বাংলাদেশে নারীবাদের চর্চা বা নারীবাদী দর্শনের আলাপ উঠলেই বেশিরভাগ মানুষের মানসে অত্যন্ত নেতিবাচক একটি দৃশ্যমান ছবি ফুটে ওঠে। আমাদের সমাজের বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীবাদের যে ভাবমূর্তি বিদ্যমান, তাতে নারীবাদী নারী মাত্রই বহুগামী এবং তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ নেই ধরে নেওয়া হয়, তারা শার্ট-প্যান্ট পরে, ছোট চুল রাখে, ধূমপান করে, তারা পুরুষ বিদ্বেষী, পরিবার বিদ্বেষী এবং বিয়ের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানে তাদের অবিশ্বাস। এদেশে কেবল অশিক্ষিত বা নিরক্ষর ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই কেবল নয়, উচ্চশিক্ষায় দীক্ষিত পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যে নারীবাদ নিয়ে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটি আসলে মূল নারীবাদী দর্শনের পরিপন্থী। এর পেছনে প্রধান কারণ, দুইশো বছরের চেয়ে বেশি বয়সী এই দর্শন বাংলাদেশে এখনো বোধগম্য হয়ে ওঠেনি।
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও এটাই বাস্তবতা যে, এই অজ্ঞতা নারীবাদ বিদ্বেষী শ্রেণি এবং তথাকথিত নারীবাদী শ্রেণি উভয়ের মননেই গভীরভাবে প্রথিত। নারীবাদ নিয়ে গভীর অথচ সহজ আলাপে দেখা যায়, যারা এই দর্শনের বিপরীতে অবস্থান নেন, তাদের অনেকেই সমাজে নারীর সমঅধিকার চান। আবার যারা এর পক্ষে আছেন, তারাও সেটাই চান। এই চাওয়ার মধ্যে কোনো বিরোধ না থাকলেও নারীবাদের ভুল পাঠ আমাদের দেশে এই আন্দোলনকে জন্মের পর থেকেই দুর্বল এবং বিভক্ত করে রেখেছে।
আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা ও ধর্মীয় অন্ধত্ব নারীর সমতা আদায়ের পক্ষে অন্যতম অন্তরায় বলে প্রতিষ্ঠিত হলেও, আমার ব্যক্তিগত মতামত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে আর্থ-রাজনৈতিক কারণেই সেসব সময়ের সাথে সাথে অনেকটাই শক্তিহীন হয়ে গেছে। দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া, গ্রামের অতি সাধারণ ধর্মভীরু পিতা-মাতা অথবা অতি রক্ষণশীল অভিভাবকও কন্যাকে শিক্ষিত করতে আগ্রহী, তাদের কর্মজীবী হওয়ার পক্ষে।
এক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন অবধারিত হয়ে ওঠে : তাহলে, বাংলাদেশে নারীবাদের প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায় কি আর সাধারণ মানুষের এই তত্ত্ব মেনে নিতে আপত্তি কেন। এই প্রশ্নের উত্তর মোটেই একক বা সরলরৈখিক নয়, এটি অনেকাংশেই জটিল এবং ব্যাখ্যামূলক। সে ব্যাখ্যায় যেতে হলে প্রথমেই নারীবাদের ভিত্তির ইতিহাসে আমাদের প্রবেশ করতে হবে।
নারীর সমতা আদায়ের লড়াই শুরু হয় আজ থেকে প্রায় ২৩৫ বছর আগে। ১৭৯২ সালে ব্রিটিশ দার্শনিক মেরি ওলস্টোনক্রাফ্ট তার আ ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইটস অব ওম্যান বইয়ে নারীদের শিক্ষার সুযোগ ও সমতার দাবি তুলে ধরেন। মূলত সেটিই নারীবাদের ভিত্তিপ্রস্তর। এক কথায় বলতে গেলে, নারীবাদী চিন্তাধারার উৎপত্তি আঠারো শতকের শেষের দিকে পশ্চিমা বিশ্বে, বিশেষ করে ফ্রান্সে। ফরাসি বিপ্লবের সময় এবং ইউরোপে প্রথম শিল্পবিপ্লবের সময় নারীর সমঅধিকারের বিষয়টি সামনে আসে। পুরুষদের সমান বেতন-ভাতার দাবিতে রাজপথে নেমে আসেন হাজার হাজার শ্রমজীবী নারী। তারপর কালের পরিক্রমায়, ১৮ ও ১৯ শতকের ইউরোপ ও আমেরিকার মিলিত চিন্তাধারাই আজকের নারীবাদের সূচনা করে। এরপর পশ্চিমা নারীবাদ তিনটি তরঙ্গের মধ্য দিয়ে গিয়ে আজকের রূপ নেয়। সেখানে, নারীর পরিশ্রমের ন্যায্য মজুরির দাবির সাথে যুক্ত হয় নারীর দেহের অখন্ডতা, স্বাধীনতা ও চলাফেরার অধিকার, সর্বজনীন ভোটাধিকার, সরকারি পদ লাভের অধিকার, কাজ করার অধিকার, সমান বেতনের অধিকার, সম্পত্তির মালিকানা, শিক্ষা, সামরিক বাহিনীতে কর্ম, আইনগত চুক্তি করার অধিকার, সর্বোপরি, বৈবাহিক, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব ও ধর্মীয় অধিকার।
