প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩

আইন ও বিচারে সর্বাত্মক বাংলার প্রচলন

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম

চেতনা কি কালনির্ভর? মৌসুমি চেতনাক্রান্ত হওয়া কি জাতি হিসেবে আমাদের নিয়তি? বাংলা ভাষার ভবিতব্য? আমরা কেন ফেব্রুয়ারি মাস ছাড়া অন্য সময়ে বাংলার চিন্তা করি না। এবং চর্চায় রাখি না। চিন্তার সাবালকত্ব অর্জনে ভাষার ভূমিকা অন্য যে কোনো কিছুর চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এমন বোধ দ্বারাও আমরা তাড়িত নই। যদিও জীবনে, মননে, আইনে, প্রশাসনে বাংলার সর্বত্রকরণ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। উচ্চ আদালত ও বিচারিক আদালত আমাদের বিচারব্যবস্থার বড় অংশ অথচ আইন ও বিচারে সর্বাত্মক বাংলার প্রচলন এখনো অবারিত নয়।

স্টেটহুড বা রাষ্ট্রসত্তা (রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত চরিত্র, সার্বভৌমত্ব, এবং অস্তিত্বের সামগ্রিক প্রকাশ) গঠনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বিচার বিভাগ। বিচার বিভাগ পরিচালনার যে ভাষা-মাধ্যম (প্রত্যেক জাতিরাষ্ট্র তার প্রয়োজন অনুযায়ী দাপ্তরিক ও আইনি নানা কাজে তার নাগরিকদের সুবিধা বিবেচনায় ভাষা নির্ধারণ করে) সেটিই মূলত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রসত্তার প্রথম প্রকাশ। আইন প্রণয়ন ও বিধি মাফিক বিচারকাজ পরিচালনা কে করছে, তা খুবই গুরুতর প্রসঙ্গ : ঔপনিবেশিক শাসকের চাপিয়ে দেওয়া ভাষা না দেশীয় ভাষা? জাতীয় ভাষায় বিচারকাজ পরিচালনা করতে পারা একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব পারঙ্গমতার প্রকাশ।

ভাষা-সাম্রাজ্যবাদ বলে বহুল প্রচারিত প্রপঞ্চটির শিকার আমাদের বাংলা ভাষাও। যেমন এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বহু দেশ ইংরেজির পতাকাতলে। জাতিসংঘ নিয়মিতই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের ইংরেজি ভাষা বিশেষজ্ঞদের ইংরেজিভাষী নয় এমন দেশগুলোতে পাঠাচ্ছে বিভিন্ন পর্যায়ে ইংরেজি শিক্ষার নীতি-কৌশল তথা সিলেবাস তৈরির জন্য। অথচ জাতিসংঘের ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল প্রতিটি ভাষার স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিতকরণে ব্যবস্থা নেওয়া।

সাবঅল্টার্ন ইতিহাসের অন্যতম তাত্ত্বিক পার্থ চক্রবর্তী ভারতীয় জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে জরুরি গ্রন্থ ও প্রবন্ধ লিখে চর্চা জারি রেখেছেন। দ্য কুমার অব ভাওয়াল অ্যান্ড দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম বইয়ে তিনি গভীর অভিনিবেশ সহকারে উদ্ঘাটিত করেছেন এই বাংলা অঞ্চলের এক দারুণ জাতীয়তাবাদী বৈশিষ্ট্য।

তৎকালীন ঢাকার ভাওয়ালগড়ের রাজকুমারকে নিয়ে আলোচিত মামলাটি এই ইতিহাস গ্রন্থের কেন্দ্রীয় বিষয়। ভাওয়ালের রাজকুমারকে নিয়ে মামলার ওই কাহিনিকে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছেন। একাডেমিক সচেতনতায় এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন যে শিরোনামেই প্রসঙ্গটি অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি যথেষ্ট সচেতন?

২.
১৯৯৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি মামলা পরিচালিত হয়। একজন জুলুভাষী স্কুলশিক্ষক একটি মোটরযান চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হন। মামলা চলাকালে তিনি দাবি করেন, তার বিচারকার্য জুলু ভাষায় হতে হবে। জুলু দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধানের অন্যতম তালিকাভুক্ত ভাষা। মামলায় ভাষার প্রশ্নে ম্যাজিস্ট্রেট তার আবেদন নাকচ করলে সেই শিক্ষক হাইকোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্ট তার দণ্ড বহাল রাখেন এই যুক্তিতে, যে ব্যক্তি ইংরেজি কিংবা আফ্রিকান ভাষা জানেন, তালিকাভুক্ত অন্য ভাষায় বিচার পাওয়ার অধিকার তার নেই। তবে হাইকোর্ট স্বীকার করে—বিচারপ্রার্থী যে ভাষা বোঝেন, সেই ভাষাতেই তিনি বিচার লাভের অধিকার রাখেন। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে তাকে অনুবাদ করে দিতে হবে।
(সূত্র : H.J. Lubbe, The Right to Language in Court: A Language Right or a Communication Right?, (Bloemfontein: University of Free State, South Africa), p.380)।

দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধান অনুযায়ী, ‘সরকারি ভাষা’ হিসেবে স্বীকৃতির অর্থ হচ্ছে একজন ব্যক্তি সরকারের সঙ্গে যেমন, তেমনি আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত আদালতের সঙ্গেও সেই ভাষায় যোগাযোগ করার অধিকার রাখেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধানের ৩৫(৩)(ক) অনুচ্ছেদের ভাষ্য : ‘Every accused person has a right to a fair trial, which includes the right to be tried in a language that the accused person understands or, if that is not practicable, to have the proceedings interpreted in that language.’

ভাষানীতি দুনিয়ার নানা প্রান্তেই আলোচনার বিষয়। ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার গণমাধ্যমে শীর্ষ শিরোনাম হয়েছিল—আদালতের কাঠগড়ায় ভাষানীতি। এতে বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকার ১১টি সরকারি ভাষার মধ্যে কেবল ইংরেজি ও আফ্রিকান আদালতের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি ৯টি ভাষাই সরকারের সরবরাহকৃত আদালতের দোভাষীরা অনুবাদ করে বিচারকাজে সাহায্য করছেন। দক্ষিণ আফ্রিকানদের ভাষাপ্রীতি প্রশংসনীয়।

৩.
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে সাবেক বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলায় আদেশ ও সিদ্ধান্ত দেওয়া শুরু করেন, যা বিচার বিভাগের ইতিহাসে প্রথম। এরপর থেকে তিনি চেম্বার বিচারপতি হিসেবে বাংলায় আদেশ ও সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সে বছরের পটপরিবর্তন পর্যন্ত। এর আগে  হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি থাকাকালে তিনি বাংলায় প্রায় ৩০ হাজার রায় ও আদেশ দেন। কিন্তু বাংলায় বিচার পরিচালনার প্রাথমিক ইতিহাস ততটা মধুর নয়।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পর আইন-আদালতে বাংলা ব্যবহারের যে স্বাধীনতাজাত প্রণোদনা দেখা দিয়েছিল তা ক্রমেই ম্রিয়মাণ হতে থাকে। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাগর্বী বাংলার মানুষ সংবিধানও বাংলায় রচনা ও প্রণয়ন করতে পেরেছিল। সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ ঘোষিত হয়। ইংরেজি পাঠের সঙ্গে বাংলা পাঠের বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠের প্রাধান্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫৩ (৩)-তে ঘোষিত হয়েছিল।

১৯৭৫ সালের সরকার পরিবর্তনের পর ইংরেজি ব্যবহার আবার জায়গা পুনরুদ্ধার করে। এর প্রেক্ষিতে  সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদ কার্যকর করার উদ্দেশ্যে ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন প্রণীত হয়েছিল। এ আইনের ৩ ধারার বিধান : প্রবর্তন ও কার্যকরী ব্যবস্থা। (১) এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনগত কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে। (২) উপধারায় উল্লিখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহা হইলে উহা বে-আইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে। (৩) যদি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন, তাহা হইলে উক্ত কার্যের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং তাহার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।

এ আইন প্রচলনের পর থেকে সব আইন, অধ্যাদেশ, বিধিবিধান, প্রজ্ঞাপন প্রভৃতিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার শুরু হয়ে এখনো অব্যাহত থাকলেও আদালতের কিছু আইনজীবী ও বিচারক ইংরেজি ব্যবহারের অহেতুক অহমিকা ত্যাগ করতে পারেননি। বিচারকাজ পরিচালনার জন্য ১৯৫৮ সালে প্রণীত হাইকোর্ট বিধিতে আদালতের ভাষা ‘ইংরেজি’ বলা হয়েছে এবং ১৯৭৩ সালের বিধিতে ‘ইংরেজি/বাংলা’ বলা হয়েছে।

এই বিধির শক্তিতেই এখনো হাইকোর্ট বিভাগে ইংরেজির ব্যবহার অব্যাহত আছে। যেহেতু হাইকোর্ট বিভাগের প্রায় সব কাজকর্ম ইংরেজিতে হয়, তাই এর সংগত ধারাবাহিকতায় আপিল বিভাগের সব কাজকর্মেও ইংরেজি ব্যবহার করা হয়।

ভাষাসৈনিক অভিধাপ্রাপ্ত আইনজীবী গাজীউল হক প্রণীত উচ্চতর আদালতে বাংলা প্রচলন বইয়ে তুলে ধরেছেন উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহারের প্রাথমিক সংগ্রামের কথা। উচ্চ আদালতে বাংলার জন্য যে আইনজীবী প্রথম সংগ্রাম শুরু করেন তিনি বাংলা সামছুদ্দীন নামে পরিচিত। ১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার পর তিনি ১৯৬৬ সালের ৫ ডিসেম্বর ঢাকা হাইকোর্টে বাংলা ভাষায় একটি ফৌজদারি রিভিশন দাখিলের চেষ্টা করেন। অ্যাডভোকেট সামছুদ্দীন আহমদ পাকিস্তান আমলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে সফল হতে না পারলেও ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক কীভাবে ভাষাশহীদ রফিকের মায়ের ভর্ৎসনাবিদ্ধ হয়ে বিচারপতিদের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে বাংলা ভাষায় দরখাস্ত ইত্যাদি দাখিল করতে সমর্থ হয়ে ওই আদালতের বাংলা ভাষার চর্চা আরম্ভ করেছিলেন, তার কথাও তিনি তার ওই গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন।
(আদালতে বাংলা ভাষা! কাজী এবাদুল হক, সূত্র : সমকাল ২০-০২-২০২১)।

৪.
কেন ভিন ভাষাপ্রীতি? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই, আবার বিস্তারে যাওয়ার সুযোগও নেই। কেবল বুলি ছুড়ে যাওয়ার অংশ হিসেবে বলা যায়। উপনিবেশিত মনস্তত্ত্বই এর কারণ। উপনিবেশিত মনন এবং তার স্বরূপ নিয়ে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় হতে অনেক কাজ হয়েছে। ফ্রানৎস ফানোঁ থেকে শুরু করে হালের হামিদ দাবাশির মতো কাবিলরা উপনিবেশিত মানুষের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেছেন। ফানোঁ ১৯৫২ সালে প্রকাশিত তার Black Skin White Masks বইয়ে উপনিবেশিত মননের মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করেছেন। নয়া-উপনিবেশবাদ মনস্তত্ত্ব কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে হামিদ দাবাশির গুরুত্বপূর্ণ কাজ Brown Skins, White Masks

উপনিবেশিত মনস্তত্ত্বের তিনটি স্বরূপ উল্লেখ  করা যায় : ১. হীনম্মন্যতাজাত নিজ সংস্কৃতির প্রতি বিদ্বেষ ২.  পশ্চিমাসক্তি (westoxification) ৩. স্বীকৃতির লোভ ও অযাচিত মর্যাদাবোধ।

আমাদের এত এত ইংরেজিতে লেখা জাজমেন্ট তার কয়টি অন্যান্য দেশে আলোচিত হয়েছে? অথচ ২০১৯ সালের একটি যুগান্তকারী রিট পিটিশনে (রিট পিটিশন নং ১৩৯৮৯/২০১৬) বাংলাদেশ হাইকোর্ট তুরাগ নদীসহ বাংলাদেশের সব নদীকে আইনগত ব্যক্তি ও জীবন্ত সত্তা (লিগ্যাল/জুরিস্টিক পারসন) হিসেবে ঘোষণা করে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এই সিদ্ধান্তটি বহাল রাখে, যা নদীগুলোকে মামলা করার এবং পরিবেশগত অবক্ষয় থেকে সুরক্ষা পাওয়ার আইনগত অধিকারকে সুদৃঢ় করে। শ্লাঘা নিয়ে বলা যায়, রায়টি বাংলায় লেখা। হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল এর অথর জাজ। বাংলা হওয়া সত্ত্বেও নানা দেশ নিজ দায়ে ও খরচে তাদের ভাষায় অনুবাদ করে সেমিনার গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। সাড়ে পাঁচ দশকের ইংরেজিতে রায় লেখার ইতিহাসের অ্যান্টিথিসিস হিসেবে বাংলায় লেখা রায় অন্য উচ্চতা পেয়েছে পরিবেশবাদী এনজিও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) কর্তৃক দায়ের করা জনস্বার্থ রিট পিটিশনটিও।

ভাষাকে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবোধে জারিত জাতির নিজ ভাষা ভুলে অন্য ভাষা অবলম্বনের অ্যান্টিথিসিসকে চ্যালেঞ্জ করার সময় এসেছে।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত