খুঁটি বাঁধার নামে চাঁদাবাজির কোপ 

  • গরু বাঁধলেই হাজার টাকা
  • ব‍্যবসায়ীদের কান্না ও ক্ষোভ 
  • প্রশাসনের চোখ অন্ধ 
আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম

পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সারা দেশে জমে উঠেছে পশুর হাটগুলো। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য এই উৎসব ত্যাগের ও আনন্দের বার্তা নিয়ে আসলেও, পশুর হাটের নেপথ্য চিত্রটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার পশুর হাটগুলোতে এক শ্রেণির ইজারাদার এবং স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের সিন্ডিকেট সাধারণ বেপারি, খামারি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ফেলেছে।

বর্তমানে দেশের পশুর হাটগুলোতে সবচেয়ে আলোচিত এবং আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘খুঁটি বাঁধার নামে চাঁদাবাজি’। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে, প্রশাসনের নাকের ডগায় ইজারাদারদের নিয়োজিত লাঠিয়াল বাহিনী প্রতিটি হাটে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রান্তিক খামারি ও পশুর বেপারিরা চরম আর্থিক লোকসান ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সোমবার (২৫ মে) রাতে দিয়াবাড়িসহ কয়েকটি হাটে সরেজমিনে গিয়ে এই চিত্র দেখা গেছে।

কুষ্টিয়া থেকে উত্তরা দিয়াবাড়ি হাটে ১০টি গরু নিয়ে আসেন এরশাদ উল্লাহ। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিটি গরু খুঁটিতে বাঁধার জন্য তাকে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ টাকা নেওয়ার বিপরীতে হাট কর্তৃপক্ষ শুধু ওপরে সামান্য একটু সামিয়ানা টানিয়ে দিয়েছে। এরশাদ উল্লাহ এই অতিরিক্ত ও অবৈধ টাকা দিতে বাধা দিলে তাকে হাট থেকে খেদিয়ে দেওয়ার (বের করে দেওয়ার) হুমকি দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে এবং লোকসানের মুখে বাধ্য হয়ে তিনি গরুগুলো রেখে দেন।

শুধু এরশাদ উল্লাহ নন, তার মতো প্রায় প্রতিটি ব্যবসায়ীকেই এভাবে টাকা দিয়ে খুঁটি নিতে হচ্ছে। দিয়াবাড়ি হাটের মতোই রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী গাবতলীসহ প্রায় প্রতিটি হাটেই সমানতালে চলছে এই অপকর্ম। ইজারাদারদের মনোনীত তথাকথিত ‘স্বেচ্ছাসেবকরা’ মূলত বেপারি ও খামারিদের অনেকটা জিম্মি করে রেখেছেন। আর হাটের ইজারাদারদের এই অতিরিক্ত টাকা উঠানোর বা চাঁদাবাজির কারণে গরুর দামও বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন গরু বেপারিরা। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসন দেশের এই অরাজক পরিস্থিতি দেখেও না দেখার ভান করে আছে।

সাধারণত একটি পশুর হাটে গরু বা মহিষ বেঁধে রাখার জন্য বাঁশের খুঁটি পোতা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, ইজারাদাররা হাটের হাসিল (শতকরা নির্দিষ্ট ফি) আদায় করবেন এবং বিক্রেতাদের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র।

হাটে পশুবাহী ট্রাক এসে নামার পর থেকেই শুরু হয় এই চাঁদাবাজি। ইজারাদারের লোক পরিচয় দিয়ে একদল যুবক প্রতিটি পশুর জন্য আলাদা করে ‘খুঁটি ফি’ বা ‘বাঁধাই ফি’ দাবি করে। স্থানভেদে এই ফি ১ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো বড় হাটে ভালো বা সামনের সারির জায়গায় গরু বাঁধতে হলে এককালীন ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, হাটের হাসিল কেবল ক্রেতা বা বিক্রেতার ওপর নির্ধারিত হারে ধার্য হওয়ার কথা; পশুর অবস্থান বা খুঁটি বাঁধার জন্য আলাদা কোনো চার্জ নেওয়ার কোনো বিধান নেই।

অসহায় ব্যবসায়ীদের আর্তনাদ

এই অবৈধ চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন দেশের প্রান্তিক খামারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত—যেমন কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী এবং উত্তরবঙ্গ থেকে ধার-দেনা করে বা ব্যাংক ঋণ নিয়ে অনেকেই সারা বছর গরু লালন-পালন করেন এই ঈদে একটু লাভের আশায়। কিন্তু হাটে পা রাখামাত্রই তাদের পকেট কাটার মহোৎসব শুরু হয়।

উত্তরা দিয়াবাড়িতে আসা খামারি আব্দুর রাজ্জাক ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে ‘দেশ রূপান্তর’কে বলেন, ‘সারা বছর নিজের সন্তানের মতো গরুগুলোকে লালন-পালন করেছি। হাটে আনার পর ইজারাদারের লোকজন এসে বলে, প্রতি খুঁটির জন্য ১৫০০ টাকা দিতে হবে। টাকা না দিলে গরু বাঁধতে দেবে না। আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি, গরু নিয়ে কোথায় যাব? বাধ্য হয়ে ধার করে টাকা দিতে হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের লাভের গুড় পিঁপড়েই খেয়ে যাবে, বাড়ি ফিরতে হবে খালি হাতে।’

ইজারাদারদের অপকর্ম ও সিন্ডিকেট রাজত্ব

পশুর হাটগুলোর ইজারাদাররা সাধারণত স্থানীয় রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদপুষ্ট হন। ফলে তারা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেন। প্রতিটি হাটে ইজারাদাররা নিজস্ব একটি 'ক্যাডার বাহিনী' বা লাঠিয়াল দল নিয়োগ করে রাখেন, যাদের মূল কাজই হলো জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইজারাদাররা নিজেরা সরাসরি সামনে না এসে স্থানীয় পাতি নেতা বা টোকাইদের মাধ্যমে এই খুঁটি বাঁধার টাকা তোলেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, টাকা আদায়ের কোনো রসিদ বা মেমো দেওয়া হয়না। কোনো বেপারি যদি এই অতিরিক্ত এবং অবৈধ টাকার রসিদ চান, তাও তারা পান না। এই অপকর্মের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রতিটি বড় হাট থেকে লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে নিজেদের পকেটে তুলছেন ইজারাদাররা।

প্রতিবাদ করলেই ‘গরু বের করে দেওয়ার’ হুমকি

হাটে আসা কোনো সাহসী ব্যবসায়ী বা খামারি যদি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, তবে তার ওপর নেমে আসে চরম মানসিক ও শারীরিক হেনস্তা। সিন্ডিকেটের সদস্যরা একজোট হয়ে প্রতিবাদকারীকে কোণঠাসা করে ফেলে। তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো—"টাকা না দিলে এখনই গরু নিয়ে হাট থেকে বের হয়ে যাও।"

দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার টাকা ট্রাক ভাড়া দিয়ে আসা একজন বেপারির পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য হাটে চলে যাওয়া অসম্ভব। তাছাড়া, হাটের ভেতরের পরিবেশ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যে, কেউ এক হাটের জায়গা ছেড়ে দিলে অন্য কোথাও সহজে ঢুকতে পারেন না।

আব্দুর রহমান নামে এক বেপারি জানান, ‘হাটের লোকজন বলে, এখানে ব্যবসা করতে হলে আমাদের নিয়মেই চলতে হবে। বেশি বুঝলে গরুসহ হাটের বাইরে ফেলে দেব, তখন চোর-ডাকাত ধরলে আমরা দায়ী না। প্রশাসন-পুলিশ সব আমাদের পকেটে, চিল্লাইয়া লাভ নাই।’

এই ধরনের হুমকির মুখে নিজেদের জানমাল ও পশুর নিরাপত্তার স্বার্থে মুখ বুজে সব অন্যায় মেনে নিতে বাধ্য হন অসহায় ব্যবসায়ীরা।

প্রশাসনের চোখ অন্ধ

পশুর হাটগুলোতে জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় পৌরসভার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) থাকার কথা। প্রতিটি হাটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পও বসানো হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো—প্রশাসনের চোখ যেন এই চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অন্ধ।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পুলিশের সামনেই এই খুঁটি বাঁধার নামে টাকা তোলা হয়, কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেন না। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য এই চাঁদাবাজির টাকার ভাগ পান বলেও গুঞ্জন রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঝেমধ্যে হাটে পরিদর্শনে আসলেও, ইজারাদারদের লোকজন আগে থেকেই খবর পেয়ে যায় এবং সাময়িকভাবে চাঁদাবাজি বন্ধ রাখে। ম্যাজিস্ট্রেট চলে যাওয়ার পরপরই আবার শুরু হয় আগের রূপ। প্রশাসনের এই নীরব ভূমিকা ও উদাসীনতা অপরাধীদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে।

ভোক্তা ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব

হাটের এই লাগামহীন চাঁদাবাজি কেবল খামারি বা ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়ে সাধারণ ক্রেতা বা ভোক্তার পকেটে

চাঁদার কারণে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা

যখন একজন বেপারিকে খুঁটি বাঁধা এবং অন্যান্য খাতে অতিরিক্ত ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা খরচ করতে হয়, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই পশুর দাম বাড়িয়ে দেন। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত কোরবানিদাতাদের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে পশুর দাম। অনেক পরিবার চড়া দামের কারণে কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য হারাচ্ছেন, যা সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতি এবং চামড়া শিল্পের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রায় ২০ বছর ধরে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় গরু নিয়ে আসা এক খামারি বলেন, ‘এত বছরেও এমন অভিজ্ঞতা হয়নি।’ তার ভাষায়, তিনি অনেক হাট ঘুরেছেন, কিন্তু কমলাপুরের মতো বড় হাটেও কোনো পর্যাপ্ত শেড বা ছাউনি নেই। এ অবস্থায় হাট চালু রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

উত্তরার দিয়াবাড়ি গরুর হাটেও পরিস্থিতি একই রকম বলে অভিযোগ খামারিদের। হাটে প্রবেশের সময় কোনো সমস্যা না হলেও ভেতরে গিয়ে গরুপ্রতি ১৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলে জানান তারা। এক খামারি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একটি গরুতে যদি ১৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়, তাহলে ৩০টা গরুর ক্ষেত্রে কত টাকা দাঁড়ায়? আমরা যে সামান্য লাভ করি, সেটাও এভাবে নিয়ে যাচ্ছে।’

এদিকে তেজগাঁও গরুর হাটে সরাসরি চাঁদাবাজির ঘটনা দৃশ্যমান না হলেও গরুর দড়ি খুলে জায়গা দখলের মতো ঘটনার নেপথ্যে চাঁদার ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে অভিযোগ খামারিদের। কেউ তালিকা তৈরির নাম করে, আবার কেউ সরাসরি ১০০০ টাকা দাবি করছে বলেও জানান তারা। ফলে অনেক ক্ষেত্রে চাঁদাবাজদের পরিচয় বদলে তারা এখন ‘মার্কেট সদস্য’ হিসেবে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

যা বললেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তারা

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় কাউকে চাঁদাবাজি করার জন্য রাস্তায় দাঁড়াতে দেওয়া হবে না। কেউ যেন কোরবানির গরু নিয়ে কোনো ঝামেলায় না পড়ে, সেজন্য পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা নিরলসভাবে কাজ করছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. নজরুল ইসলাম জানান, গরুর হাটকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেজন্য পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে কাজ করে যাচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত