কী হচ্ছে দেশে? মানুষের জীবনে স্বস্তি আসবে না? এই প্রশ্ন এখন মানুষের মুখে। গত চার মাসে ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার, খুন হয়েছে ১৭ জন। শিশুদের ওপর এই জঘন্য নিপীড়নের ঘটনা দেখতে দেখতে, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের জন্য এক যন্ত্রণাময় পরিবেশ তৈরি হয়েছে দেশে। পত্রিকার পাতা খুললে নারী ও শিশু নির্যাতন, হত্যার যে সমস্ত খবর চোখে পড়ে তাতে কি মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা যায়? কতটা কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয় তাদের! যে সময় তাদের সবার স্নেহ ভালোবাসা নিয়ে বেড়ে ওঠার বয়স, সেই বয়সে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে তাদের। অত্যাচারীর প্রতি ঘৃণার পাশাপাশি মানুষের ভেতর থেকে এই প্রশ্ন ক্ষোভের আকারে বেরিয়ে আসে, দেশে কি কোনো বিচার নেই? মৃত শিশুর খোলা চোখ যেন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা বিশ্বাস করতে পারছে না, কেউ তাদের সঙ্গে এ-রকম আচরণ করতে পারে! তারা যেন বলছে, আমাদের বাঁচার অধিকার তোমরা দিলে না?
একের পর এক ঘটনা ঘটছে আর আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে, শিশুদের অভিভাবকরা। ঘরে, বাইরে, স্কুল, মাদ্রাসা, অফিস এমনকি উপাসনালয়েও যেন নারী ও শিশুরা নিরাপদ নয়। ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে তাদের পৃথিবী। ছোটদের জীবনকে আশঙ্কা আর আতঙ্কে ভরিয়ে তুলল যারা, তারা তো বড়। বয়সে কিংবা ক্ষমতায় বড়। এমনকি শিক্ষায়ও বড়। কিন্তু শিক্ষায় বড় হলেই কেউ মানুষ হয় না। কোন দীক্ষায় তারা দীক্ষিত, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই আমাদের বাংলাভাষায় শব্দ আছে, শিক্ষা-দীক্ষা। অর্থাৎ শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বা দীক্ষাটাও খুব গুরুত্বর্পূণ। এটা অর্জিত না হলে শিক্ষিত হলেও একজন ভালোমানুষ হবে না, ডাক্তার মানবিক হয়ে উঠবে না। প্রকৌশলী অঙ্কের হিসাব বুঝবে, সমাজের দায় বুঝবে না। আইনজীবী আইন চর্চা করবে কিন্তু নিজে আইনের শাসন মানবে না। বিচারালয়ে বিচার হবে, কিন্তু গায়ের জোর বা ক্ষমতার জোরের কাছে যুক্তি পরাস্ত হবে। গণতন্ত্রের কথা বলে নির্বাচন হবে কিন্তু গণতন্ত্র চর্চা হবে না। যার তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে এবং এখনো আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের সর্বত্র গণতন্ত্র কথাটা যত বহুলভাবে উচ্চারিত হয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা যেন ততটাই কম করা হয়। কিন্তু গণতন্ত্র একটা অকার্যকর আপ্তবাক্য হয়ে পড়ে, যদি ব্যবস্থাটা গণতান্ত্রিক না হয়। স্বেচ্ছাচারের সঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পার্থক্য এখানে যে- স্বেচ্ছাচারে ক্ষমতা ক্রমাগত কেন্দ্রীভূত হয় এক ব্যক্তির হাতে। আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা বণ্টিত হয় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। সে কারণেই জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর। এক কথায় বলা হতো, রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ সংসদ, বিচারালয়, প্রশাসনের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক এবং ভারসাম্যমূলক সমন্বয় বজায় থাকবে। আর চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে থাকবে, প্রচার মাধ্যম- যা খুঁজে বের করবে সরকারের ত্রুটি, তুলে ধরবে জনগণের আকাক্সক্ষা। ফলে প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সক্ষমতা দুটোই থাকতে হবে। কেউ থাকবে না জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। লেখার স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ধারণ করতে হবে। সংবাদ প্রচারের স্বাধীনতা খর্ব করা যাবে না এবং মিথ্যা ও চরিত্র হননমূলক লেখার শাস্তি থাকতে হবে। সমস্ত কিছুই হবে যাচাইযোগ্য এবং মানুষের গ্রহণ বর্জনের স্বাধীনতা থাকতে হবে। এসব প্রশ্নে একমত হলেও, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় টাকার ক্ষমতার কাছে সব কিছুই অসহায় হয়ে পড়ে। একদিকে গণতন্ত্রের কথা অধিকারের কথা বলে গণতন্ত্রের মহিমা তুলে ধরা হচ্ছে, অন্যদিকে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে টাকাওয়ালারা। এই অসংগতি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দূর করা যাবে না। আবার সমাজের মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে বেশিরভাগ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়লে, গণতন্ত্র কথাটা অর্থহীন হয়ে পড়বে। এর ফল হবে মারাত্মক। মানুষ বিক্ষুব্ধ হবে, পাল্টাতে চাইবে ব্যবস্থাকে। তাই সমাজে গণতন্ত্র চর্চা করতে হলে আইন, বিচার ও প্রশাসনের মধ্যে এক ভারসাম্য বজায় রাখার কথা বলা হয়েছিল। ক্ষমতা বিভাজনের তত্ত্ব দিয়ে, সমাজে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করা হয়েছে। সবসময় সংস্কারের নামে আসলে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। যেন স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থার লাগাম ধরা যায়। মানুষের বাক স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করা যায়। কিন্তু সমাজের এই ভারসাম্য রক্ষিত হবে কোথায়? সংসদ হলো আইন তৈরির স্থান, কিন্তু সেই সংসদে যাওয়ার ক্ষমতা আছে কাদের? পার্লামেন্টে যাদের ক্ষমতা তারাই তো তৈরি করে, পরিচালনা করে প্রশাসন। ফলে ক্ষমতার দাপট থেকে বাঁচতে মানুষ যাবে কোথায়? এ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ হলো জনগণের শেষ ভরসার জায়গা। বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট হলে, সমাজে ভারসাম্য রক্ষার কোনো উপায় থাকে না। বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরির ক্ষেত্রে বিচারকের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই, কিন্তু বিচার বিভাগ শুধু বিচারকের ওপর নির্ভর করে না। সরকার ও আইনজীবী এখানে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিচারপতি নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি নির্ভর করে সরকারের সুনজরের ওপর। সিনিয়র ডিঙিয়ে বিচারপতির পদোন্নতির ঘটনা অনেক। সে কারণেই বিচার বিভাগের সংস্কার খুব প্রয়োজন। তা না হলে বিচারপতির পালিয়ে যাওয়া, বিচারপতির চেম্বারে হামলা, মব সৃষ্টি করে বিচারপতি অপসারণ, নির্দিষ্ট বলয়ের আইনজীবী হলে মামলায় দ্রুত জামিন পাওয়া, ক্ষমতা বলয়ের মধ্যে না থাকলে, সঠিক বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অভ্যুত্থানের পর বিপুল প্রত্যাশা ছিল আদালত প্রাঙ্গণ থেকে দুর্নীতি, পক্ষপাতমূলক আচরণ আর দলবাজি দূর হবে। এই একটা স্থান হবে স্বচ্ছ। আইনজীবীর রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে মামলার রায় প্রভাবিত হবে না। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় কেটেছে, পাল্টা প্রতিক্রিয়ার সময় হিসেবে। আগের সরকারের আমলে যেমন হয়েছে, ওরা অত্যাচার করেছে, সমস্ত রকম সুবিধা নিয়েছে এখন আমাদের পালা। এমন কয়েকজন আইনজীবী এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন যে তারা দাঁড়ালে, মামলায় বিজয় বা জামিন সুনিশ্চিত। ফলাফলে আবার হতাশা জেঁকে বসল। নির্বাচনের পর বিজয়ী দল বিএনপি জনপ্রত্যাশা এবং অঙ্গীকার পূরণ করবে, এটা আশা করা হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা সেই আকাক্সক্ষায় একটা শক্ত ধাক্কা দিয়েছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন এবং চট্টগ্রাম বারের নির্বাচন, সেই পুরনো পথেই হাঁটার নজির তৈরি করল। গণতান্ত্রিক অধিকার বলতে আমরা কী বুঝি? অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাকে মৌলিক অধিকার বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজে সবকিছুই কেনা বেচার পণ্য। ফলে একেবারে অসহায় হয়ে ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের করুণা ভিক্ষা না করলে, সব কিছুই বাজার থেকে কিনতে হবে। কিন্তু মানুষের যদি কাজ না থাকে তাহলে তার আয় থাকে না, আর আয় না করলে ক্রয়ক্ষমতা থাকে না। তখন মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হলেও, মানুষ তা গ্রহণ করতে পারবে না। তাই কাজ পাওয়া এবং ন্যায়সংগত মজুরি পাওয়াটাকেও অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করতে হবে। কথা বলার স্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, সম্মান নিয়ে বাঁচার স্বাধীনতাসহ অন্যান্য বিষয়কে গণতান্ত্রিক অধিকার বলে গণ্য করা হয়। ফলে যখন আমরা অধিকারের কথা বলি, তখন মৌলিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার এই দুইয়ের সমন্বয়ে অধিকারের ধারণা তৈরি হয়। একটা রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, তা বোঝা যায় সে দেশের নাগরিকরা কতটা অধিকার ভোগ করেন তা দিয়ে। এই অধিকার পাওয়ার জন্যই এত আন্দোলন আমাদের।
মানুষ এবং সভ্যতা ইতিহাসকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলছে। ইতিহাস পেছনে টানে না বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা এবং শিক্ষা দিয়ে যায় সবসময়। ইতিহাসের বেদনা, যন্ত্রণা, হাহাকার আর হতাশা শুধু নয় আনন্দও স্মৃতি হিসেবে মানুষকে ভাবায়। মনে করিয়ে দেয়, এই ছিল আমাদের অতীত যেখান থেকে আমরা এসেছি এখানে। সে কারণে ইতিহাসকে বলা যায়, পরিবর্তনের শিক্ষক। কিন্তু ইতিহাস নামক শিক্ষকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। যে কারণে বারবার বলতে হয়, মনে করিয়ে দিতে হয় পূর্বসূরিদের জীবনটা দেখো, তাদের কার্যকলাপ খেয়াল করো, তাদের সাফল্যের শিক্ষা নাও আর ব্যর্থতাকে মনে রাখো। তাহলে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। পরিবর্তনের নিয়ম জেনে তাকে কাজে লাগাও। প্রকৃতি ও সমাজে একই ঘটনা একই রকমভাবে দুবার ঘটে না। ঘটনার কিছুটা মিল থাকে, কিন্তু পুরোটা কখনো মেলে না। সময় কখনো পেছনে ফেরে না, এগিয়ে চলে ক্রমাগত। সে কারণেই মানুষের জীবন সামনে এগিয়ে যায় আর রেখে যায় স্মৃতি। খারাপ স্মৃতিগুলো যেন ভবিষ্যতের পথে কালো ছায়া না ফেলে, এইটুকু আশা কি করা ভুল হবে?
গণআন্দোলনের পর দেশের মানুষ, ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিল। এই প্রতীক্ষার কি শেষ হবে না? নারী, শিশু নির্যাতনকে যারা পোশাকের দোহাই দিয়ে, বাইরে বের হয়েছে কেন এই অভিযোগ দিয়ে লঘু করতে চায় তাদের মানসিকতা কি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে? ক্ষুব্ধ হয়ে, হতাশ হয়ে আর বসে থাকা নয়। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন জরুরি। তা না হলে উন্নয়নের চমকের আড়ালে চাপা পড়ে যাবে মানুষের অধিকার। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হোক। মনে রাখতে হবে, সমাজে স্বস্তি নিয়ে আসা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
