রপ্তানি বাণিজ্যে তৈরি পোশাকের পর চামড়াশিল্প অর্থনীতির আশার আলো হলেও নানা কারণে টিমটিম করে জ্বলছে খাতটি। ধ্বংসপ্রায় খাতটিকে সময়োপযোগী করতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন বলে মনে করেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। এ জন্য সরকারের কাছে স্বতন্ত্র বোর্ড গঠনসহ ১৩ দফা দাবি জানিয়েছেন তারা। আধুনিকতার ছোঁয়া না আনলে এ খাত টেকানো মুশকিল হবে বলে মনে করেন তারা। গতকাল শনিবার রাজধানীর পল্টন এলাকায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে ‘অস্তিত্ব সংকটে চামড়াশিল্প : উত্তরণের উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব দাবি উত্থাপন করা হয়।
এদিকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের উন্নয়নে দুই হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর জানান, তহবিলের আওতায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উৎপাদনমুখী ও শ্রমঘন শিল্পকে। বিশেষ করে চামড়া, তৈরি পোশাক, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং রপ্তানিমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
জানা গেছে, দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হলেও গত এক দশকে নানা সংকটে পড়ে চামড়াশিল্প। সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীতে স্থানান্তরের পরও পরিবেশগত মান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অর্থসংকট ও আন্তর্জাতিক মানদন্ড পূরণে ব্যর্থতার কারণে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয়নি। অনেক ট্যানারি পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে উৎপাদন কমিয়ে দেয়, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধও হয়ে যায়।
লেদার ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের (এলআইডিএফবি) আয়োজনে আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এলআইডিএফবির আহ্বায়ক সাদাত হোসেন সেলিম। অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতিত্ব করেন।
সভায় খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, দীর্ঘদিন অবহেলিত দেশের চামড়াশিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। এ থেকে উত্তরণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ, তৈরি পোশাক খাতের মতো সমপরিমাণ রপ্তানি প্রণোদনা এবং সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে নতুন দুটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপনের জোর দাবি জানানো হয়েছে।
বক্তারা বলেন, ঈদ এলেই কোরবানির পশু এবং চামড়া সংরক্ষণের বিষয় সামনে আসে। সারা বছর আর খবর থাকে না। অথচ পোশাকশিল্পের মতো এ খাতের গুরুত্ব রয়েছে। সঠিক নীতি সহায়তার অভাবে খাতটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না।
এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন বোর্ডের (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, গত এপ্রিল মাসে ৩১৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা এক বছর আগের তুলনায় ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ বেশি। আর গত এপ্রিলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এপ্রিলে এ খাতে রপ্তানি হয়েছে ১১ কোটি ডলার, প্রবৃদ্ধি ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
বক্তারা বলেন, দেশের চামড়াশিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যেতে আধুনিক চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন, স্থানীয় বাজারে চামড়াজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বিপণনে জোর দিতে হবে। এর মাধ্যমে এ খাতে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব।
বক্তারা আরও বলেন, মাদ্রাসা ঐতিহাসিকভাবে চামড়াশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। মাঠপর্যায়ে মাদ্রাসার সঙ্গে এ খাতের সমন্বয়হীনতাও একটি সমস্যা। নতুন উদ্যোক্তাদের এ খাতে আসতে হবে।
এ খাত বিষয়ে সরকারের অবহেলার প্রসঙ্গ তুলে সাদাত হোসেন সেলিম বলেন, চামড়াশিল্পের নিজস্ব কাঁচামাল থাকার পরও এ খাতের কোনো মন্ত্রণালয় নেই। অথচ পোশাক খাতের মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তর রয়েছে। আর চামড়াশিল্পকে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের (বিসিক) আওতায় রাখা হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সরকার চামড়া খাতকে কেমন গুরুত্ব দিচ্ছে। অবহেলা যাই থাকুক, সামনের দিনে সবাই মিলে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অবহেলার কারণগুলো তুলে ধরতে চাই। আশা করছি, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে সরকার চামড়াশিল্প খাতকে গুরুত্ব দেবে এবং পোশাকশিল্পের মতো রপ্তানিতে অবদান রাখবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন ও আব্দুল্লাহ আল আমিন, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতুল্লাহ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ড. এমএ সবুর ও ড. এমএ মুত্তালিব, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, সুলতান লেদার বিডির চেয়ারম্যান মাওলানা মাহবুবুল হক, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সারওয়ার তুষার এবং বাংলাদেশ লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আলী বাপ্পী, বৈশ্বিক সার্টিফিকেশন প্রতিনিধি ডব্লিউজির সাবেক অডিটর আফজাল হোসেন, বাংলাদেশ লেদার অ্যান্ড লেদার গুডস ম্যানুফেকচারার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মাহিন, সিলেক্টর অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক আবদুল নবী, চামড়াজাত দ্রব্য প্রস্তুতকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জানে আলম প্রমুখ।
এলআইডিএফবির ১৩ দফা : স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় বা বোর্ড গঠন; বাস্তবমুখী ও বিশেষ ব্যাংকিং নীতিমালা প্রণয়ন; স্থানীয় চামড়া ও ফুটওয়্যার এবং শিপারদের (কমার্শিয়াল এক্সপোর্টার্স) আর্থিক সুবিধা প্রদান; বৈশ্বিক মানদন্ড অর্জন ও সিইটিপি আধুনিকায়ন; লেদার গুডস ফুটওয়্যার সিটি পার্ক স্থাপন; নতুন চামড়াশিল্প অঞ্চল ও বৈদেশিক বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি; ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে স্বল্পমেয়াদি ঋণ; ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ কেমিক্যাল ও এক্সপোর্ট প্রণোদনা; কেমিক্যাল আমদানি সহজীকরণ ও দেশীয় উৎপাদন জোন স্থাপন; চামড়া বা পাদুকাবিষয়ক পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও আধুনিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা; কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ কেন্দ্র ও সরকারি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন; দেশীয় বাজারে চামড়ার ব্যবহার বৃদ্ধি ও কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা এবং আন্তর্জাতিক বিপণন ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের বাধা দূরীকরণ।
২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ
দেশের বন্ধ ও সংকটে থাকা শিল্পকারখানা পুনরায় চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন ও সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতের জন্য আলাদা করে দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মূলধন সংকট, উচ্চ সুদহার, ডলার সংকট ও বাজার অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
