প্রচলিত মার্কসবাদ ও বিপ্লবী তত্ত্ব এখন নানা কারণে প্রশ্নের মুখে। বাংলাদেশেও রাজনীতি ক্রমে দুই ধরনের পরিচয়বাদী ধারায় আটকে পড়ছে : একদিকে সেক্যুলার জাতিবাদ, অন্যদিকে ইসলামপন্থি পরিচয়বাদ বা ধর্মীয় জাতিবাদ। দুই ধারাই নিজেদের মতো করে ফ্যাসিবাদী পরিণতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল সেক্যুলার জাতিবাদ থেকে জন্ম নেওয়া ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে। কিন্তু ৮ আগস্টের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা সেই গণঅভ্যুত্থানের গাঠনিক সম্ভাবনাকে থামিয়ে দেয়। ফলে রাজনীতি আবার পুরানা বিভাজনে ফিরে যায়।
এবার পরিস্থিতি আরও জটিল। সেক্যুলার জাতিবাদের পিছু হটার সঙ্গে সঙ্গে কিছু জায়গায় মাজারে হামলা, মাজার ভাঙা, এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এতে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে ন্যূনতম সহনশীলতা, সহাবস্থান, এবং পরিচয়বাদী রাজনীতির বাইরে গিয়ে গণসার্বভৌমত্বের রাজনীতি গড়ে তোলা কঠিন হয়ে উঠছে।
এই সবকিছু ঘটছে করপোরেট পুঁজির গোলকায়ন, বৈশ্বিক যুদ্ধ, এবং আন্তর্জাতিক আইন-নৈতিকতার ভাঙনের সময়ে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এখন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন বিশ্বব্যবস্থাকে আরও অস্থির করেছে। আমরা এমন এক সময়ে আছি, যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আইন, নীতি, মানবতা কোনো কিছুকেই খুব গুরুত্ব দিচ্ছে না।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী? বাংলাদেশ কি পরিচয়বাদী ফ্যাসিবাদের দুই রূপ সেক্যুলার ও ধর্মীয় দুটোই অতিক্রম করে জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা ও গণসার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক পথ তৈরি করতে পারবে?
বাংলাদেশ এখন এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে পুরানা রাজনৈতিক ভাষা, পুরানা মতাদর্শিক দ্বৈততা, এমনকি ‘রাষ্ট্র বনাম বিপ্লব’ ধরনের বিশ শতকীয় ফ্রেমও ভেঙে পড়ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এই ভাঙনের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ৮ আগস্টে পুরানা ফ্যাসিস্ট সংবিধানের পুনর্বহাল অর্থাৎ ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’ দেখিয়ে দিয়েছে যে কেবল শাসক বদলালেই রাষ্ট্রের গাঠনিক রূপ বদলায় না। রাষ্ট্র নিজের ধারাবাহিকতা (continuity of state-form) রক্ষা করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন সে কারণে জনগণ নতুনভাবে বাংলাদেশ গঠনের রাজনীতি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে কি না সেই প্রশ্নে পর্যবসিত হয়েছে।
প্রথমত, প্রচলিত মার্কসবাদ বিশেষত শ্রেণি রাজনীতি কেন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সেটা পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। বাংলাদেশে শ্রেণি রাজনীতি ব্যর্থ হয় নাই; বরং বাম রাজনীতি শ্রেণি রাজনীতির গভীর অর্থ ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বহারা শ্রেণিচেতনা মানে কেবল কারখানার শ্রমিকের তাৎক্ষণিক চেতনা নয়। শ্রমিক নিজের মজুরি, কাজের সময়, মালিকের জুলুম বা কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে যে চেতনা তৈরি করে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেটাই সর্বহারা শ্রেণিচেতনার শেষ কথা না। সর্বহারা শ্রেণিচেতনা হলো পুঁজি ও শ্রমশক্তির দ্বন্দ্বের আলোকে ইতিহাসকে বোঝার ক্ষমতা অর্থাৎ বর্তমান সমাজ কীভাবে তৈরি হলো, এখন কীভাবে চলছে, এবং কোন শক্তি কোন দিকে ভবিষ্যৎ ঠেলে দিচ্ছে এই ইতিহাস-চেতনা।