পাশ্চাত্যের পথ অনুসরণ করে নারীবাদের প্রথম তরঙ্গের সময়ই বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের হাত ধরে এই ভূখণ্ডে নারী জাগরণের, বিশেষ করে মুসলমান নারী জাগরণের সূচনা হয়।
পর্দাপ্রথার কঠোর বেড়াজালে বন্দি নারীদের শিক্ষার আলো দেখিয়ে তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং লেখনীর মাধ্যমে সমাজে লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করেন। তবে এক্ষেত্রে, পাশ্চাত্যের মতো বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম তরঙ্গে যেসব দাবি উঠে আসে, যেমন বৈবাহিক চুক্তিতে সমঅধিকার এবং সম্পত্তি লাভ ও ভোগ করার অধিকার অর্জনের দাবি, সেটি বাংলাদেশে তেমন মুখ্য হয়ে ওঠে না। বরং শিক্ষা লাভের সুযোগ তৈরি আর ঘরের কোণে অবরুদ্ধ না থাকার বিষয়টিই সে সময় মুখ্য ছিল। পরের দুই ধাপে ইউরোপ এবং আমেরিকা দাবির নানা স্তরের ভেতর দিয়ে গিয়ে বর্তমান নাগরিক সমতার ভিত্তিতে আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার সম-অধিকার অনেকার্থেই নিশ্চিত হয়। বিপরীতে, বাংলাদেশে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পার্থক্যের কারণে এই আন্দোলনটি এখনো বাধার সম্মুখীন।
সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দেখা দেয়, বাংলাদেশের বেশিরভাগ নারীবাদীর র্যাডিকেল নারীবাদী ধারার প্রতি ঝুঁকে পড়া। তারা নারীর বৈশিষ্ট্যকে বিশেষ করে দেখতে গিয়ে নিজেরাই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। ফলে নারীবাদের সঙ্গে পুঁজিবাদ আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যে গভীর যোগসূত্র সেটি তারা ধরতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশের নারীবাদীরা নারীর অর্থনৈতিক মুক্তিকে অনেকাংশে অগ্রাহ্য করে স্বাধীনভাবে জীবনধারণের অধিকার আদায়ের দাবিকে অনেকটাই ভিক্ষাবৃত্তির পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একজন নারীও সমাজের অন্তঃসারশূন্য, ঘুণে ধরা মূল্যবোধের বাইরে বের হতে সাহস করেন না। কিছু বাহ্যিক আচরণের মাধ্যমে তারা প্রতিবাদ করেন ঠিকই কিন্তু নারীবাদের মূল ভিত্তি অর্থনৈতিক মুক্তিকে নিজেদের শক্তি হিসেবে দেখতে ব্যর্থ হন। ফলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েও বেশিরভাগ নারী পরিবারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় স্বাধীন মতপ্রকাশ করার সাহস দেখান না বা সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভার বহন করার ঝুঁকি নেন না। তারা সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারীর নিপীড়নের মাত্রা আর তার সাথে পুঁজিবাদের সম্পর্ক কী সেটাও সামগ্রিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ। ফলে নিজের অজান্তেই তারা নারীর শ্রেণি সংগ্রাম সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা রাখেন। বাংলাদেশে নারীবাদের মূল সমস্যা এই শ্রেণিব্যবস্থা না বুঝেই নারীবাদী আন্দোলন জারি রাখা।
কোনো আন্দোলনই একক এবং ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ছাড়া সফল হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত কেবল একটি শ্রেণির নারী, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির নারীরা। ঠিক যে কারণে পাশ্চাত্যে নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গ ব্যর্থ হয়। সেখানে শ্বেতাঙ্গ নারীবাদ অ-শ্বেতাঙ্গ বিশ্বের নারীদের সমস্যা বুঝতে পারেনি।
ঠিক সেভাবেই পশ্চিমা নারীবাদী অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন হয়েও বাংলাদেশে নারীবাদীরা নিজেদের মধ্যেই অসমতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজস্ব সংগ্রাম ও আন্দোলন পরিচালনা করতে শেখেনি।
উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বে স্কুল-কলেজে মেয়েদের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে, তারা শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করছে, তারা শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করছে। তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করছে, পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে। চলাফেরার স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে। ঠিক সেসময় বাংলাদেশে নারীর শ্রেণি সংগ্রাম মূলত পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই লড়াই করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে একটা শ্রেণির নারীরা যখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বিতা অর্জন করেও, নারীমুক্তির ট্রফি চেয়ে বেড়াচ্ছেন, তখন অর্থনীতিতে চালিকাশক্তি হয়েও পোশাক কারখানার প্রায় ৩২ লাখ নারী শ্রমিক দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবে জর্জরিত। ন্যূনতম মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের জন্য তাদের নিরন্তর সংগ্রাম করতে হচ্ছে। অথচ শহরকেন্দ্রিক কোনো নারীবাদী আন্দোলনেই তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ, বেশ কয়েক মাস আগে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধি ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রচারণার প্রতিবাদে ‘নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা’ ব্যানারে নারীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। নারীর অধিকার আদায় এবং সম্মান রক্ষার্থে এই আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেখানে সমাজের শ্রমজীবী নারী বা গ্রামের প্রান্তিক নারীর সেই অর্থে কোনো উপস্থিতিই ছিল না। আন্দোলনটি একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির জনবিচ্ছিন্ন আন্দোলনে পরিণত হয়। এটিই মূলত বাংলাদেশে নারীবাদী আন্দোলন সফল না হওয়ার কারণ। বিচ্ছিন্ন এবং অংশগ্রহণমূলক নয়, এ রকম কোনো উদ্যোগই কখনো সফল হয় না।
বাংলাদেশে নারীবাদী আন্দোলনের সব কটি ধারাই এই শ্রেণি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সামগ্রিকভাবে নারী মুক্তির বিষয়কে বুঝতে সক্ষম হননি। বরং এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি সমাজের নিপীড়িত নারীদের থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছেন প্রথম থেকেই। তারা সমতার ভিত্তিতে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন বরাবরই। সমতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অর্থনীতিতে নাগরিক মাত্রই সমান মৌলিক অধিকার ভোগ করবেন। সেখানে আলাদা করে লিঙ্গভিত্তিক অধিকার আদায়ের প্রয়োজনীয়তা নেই বললেই চলে। সমাজের সদস্য হিসেবে একজন পুরুষ যেসব সুবিধা ভোগ করবেন, নারীও তাই করবেন। নারীবাদ আন্দোলনের জন্মভূমি ইউরোপ এবং একই সাথে আমেরিকা তথা উন্নত বিশ্বের প্রায় সব দেশ মৌলিক অধিকার প্রাপ্তির বিষয়টা সবার জন্য নিশ্চিত করার ফলে সেখানে নারীকে নতুন করে সমতা আদায়ের লড়াই আর করতে হয় না। সেখানে নারীরা বরং কর্ম দিয়ে সমতা বজায় রাখার প্রচেষ্টায় আছেন। তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন, নারীবাদ আর মানবতাবাদ ভিন্ন কোনো মতাদর্শ নয় বরং সম্পূরক উপাদান।
সেই মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশেও যদি শিক্ষা, চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে সব শ্রেণির নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত হয়, এদেশের নারীদের আলাদা করে আর লড়াই চালিয়ে যেতে হবে না। মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠার ফলেই বাংলাদেশে নারীবাদ আন্দোলন সফল হবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী