক্ষুধার কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মামা, চাচা, খালার মতো অত্যন্ত কাছের মানুষদের নিষ্ঠুর ব্যবহার।
‘জানো, এই শহরে অনেক বিহারি থাকে,’ নবনীর ধ্যান ভেঙে বলে ওঠে ফারহান।
‘হ্যাঁ, শুনেছি।’
‘একাত্তরে বিহারিদের আচরণ জেনেছি সৈয়দ হকের নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাসে। তুমি পড়েছ ওটা?’
‘হ্যাঁ। পাকিস্তানি মিলিটারির ভয়ে গ্রামের লোকজন ঘরবাড়ি ফেলে পালিয়ে যেত, আর রাতের অন্ধকারে বিহারিরা এসে জনশূন্য বাড়িগুলো থেকে সব লুট করে নিয়ে যেত।’
এ সময় ফারহানের মোবাইল বেজে ওঠে। কমিউনিটি সেন্টারে তারা কয়েকজন পৌঁছে গেছে। নবনী ও ফয়সাল কখন যাবে, জানতে চাইছে।
‘আর এক ঘণ্টার মধ্যে চলে আসব। নবনী প্রায় রেডি,’ বলে লাইন কেটে দেয় ফারহান। কমিউনিটি সেন্টারে মেয়েপক্ষের লোকজনের চেয়ে বরপক্ষের, অর্থাৎ ফারহানদের মানুষই বেশি মনে হয়। নবনী তার স্বভাবজাত শান্ত ও পরিশীলিত চলাফেরায় সবার খোঁজখবর করে। মেয়েরা বেশিরভাগ একদিকে জটলা হয়ে পরস্পরের শাড়ি গহনা দেখছে, সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল টপিক নিয়ে আলোচনা করছে। ছেলেরা বিক্ষিপ্ত। কেউ কেউ মোবাইলে, কেউ একটু পরপর মেয়েদের জটলার দিকে তাকিয়ে নিজের পরিবার খোঁজার চেষ্টা করছে।
ফারহান লক্ষ করে, নবনীকে বেশ উচ্ছল দেখাচ্ছে।
ফারহানের মন খুশি হয়ে ওঠে, নবনী কত চমৎকারভাবে শ্বশুরবাড়ির সবার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। অবশ্য ফারহানের পরিবারে কেউ নবনীকে বাইরের মেয়ে অনুভব করতে দেয়নি। যেন বরাবরই সে ফারহান পরিবারের খুব কাছের একজন ছিল।
তারা অনেক ছবি তোলে। কাজিনের নতুন স্ত্রীর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে। এরপর টেবিলে খাবার সময় দুজন একটি টেবিলে পাশাপাশি বসে।
‘তোমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে, তাই না?’ ফারহান জিজ্ঞেস করে।
‘খুব। সেই রাতের পরে তো আর কিছুই খাইনি।’
‘কিছু খাওনি বলা ঠিক না। অনেক কাপ চা খেয়েছ।’
‘চা কোনো খাওয়া নাকি। ওটা তো পানি।’
‘আর প্রতি কাপে যে দুই চামচ করে চিনি থাকে, সেটা?’
‘ওটা কার্ব। তবু ভাত তো আর না। আমার প্রিয় খাবার পোলাও খাব এখন।’ বেশ আনন্দিত কণ্ঠে বাচ্চাদের মতো ঝলমল করে ওঠে নবনীর মুখ।
কমিউনিটির লোকগুলো বেশ পরিপাটি পোশাক পরেছে, সবার মাথায় সেন্টারের লোগো দেওয়া সাদা কাপড়ের টুপি। অভিজ্ঞ হাতে তারা সব টেবিলে খাবারের বড় ট্রে, বাটি ও বোরহানির জগ দিয়ে যাচ্ছে। খাবার সার্ভ হওয়ার মুহূর্ত থেকে পরের প্রায় পনেরো মিনিট টেবিলগুলোতে লোকজনের খাওয়ার ধুম লেগে গেল। আশপাশে নানা ধরনের বায়না আরম্ভ হয়েছে—এই টেবিলে আরেকটা রেজালা দাও। এখানে দুটো সালাদ লাগবে। পানির বোতল কোথায়? এই একটি ফ্রেশ পোলাও নিয়ে এসো। আরে কাবাবে দেখি একটুও ঝাল দেয়নি, তোমাদের এলাকার মানুষ বুঝি মিঠা কথার মতো খাবারও মিঠা খায়?
ফারহান নিজের প্লেটের পোলাও, রোস্ট, কাবাব ও রেজালা শেষ করে তাকিয়ে দেখে নবনীর প্লেট প্রায় একই রকম ভরা আছে।
‘খাচ্ছ না কেন? খেতে ভালো হয়নি?’ ফারহান জিজ্ঞেস করে।
‘তা না।’
‘শরীর খারাপ লাগছে?’
‘তাও না।’
‘অনেক সময় বেশি ক্ষুধা লেগে গেলে কিছু খাওয়া যায় না। তোমার মনে হয় সেটাই হয়েছে।’
‘হয়তো।’ নবনী খুব ধীরে ধীরে বলে।
এরপর মিষ্টি খাবারের সময়ও নবনী কোনো খাবার মুখে তোলে না। ফারহানের পাশে চুপ করে বসে থেকে আশপাশে সবার খাওয়া দেখতে থাকে। নবনীর চোখের দৃষ্টিতে কী যেন এক দিশেহারা পাখি ডানা ঝাপটায়। নবনীর মুখ কি বিষাদে ভারী হয়ে আছে? ফারহান নিশ্চিত হতে পারে না।
কমিউনিটি সেন্টারে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলে ফেরার সময় নবনী একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে লাঞ্চ করে। নবনীকে আবার সেই আগের মতো উচ্ছল ও প্রাণবন্ত মনে হয়।
শীতের সন্ধ্যা দ্রুত রাত্রির আভরণে ঢেকে যায়। রিসোর্টের আশপাশে অনেকটা খোলা জায়গা থাকায় শহরের কোলাহল কানে আসে না।
তারা দুজন ছাদে দুটি চেয়ারে বসে। দুজনের হাতে দুই মগ কফি।
ফারহান গুনগুন করে একটা গান গাইছে। স্ত্রীকে প্রেমের গান শোনাচ্ছে। আশপাশে আর কেউ নেই।
‘দুপুরের ঘটনার জন্য আমি সরি,’ হঠাৎ নবনী বলে।
‘কোন ঘটনা? সরি কেন?’ অবাক হয়ে বলে ফারহান।
‘ওখানে তোমার আত্মীয়দের সামনে আমি যে কিছুই খেলাম না, তুমি নিশ্চয়ই মাইন্ড করেছ।’
‘ধুর, মাইন্ড করব কেন? শুধু ভাবছিলাম, তুমি পোলাও, রোস্ট এত ভলোবাসো কিন্তু খাচ্ছ না কেন, এটুকুই। কিন্তু অসুবিধা নেই, আমি বা অন্যরা কেউই কিছু মনে করেনি।’
কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে থাকে। ফারহানের গান যেন হঠাৎ সুর হারিয়ে ফেলেছে। নবনীও যেন কিছু ভাবছে।
‘আমাদের আব্বুর সঙ্গে আমার আম্মুর ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর আমরা নানা বাড়িতে গিয়ে একটি আলাদা বাড়িতে থাকতাম। সেসময় আমাদের সংসারে খুব অভাব ছিল। ক্ষুধার খুব কষ্ট ভুলে থাকার জন্য আমরা কল্পনা করতাম ভবিষ্যতে আমরা এত বড়লোক হব যে আমাদের ফ্রিজ ভর্তি ফল আর আইসক্রিম থাকবে। বড়লোক হওয়ার একমাত্র উপায় হিসেবে আমরা চার ভাইবোন সারাক্ষণ লেখাপড়া করতাম। প্রচণ্ড ক্ষুধায় পেটের নাড়িভুঁড়ি উপড়ে আসার জোগাড় হলেও আম্মুর কাছে আমরা কিছু খেতে চাইতাম না, কারণ জানতাম আমাদের রান্নাঘরে কোনো খাবার নেই। এক ডজন ডিম কেনা হলে আমার আম্মুকে বারোটি ডিম অন্তত দুই সপ্তাহ চালাতে হতো।’
কথাগুলো বলতে বলতে নবনীর কণ্ঠস্বর কেমন ফ্যাকাসে ও বিতৃষ্ণার সুরে মিশে গেছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য সে চুপ হয়ে গেল।
ফারহান চেয়ার থেকে উঠে নবনীর কাঁধে হাত রাখে। নবনী কিন্তু পিঠ টান করে মাথা সোজা রেখেছে।
একটু দম নিয়ে সে আবার বলতে শুরু করে, ‘সেসময় আমাদের খুব কাছের আত্মীয়দের বাড়িতে বিয়ে, জন্মদিন, আকিকা, মুসলমানি কোনো অনুষ্ঠানেই আমাদের কেউ দাওয়াত দিত না। আমরা গরিব ছিলাম তো, সবাই জানত দাওয়াতে ভালো উপহার দিতে পারব না। আমার ছোট ভাই বোন দুটি একটু বেশি ছোট ছিল, ওরা অনেক কিছু বুঝত না। কত দিন আম্মুর কাছে নালিশ করেছে, আত্মীয়রা আমাদের দাওয়াত করে না কেন, একটা বিয়ের দাওয়াত পেলে আমরা একবেলা পেট ভরে পোলাও খেতে পারতাম।’
নবনীর কাঁধের কাছে ফারহানের আঙুলের স্পর্শ গভীর হয়। স্ত্রীকে সে বলতে চায়, থাক ওসব কথা আর বলতে হবে না, কিন্তু তার গলা থেকে কোনো স্বর বের হয় না।
‘দুপুরে ওখানে পোলাও, রোস্ট, কাবাব, বোরহানি দেখে আমার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। কী কাঙালের মতো আমরা ভাই বোনেরা আশা করতাম কেউ যদি আমাদের একটা বিয়ের দাওয়াত দিত তাহলে আমরা খুব আনন্দ করে পেট পুরে খেতাম। কেন যেন আজ দুপুরে হঠাৎ সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল ফারহান, আমি আর একটি দানাও মুখে তুলতে পারছিলাম না।’
এরপর তারা দুজন নিঃশব্দে ছাদে বসে থাকে। একসময় তারা ছাদ থেকে নেমে নিজেদের রুমে চলে আসে।
তের পোশাক পরে নবনী খাটে শুয়ে সহসাই ঘুমে তলিয়ে যায়।
একপাশে একটি চেয়ারে পাথরের মতো বসে থাকে ফারহান।
ঘরে জ্বলছে হালকা আলোর রাতবাতি।
মৃদু আলোর আভায় ফারহান বারবার তাকায় নবনীর ঘুমন্ত মুখের দিকে। বাইরের তীব্র শীতে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলতে থাকা চাঁদের মতো ফারহান তার স্ত্রীর ভেতরে জমে থাকা তিক্ততাকে আবিষ্কার করতে পারছে। অথবা, তিক্ততার মন্থনে নবনীর অন্তরে জেগে ওঠা অপ্রতিরোধ্য মানসিক শক্তিকে।