এই অর্থে বাম রাজনীতির আসল কাজ ছিল ইতিহাস বাস্তবে কীভাবে বর্তমান আছে তা ব্যাখ্যা করা; বর্তমানের ভিতরে ভবিষ্যতের কোন কোন সম্ভাবনা জন্ম নিচ্ছে তা চিহ্নিত করা; এবং সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণ করা। কিন্তু বাংলাদেশের বামপন্থা এই জায়গায় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তারা অনেক সময় শ্রেণি রাজনীতিকে ‘শ্রমিক বনাম মালিক’ বা ‘শ্রেণি বনাম শ্রেণি’ এই সোজা সাংঘর্ষিক কাঠামোয় আটকে ফেলেছে। ফলে পুঁজি কীভাবে রাষ্ট্র, ঋণ, এনজিও, উন্নয়ন-ভাষা, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, কর্পোরেট মিডিয়া, নিরাপত্তা কাঠামো, ডিজিটাল নজরদারি, আমলাতন্ত্র, এবং বৈশ্বিক বাজারের মধ্য দিয়ে সমাজকে নতুনভাবে গঠন করছে তা তারা যথেষ্ট গভীরভাবে ধরতে পারে নাই।
উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষমতা শুধু কারখানার উৎপাদন সম্পর্কের ভিতরে সীমাবদ্ধ না। পুঁজি এখন ব্যাংক, জমি, নদী, খাদ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, এনজিও-শাসন, উন্নয়ন প্রকল্প, ঋণনীতি, এবং নিরাপত্তা রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে কাজ করে। ফলে শ্রেণিপ্রশ্নকে আজ শুধু মজুরি বা উৎপাদনস্থলের প্রশ্ন হিসেবে ধরলে চলবে না; একে রাষ্ট্রের রূপ, বৈশ্বিক পুঁজির দখল, জনগণের জীবনযাত্রা, সাংস্কৃতিক অপমান, ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়, এবং রাজনৈতিক মর্যাদার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে বুঝতে হবে।
এই ব্যর্থতার কারণেই বাংলাদেশের বাম রাজনীতি জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভাষা তৈরি করতে পারে নাই। তারা ‘শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লব’ কিংবা ‘শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ বলেছে বটে, কিন্তু শ্রমিক, কৃষক, প্রবাসী, বেকার যুবক, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, শহুরে নিম্ন-মধ্যবিত্ত, অপমানিত ধর্মীয় মানুষ, সাংস্কৃতিকভাবে অবমূল্যায়িত জনগোষ্ঠী সবাইকে পুঁজি ও রাষ্ট্রের যৌথ দমনের ভিতরে একত্রে বুঝতে পারে নাই। ফলে জনগণের বাস্তব ক্ষোভ, অপমান, বঞ্চনা, ন্যায়বিচারের আকাক্সক্ষা এবং সার্বভৌম মর্যাদার দাবিকে বাম রাজনীতি সংগঠিত রাজনৈতিক রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান এই ব্যর্থতাকে নগ্ন করে দিয়েছে। মানুষ সেখানে ‘প্রলেতারিয়েত’ বা ‘সর্বহারা’ পরিচয় নিয়ে রাস্তায় নামে নাই; কিন্তু তার মানে এই না যে শ্রেণি প্রশ্ন অনুপস্থিত ছিল। বরং মানুষ নেমেছিল অপমানিত নাগরিক, বঞ্চিত যুবক, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার জনগণ, সাংস্কৃতিকভাবে অপদস্থ মধ্যবিত্ত, ধর্মীয় ও আঞ্চলিকভাবে অবমূল্যায়িত মানুষ, এবং ভবিষ্যৎহীন প্রজন্ম হিসেবে। এই সব অভিজ্ঞতার ভিতরে পুঁজি, রাষ্ট্র, শ্রেণি, মর্যাদা, পরিচয় ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ছিল। বাম রাজনীতি যদি শ্রেণিচেতনাকে ইতিহাস-চেতনা হিসেবে ধরতে পারত, তাহলে জুলাইয়ের এই বহুমাত্রিক গণউত্থানকে সে পুঁজি ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণের গাঠনিক শক্তির আবির্ভাব হিসেবে বুঝতে পারত।
তাই শ্রেণি রাজনীতি ব্যর্থ হয়েছে কি না সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের বামপন্থা শ্রেণি রাজনীতিকে ইতিহাসের বাস্তব গতি, পুঁজির নতুন রূপ, রাষ্ট্রের দমন কাঠামো, এবং জনগণের বহুবিধ অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে বুঝতে পেরেছে কি না। উত্তর হলো : বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পারে নাই। এই ব্যর্থতা কাটাতে হলে বাম রাজনীতিকে শ্রমিকের তাৎক্ষণিক দাবি থেকে শুরু করে খাদ্য, জমি, জ্বালানি, ঋণ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মর্যাদা, স্থানীয় স্বশাসন, এবং গণসার্বভৌমত্ব সবকিছুকে পুঁজি ও শ্রমশক্তির ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের ভেতরে নতুনভাবে ভাবতে হবে।
এখানেই ‘গণ’ শ্রেণির বিকল্প নয়; বরং ইতিহাসে শ্রেণি-বিরোধের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক রূপ। জুলাইয়ে ‘গণ’ এমন এক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে হাজির হয়েছে, যার মধ্যে শ্রমিক আছে, কৃষক আছে, ছাত্র আছে, বেকার যুবক আছে, প্রবাসী পরিবারের যন্ত্রণা আছে, ধর্মীয় অপমানের স্মৃতি আছে, মধ্যবিত্তের হতাশা আছে, এবং রাষ্ট্রীয় দমনের বিরুদ্ধে মর্যাদার দাবি আছে। এই গণকে শ্রেণি রাজনীতির বাইরে ভাবলে ভুল হবে; আবার একে কেবল কারখানার শ্রমিক-পরিচয়ে নামিয়ে আনলেও ভুল হবে। কাজ হলো এই গণের ভিতরে পুঁজি-বিরোধী ইতিহাসচেতনা, গাঠনিক ক্ষমতা, এবং মুক্তির রণনীতি তৈরি করা।
ইসলামি রাজনীতিও আজ গভীর সংকটে। কারণ ইসলামি রাজনীতির বড় অংশ ইসলামের ন্যায়, আমানত, জুলুমবিরোধিতা, মজলুমের হক, শূরা, উম্মাহ, তাকওয়া এসব নৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে রূপান্তর করতে গিয়ে আধুনিক রাষ্ট্রকে যথেষ্টভাবে পর্যালোচনা করে নাই। তারা ধরে নিয়েছে, রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেলেই সমাজকে নৈতিক করা যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, আধুনিক রাষ্ট্র নিজেই নিরপেক্ষ কোনো যন্ত্র না। আধুনিক রাষ্ট্রের হাতে আইন, পুলিশ, সেনা, কারাগার, আদালত, আমলাতন্ত্র, সীমান্ত, নজরদারি সব ধরনের বলপ্রয়োগ কেন্দ্রীভূত থাকে। রাষ্ট্র নিজেকে জনগণের ঊর্ধ্বে দাঁড় করিয়ে বলে : আইন প্রয়োগের নামে বলপ্রয়োগের বৈধ অধিকার শুধু আমার।
ইসলামি রাজনীতির বড় ভুল এখানেই। তারা অনেক সময় পশ্চিমা জাতিরাষ্ট্রের কাঠামো অক্ষত রেখে তার ওপর ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ নাম বসাতে চায়। অর্থাৎ রাষ্ট্র থাকবে আগের মতোই কেন্দ্রীভূত, আমলাতান্ত্রিক, পুলিশ-নির্ভর, দলনির্ভর, সীমান্ত-জাতীয়তাবাদী; শুধু তার ভাষা বদলে যাবে আইন হবে ‘ইসলামি’, শাসক হবে ‘ধর্মপ্রাণ’, স্লোগান হবে ‘শরিয়াহ’, ইত্যাদি। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃতি বদলাবে না। ফলে সেটা ইসলামের ন্যায়রাষ্ট্র না হয়ে আধুনিক শাসনবাদী রাষ্ট্রের ওপর ইসলামি লেবাস চাপানোর প্রকল্প হয়ে ওঠে।
সহজ উদাহরণ দিই। ধরুন, কোনো সরকার দুর্নীতি করে, বিরোধীদের দমন করে, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, পুলিশ দিয়ে মানুষ ভয় দেখায়, কিন্তু একই সঙ্গে ধর্মীয় ভাষায় বলে ‘আমরাই ইসলামের রক্ষক।’ তাহলে কি সেটা ইসলামি রাজনীতি? না। সেটা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৈধতা বানানোর জন্য ধর্মের ব্যবহার। যেমন সেক্যুলার ফ্যাসিবাদ মুক্তিযুদ্ধ, প্রগতি, উন্নয়ন, বা ধর্মনিরপেক্ষতার ভাষা ব্যবহার করে দমন চালাতে পারে; তেমনি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ ইসলাম, শরিয়াহ, নৈতিকতা, বা উম্মাহর ভাষা ব্যবহার করে দমন চালাতে পারে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো : ইসলাম কি রাষ্ট্রক্ষমতার সীলমোহর, নাকি রাষ্ট্রক্ষমতার নৈতিক বিচারক? যদি ইসলামকে রাষ্ট্রের সীলমোহর বানানো হয়, তাহলে শাসক যা করবে তাই ‘ধর্মের নামে’ বৈধতা পাবে। কিন্তু ইসলাম যদি নৈতিক বিচারক হয়, তাহলে রাষ্ট্র, শাসক, দল, আমলা, ব্যবসায়ী, সেনা, আলেম সবাইকে জবাবদিহির অধীন হতে হবে। ইসলাম তখন ক্ষমতার অলংকার না; জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানদণ্ড।
ইসলামপন্থি রাজনীতির আরেকটি সংকট হলো, তারা আধুনিক সার্বভৌমত্বের ধারণা যথেষ্টভাবে ভাঙতে পারে নাই। আধুনিক জাতিরাষ্ট্র বলে রাষ্ট্রই সর্বোচ্চ, রাষ্ট্রের আইনই শেষ কথা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাই প্রধান। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ আল্লাহর বান্দা, জমিন আল্লাহর আমানত, ক্ষমতা আমানত, শাসক জবাবদিহির অধীন, এবং ন্যায়বিচার রাষ্ট্রের চেয়েও বড় নীতি। তাই ইসলামি রাজনীতি যদি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতাকে প্রশ্ন না করে, তাহলে সেটা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপূজার আরেক রূপে পরিণত হয়।
নজির হিসেবে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা মনে করা যায়। পাকিস্তান মুসলমানদের রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হলেও সেখানে ইসলামি ন্যায়, জনগণের শূরা, প্রাদেশিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক সুবিচার, সামরিক-আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার সীমা এসব প্রশ্ন সমাধান হয় নাই। রাষ্ট্রের ওপর ইসলামি পরিচয় ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরে সামরিক আমলাতন্ত্র, এলিট-দখল, প্রাদেশিক বৈষম্য, এবং জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ থেকে গেছে। ফলে ইসলাম রাষ্ট্রের নৈতিক রূপান্তর ঘটাতে পারে নাই; বরং রাষ্ট্র অনেক সময় ইসলামকে নিজের বৈধতার ভাষা বানিয়েছে।
বাংলাদেশেও একই বিপদ আছে। যদি ইসলামি রাজনীতি শুধু বলে ‘ক্ষমতায় গেলে ইসলাম কায়েম করব’ কিন্তু ব্যাংক লুটের বিচার কীভাবে হবে, শ্রমিকের অধিকার কীভাবে রক্ষা হবে, কৃষকের জমি কীভাবে বাঁচবে, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, নারীর মর্যাদা কীভাবে রক্ষা হবে, পুলিশ-আমলা-আদালত কীভাবে জবাবদিহির অধীন হবে, কর্পোরেট পুঁজির দখল কীভাবে রুখবে ইত্যাদি ব্যাপারে কিছুই না বলে তাহলে সাধারণ মানুষ তাদের ওপর নিঃশর্ত ভরসা করবে না।
আরেকটি সমস্যা হলো, অনেক ইসলামি দল নিজেদের ভেতরেও গণতান্ত্রিক না। তাদের মধ্যে দলীয় আনুগত্য, শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অন্ধ ভক্তি, প্রশ্নহীন শৃঙ্খলা, নারী ও তরুণদের সীমিত ভূমিকা, আলেম-নেতৃত্বের একচেটিয়া ক্ষমতা, এবং ভিন্নমতকে সন্দেহ করার প্রবণতা থাকে। তারা সমাজকে অনেক সময় জীবন্ত, বহুমাত্রিক, বিতর্কময় মানবসমাজ হিসেবে দেখে না; বরং ‘শৃঙ্খলিত সমাজ’ হিসেবে কল্পনা করে যেখানে সবাই একইভাবে কথা বলবে, একইভাবে চলবে, একই রাজনৈতিক-ধর্মীয় কর্তৃত্ব মেনে চলবে।
এই জায়গা থেকেই ফ্যাসিবাদী ঝুঁকি তৈরি হয়। ফ্যাসিবাদ শুধু সেক্যুলার ভাষায় আসে না; ধর্মীয় ভাষাতেও আসতে পারে। যখন কোনো দল বা গোষ্ঠী বলে ‘আমরাই সত্যের একমাত্র প্রতিনিধি, আমাদের বিরোধিতা মানে ধর্মের বিরোধিতা, আমাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন মানে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ তখন রাজনীতি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এতে ইসলাম মুক্তির ভাষা না হয়ে ভয় ও নিয়ন্ত্রণের ভাষা হয়ে যায়।
মাজারে হামলা, ভিন্ন মতের আলেমকে কাফের বা বাতিল বলা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে সন্দেহের চোখে দেখা, সংস্কৃতি ও লোকায়ত ধর্মচর্চাকে জোর করে মুছে দিতে চাওয়া এসবও ইসলামি রাজনীতির সংকটের লক্ষণ। কারণ এগুলো ইসলামের ন্যায়, রহমত, আদব, ইহসান, এবং মানুষের মর্যাদার ভাষাকে দুর্বল করে। যারা ধর্মের নামে সমাজকে ভয় দেখায়, তারা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা পেলে আরও বড় দমন চালাতে পারে এই আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়।
তাই ইসলামি রাজনীতির সামনে আসল কাজ হলো ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ স্লোগান পুনরাবৃত্তি করা না; বরং আধুনিক রাষ্ট্র, পুঁজিবাদী লুট, আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা, ঋণনির্ভর অর্থনীতি, পুলিশি দমন, সাংস্কৃতিক অপমান, এবং বৈশ্বিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে ইসলামি নৈতিকতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা তৈরি করা। ইসলামকে ক্ষমতার পোশাক বানানো যাবে না; ইসলামকে ক্ষমতার বিচারক, জনগণের ন্যায়দাবির ভাষা, মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি, এবং জুলুমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য বানাতে হবে।
তাই জনগণ ইসলামি দলগুলোকে নিঃশর্ত বিকল্প মনে করে না। কারণ তারা দেখে, অনেক ইসলামি দল পুরানা রাষ্ট্রের কাঠামো ভাঙতে চায় না; বরং সেই রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিজেরা নিতে চায়। তারা রাষ্ট্রের সহিংসতা, আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রীয়তা, দলীয় আনুগত্য, এবং শৃঙ্খলিত সমাজের কল্পনাকে যথেষ্টভাবে প্রশ্ন করে না। ফলে তাদের রাজনীতি অনেক সময় মুক্তির পথ না হয়ে ক্ষমতার আরেক রূপ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য দরকার এমন ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তা, যা রাষ্ট্রক্ষমতাকে পূজা করবে না; বরং রাষ্ট্রকে ন্যায়, আমানত, শূরা, জবাবদিহি, সামাজিক সুবিচার, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা, শ্রমিক-কৃষকের হক, এবং মানুষের মর্যাদার অধীন করবে। ইসলামি রাজনীতি যদি এই পথে না যায়, তাহলে সে সেক্যুলার ফ্যাসিবাদের বিকল্প হবে না; বরং ধর্মীয় ভাষায় নতুন ফ্যাসিবাদের ঝুঁকি তৈরি করবে।
এখন ‘সেক্যুলার জাতিবাদজাত ফ্যাসিবাদ’ কথাটার দিকে আসি। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক শক্তিকে ধীরে ধীরে ‘রাষ্ট্রীয় জাতিবাদ’-এ রূপান্তর করে। এই জাতিবাদ পরে জনগণের সার্বভৌমতাকে রাষ্ট্রের আনুগত্যে নামিয়ে আনে। ‘জাতি’ ধীরে ধীরে ‘দল’ হয়ে যায়, আর ‘রাষ্ট্র’ হয়ে যায় ‘জাতির অভিভাবক’। ফলে ভিন্নমত রাষ্ট্রদ্রোহে পরিণত হয়। এই ধারাই শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বাচনহীনতা, প্রশাসনিক দলীয়করণ, এবং কর্পোরেট-আমলাতান্ত্রিক লুটপাটতন্ত্র তৈরি করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান মূলত এই রাষ্ট্র-জাতি-দল জোটের বিরুদ্ধে জনগণের বিস্ফোরণ।
কিন্তু কেন ৮ আগস্টকে ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’ বলা যায়? কারণ গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রের বৈধতাকে প্রশ্ন করলেও পরবর্তীতে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাকে (constituent power) স্বীকার করেছে এবং শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে সেনাসমর্থিত উপদেষ্টা সরকার গঠন করেছে। জনগণকে নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়নি, অর্থাৎ গণঅভ্যুত্থানের কর্তাশক্তিকেই অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে যা ঘটেছে তা হলো পুরানা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কাঠামো এবং বৈশ্বিক পুঁজির গ্রহণযোগ্যতার সীমার ভিতরে ‘সংকট ব্যবস্থাপনা’ এবং পুনরায় ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র অক্ষত রেখে দেওয়া। জনগণের বিদ্রোহকে ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ’ করা হয়েছে। এটাই প্রতিবিপ্লবের ক্লাসিক রূপ বিপ্লবের শক্তিকে ব্যবহার করে পুরানা রাষ্ট্রকে নতুন বৈধতা দেওয়া।
ফরহাদ মজহার : কবি, চিন্তক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক