ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম হজ। প্রতি বছর জিলহজ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় হজ পালন করতে মক্কায় সমবেত হন। হজের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ওয়াজিব আমল হলো, মুজদালিফা ও মিনায় অবস্থান।
মুজদালিফা : ৯ জিলহজ আরাফা থেকে ফিরে হাজিরা মুজদালিফায় এসে রাত্রিযাপন করেন। এটি হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব। এখানে হাজিরা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান এবং আল্লাহর ইবাদত ও জিকির করে সময় অতিবাহিত করেন। তারা এখানে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে এশার ওয়াক্তে আদায় করেন। এ ছাড়া মিনায় শয়তানকে নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় পাথরও এখান থেকে সংগ্রহ করেন।
মুজদালিফা সৌদি আরবের মক্কা নগরীর নিকটবর্তী একটি সমতল ভূমি, যা মিনা ও আরাফাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। মুজদালিফা শব্দটি আরবি ‘জুলফ’ থেকে এসেছে। এর অর্থ কাছে আসা, নৈকট্য লাভ করা বা মিলিত হওয়া। ঐতিহাসিকদের মতে, হজরত আদম ও হাওয়া (আ.) আরাফায় পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাতের পর মুজদালিফায় এসে প্রথম রাত্রিযাপন করেন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন।
হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি আরাফায় অবস্থান করেছি আর সমগ্র আরাফাই অবস্থানের স্থান। আমি মুজদালিফার এ স্থানে অবস্থান করেছি আর সমগ্র মুজদালিফাই অবস্থানের স্থান। আমি মিনার এ স্থানে কোরবানি করেছি আর সমগ্র মিনাই কোরবানির স্থান। সুতরাং তোমরা নিজ নিজ অবস্থানে কোরবানি করো। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৩৬)
মিনা : ‘মিনা’ আরবি শব্দ। এর অর্থ আশা-আকাক্সক্ষা। ঐতিহাসিকদের মতে, হজরত আদম (আ.) পৃথিবীতে আগমনের পর এ স্থানে পুনরায় জান্নাতে ফিরে যাওয়ার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণেই স্থানটির নামকরণ করা হয় ‘মিনা’। এটি মক্কা ও মুজদালিফার মধ্যবর্তী একটি পবিত্র স্থান। মুজদালিফা থেকে ফিরে হাজিরা মিনায় অবস্থান করেন, শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করেন এবং কোরবানি আদায় করেন।
মিনার সঙ্গে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনা জড়িয়ে আছে। আল্লাহর নির্দেশে তিনি তার প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে রওনা হন। পথিমধ্যে শয়তান মানবাকৃতিতে এসে তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। তখন ইবরাহিম (আ.) শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করে বিতাড়িত করেন। তার এই আনুগত্যপূর্ণ আমল মহান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত হাজিদের জন্য এ আমলকে হজের অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি কোরবানির দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সওয়ারিতে আরোহণরত অবস্থায় জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। তিনি বলছিলেন, ‘তোমরা আমার কাছ থেকে হজের বিধিবিধান শিখে নাও। কারণ এ হজের পর আমি আর হজ করতে পারব কি না জানি না। (সহিহ মুসলিম ৩০২৮)
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমরা মিনায় একটি গুহায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে অবস্থান করছিলাম। এমন সময় তার ওপর সুরা মুরসালাত নাজিল হয়। তিনি সুরাটি তেলাওয়াত করছিলেন এবং আমি তার মুখ থেকে তা গ্রহণ করছিলাম। এমন সময় একটি সাপ বেরিয়ে এলো। নবীজি (সা.) বললেন, এটিকে হত্যা করো। আমরা এগিয়ে গেলে সাপটি পালিয়ে যায়। তখন তিনি বললেন, যেমন তোমরা তার অনিষ্ট থেকে রক্ষা পেয়েছ, তেমনি সেও তোমাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পেয়েছে। (সহিহ বুখারি ১৮৩০)
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক