প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩

পর্যটন খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম

লাল সবুজের পতাকা নিয়ে আমি পৃথিবীর ১৮৪টি দেশ ভ্রমণ করেছি। পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে নানান দেশের মানুষ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসসহ অনেক কিছু কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি উপলব্ধি করেছি, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটন কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পৃথিবীর অনেক ছোট ও দরিদ্র দেশ রয়েছে, যাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত, শিল্পকারখানা নেই বললেই চলে; তারা শুধুমাত্র পর্যটনকে কেন্দ্র করে নিজেদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল, কম্বোডিয়া কিংবা সিশেলসের মতো দেশগুলো আজ বিশ্বে পরিচিত মূলত তাদের পর্যটন শিল্পের কারণে। এসব দেশে প্রতি বছর লাখো বিদেশি পর্যটক ভ্রমণে যায় এবং সেই পর্যটকদের মাধ্যমেই দেশগুলোর মানুষের জীবিকা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে বাংলাদেশ কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পাহাড়ে ঘেরা বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি, সিলেটের চা-বাগান, নদীমাতৃক সৌন্দর্য, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও অতিথিপরায়ণ মানুষ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এখনো আমাদের পর্যটন শিল্পকে গড়ে তুলতে পারিনি।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পনার অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপত্তার ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাব। দেশের অনেক সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকায় এখনো ভালো যোগাযোগব্যবস্থা নেই। পর্যটকদের জন্য উন্নতমানের আবাসন, বিশ্রামাগার কিংবা দিকনির্দেশনার ব্যবস্থাপনা নেই। বিদেশি পর্যটকরা সহজ ভ্রমণ-সুবিধা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় বাংলাদেশে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এছাড়া পরিবেশ দূষণ ও অপরিকল্পিত স্থাপনা অনেক পর্যটনকেন্দ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করছে।

তবে আশার কথা হলো, সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হতে পারে। এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। পর্যটন এলাকাগুলোকে আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন করতে হবে। সড়ক, নৌ ও আকাশ যোগাযোগ আরও উন্নত করতে হবে যাতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সহজে ভ্রমণ করতে পারেন। পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত ভ্রমণ-গাইড নিয়োগ দিতে হবে।

বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলতে আন্তর্জাতিক প্রচারণা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রামাণ্যচিত্র, আন্তর্জাতিক ভ্রমণমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আকর্ষণীয় পর্যটন দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে। পর্যটকদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ, পরিচ্ছন্নতা রক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। কারণ একটি দেশের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু তার প্রকৃতির মধ্যে নয়, সেই দেশের মানুষের আচরণ ও সংস্কৃতির মধ্যেও প্রকাশ পায়।

পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে উন্নত আবাসন, বিনোদনকেন্দ্র, পরিবহন ব্যবস্থা ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন প্রকল্প গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো সংরক্ষণ এবং সেগুলোর যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।

আমি পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরে দেখেছি, অনেক দেশ শুধুমাত্র পর্যটনের ওপর নির্ভর করেই নিজেদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশও একদিন পর্যটনের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। আমাদের দেশে যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রয়েছে, তা বিশ্বের খুব কম দেশেরই আছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, আন্তরিক উদ্যোগ এবং দেশের সৌন্দর্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার মানসিকতা।

বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। এই দেশের মাটি, মানুষ, নদী, পাহাড় ও প্রকৃতির প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, যদি আমরা সবাই মিলে দেশের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে কাজ করি, তাহলে একদিন বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হবে এবং লাল-সবুজের পতাকা আরও গর্বের সঙ্গে বিশ্বমঞ্চে উড়বে।

লেখক : ১৮৪ দেশ ভ্রমণকারী প্রথম বাংলাদেশি পতাকাবাহী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত