যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ইরান বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে; সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ। সব মিলিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার পেছনে মুখ্য কারণ হয়ে উঠেছে এ সরু জলপথটি। সাম্প্রতিক এ সংঘাত শুরুর পর ইরান হরমুজে তাদের কর্র্তৃত্ব যেমন বাড়িয়েছে; তেমনি দীর্ঘমেয়াদে এ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতেও কাজ করছে। গতকাল সোমবার তেহরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য কোনো টোল আরোপ করতে চায় না ইরান। কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ দিয়ে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে ওমানের সঙ্গে মিলে একটি প্রটোকল প্রণয়নে কাজ করছে ইরান। সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘেই এমনটা জানিয়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে দেশটির আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ। বাঘেই বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান কোনো টোল আদায় করে না এবং এ বিষয়ে ব্যবহৃত পরিভাষার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এ নৌপথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানকে টোল দিয়ে কিছু জাহাজের হরমুজ পাড় হওয়ার তথ্য দিয়েছিল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। এসমাইল বাঘেই বলেন, নিরাপদ জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান ও ওমান যে প্রটোকল তৈরির চেষ্টা করছে, তা একটি দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। তিনি উল্লেখ করেন, এ প্রক্রিয়ায় প্রদত্ত সেবা এবং পরিবেশ সুরক্ষার প্রচেষ্টার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কিছু আর্থিক ব্যয় জড়িত থাকতে পারে। হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পরিকল্পনা সম্পর্কে তাসনিম বার্তা সংস্থার এক প্রশ্নের জবাবে বাঘাই বলেন, ইরান-ওমান ছাড়া অন্য কোনো দেশের ওই প্রণালিতে উপস্থিতির সুযোগ নেই। মুখপাত্র বলেন, নিরাপদ নৌ-চলাচলের ব্যবস্থা প্রণয়ন করা ইরান ও ওমানের দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে উপকূলবর্তী এই দুই দেশ বর্তমানে কাজ করছে। অন্য পক্ষগুলোর বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দ্রুত কার্যকর নৌ-চলাচল ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য ইরান সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলেও জানান ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালের মুখপাত্র।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা করতে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদির ওমান সফর প্রসঙ্গে বাঘাই বলেন, এই প্রণালিটির নিরাপত্তা পুরো বিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং ইরান এটা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করে। তিনি আরও বলেন, উপকূলবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে এটি ইরানের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই তেহরানকে একদিকে নিজের নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। ইরান ও ওমান কার্যকর নিরাপদ নৌ-চলাচল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, কারণ তারা বিশ্বাস করে এ জলপথ পুরো বিশ্বের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। সমুদ্রপথে চলাচলের জন্য নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকে প্রতিটি দায়িত্বশীল দেশই স্বাগত জানায়।
এদিকে গতকাল সোমবার পাকিস্তান ও চীনের পথে রওনা হওয়া তরল প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী দুটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি ছেড়ে গেছে। আর ইরাকের অপরিশোধিত তেলবাহী আরেকটি সুপার ট্যাংকার গত শনিবার পারস্য উপসাগর ছেড়ে গেছে, জাহাজ চলাচলের তথ্যে এমনটি জানা গেছে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপ (এলএসইজি) ও জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলালের তথ্যে দেখা গেছে, এলএনজি ট্যাংকার ফুওয়াইরিত সোমবার হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিচ্ছে। বাহামাসের পতাকাবাহী ফুওয়াইরিত আজ মঙ্গলবার পাকিস্তানে পণ্য খালাস করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে এলএনজি নেওয়া আরেক ট্যাংকার আল রায়ান হরমুজ পার হয়েছে। এলএসইজি ও কেপালরের তথ্যে জানা গেছে, আল রায়ান ২৭ জুন চীনে পৌঁছে পণ্য খালাস করবে। এই ট্যাংকারটির মালিক কোম্পানি কাতার এনার্জি।