এই বর্ষায় ভোলাগঞ্জ

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০১:৫৭ এএম

বর্ষায় সিলেটের প্রকৃতি নিজের রূপ আর স্নিগ্ধতা মেলে ধরে। নান্দনিক সৌন্দর্যের টানে তাই পর্যটকরাও বর্ষায় ছুটে আসেন। দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে একটু মুক্ত বাতাসের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন অনেকেই। ষড়ঋতুর বাংলাদেশের প্রকৃতি বর্ষাকালে মনোমুগ্ধকর এবং আবেদনময়ী হয়ে ওঠে। অফিস থেকে বের হয়ে বাসায় ফিরছি, এর মধ্যে সজল দার ফোন কাল তো অফিস বন্ধ চলেন কোথাও ঘুরে আসি। আমি বললাম ঠিক আছে, যাওয়া যায়। অনেক দিক কোথাও যাওয়া হয় না। আমরা ঘুরতে বের হবো কিন্তু কোথায় যাব তা ঠিক করা হয়নি। ঘুমাচ্ছি, এমন সময় মোবাইলে ক্ষুদে বার্তার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। দাদা ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে নিন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সকাল সাড়ে ৯টা বাজে। ঘুম থেকে উঠে ঝটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ফোনে ফোনে কথা বলে ঠিক করে নিলাম আজ আমরা যাব ভোলাগঞ্জে। ত্রিচক্রযান করে বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার পেড়িয়ে পৌঁছালাম চৌহাট্টা পয়েন্টে। সেখানে আমাদের অন্য ভ্রমণ সঙ্গীরা অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। একদিক মেঘাছন্ন আকাশ, অন্যদিকে সূর্যদেবের আভা। আমরা ছুটে চলছি ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের রাজ্যে।

সিলেটের সীমান্তবর্তী নদের নাম ধলাই। ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে নেমে এসেছে। ওপারে উঁচু পাহাড়ে ঘেরা সবুজের মায়াজাল। সেখান থেকে নেমে আসা ঝরনার অশান্ত শীতল পানির অস্থির বেগে বয়ে চলা। গন্তব্য তৃষ্ণার্ত ধলাইয়ের বুক। স্বচ্ছ নীল পানি, সাদা পাথর আর পাহাড়ের সবুজ মিলেমিশে যেন একাকার। ধলাইয়ের বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাথরের বিছানা শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে হাজার গুণ। সাদা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা ঝরনার পানির তীব্র স্রোত নয়ন জুড়ায়। শীতল পানির স্পর্শে প্রাণ জুড়িয়ে যায় নিমিষে। পাথরের ওপর দিয়ে প্রবল বেগে বয়ে চলা পানির কলকল শব্দে যেন পাগল করা ছন্দ। বরফ গলার মতো ঠা-া সেই পানি। মহাসড়ক পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি ভোলাগঞ্জের পানে। এর মধ্যে শুরু হলো মুষলধারায় বৃষ্টি। আমাদের চার চাকার গাড়ি যখন লাক্কাতুরা চা বাগানের সীমানায় পৌঁছাল তখন বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতি এক অপরূপ সাজে ধরা দিল। চারপাশে সবুজের সমারোহ। নীল আকাশের নিচে যেন সবুজগালিচা পেতে আছে সজীব প্রকৃতি।  মাঝে মাঝে টিলাবেষ্টিত ছোট ছোট জনপদ। পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে ছুটে গেছে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। আমরা ভেবেছিলাম বর্ষায় হয়তো মানুষ খুব কম বের হয় ঘুরতে, কিন্তু আমাদের ধারণা ভুল। প্রায় ঘণ্টা হতে চলল, শেষ পর্যন্ত মিরা দিদি টিকিট হাতে নিয়ে বীরের বেশে আমাদের মাঝে উপস্থিত হলেন। আর দেরি না করে আমরা আটজন উঠে পড়লাম নৌকায়।

আমাদের ইঞ্জিনচালিত নৌকা তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলল। দেখা পেলাম রোপওয়ের। ছোটবেলায় অনেক শুনেছি এই রোপওয়ের কথা। শান্ত স্তব্ধ পাহাড়, তার সঙ্গে মিশেছে আকাশের নীল। মাথার ওপরে তুলার মতো মেঘ।  নিচে পানি-পাথরের সংমিশ্রণ। নৌকা থেকে নেমে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। আমরা জিরো পয়েন্টে দিকে পায়ে হেঁটে এগিয়ে যেতে লাগলাম। পথে দেখা পেলাম ঘোড়ার, চাইলে ঘোড়া করেও সামনের পথটুকু যাওয়া যায়। কিছু দূরেই দেখতে পেলাম তরমুজ নিয়ে বসেছে একজন বিক্রেতা। আমরা চলে এলাম কাক্সিক্ষত পাথরের জগতে। চারদিকে পাথর আর পাথর, এখানে সব পাথর সাদা রঙের। সামনে সবুজ পাহাড়, পাশে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া প্রচন্ড স্রোতের স্বচ্ছ শীতল জল আর সে জল থেকে গড়িয়ে নামা সাদা পাথর, কী অপরূপ বলে বোঝানোর নয়। আমরা পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া শীতল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি, আহা কী ঠান্ডা। পানি আর সাদা পাথরের জাদুকরি শীতল স্পর্শে আমরা বিমোহিত। উফ! জীবনের বিস্ময়কর এক অভিজ্ঞতা বটে। পাথর বিছানো বিছানার ওপর দিয়ে ধেয়ে যাচ্ছে ঝরনার পানি। দুদিকে পাথর, মাঝখান দিয়ে বয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছ জলধারা। এই পানিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নানা বয়সের পর্যটকরা। পানিতে শান্ত করে মন-প্রাণ। এভাবে কখন পাহাড়ি রোদ তার কোলে আশ্রয় নিয়েছে টের পাইনি। অন্ধকার জেঁকে বসার আগেই সেই অসম্ভব সুন্দরকে বিদায় জানিয়ে আমরা ফিরে চলি চিরচেনা গন্তব্যে।

যেভাবে যাবেন

সিলেটের আম্বরখানা থেকে সিএনজি এবং মজুমদারী এলাকা থেকে ভোলাগঞ্জ যাওয়ার জন্য আছে বিআরটিসি, লোকাল ও ট্যুরিস্ট বাস। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রতি ২০ মিনিট পরপর এসব বাস চলাচল করে। সিএনজি রিজার্ভ নিয়েও যেতে পারবেন সাদা পাথর স্পটে। আম্বরখানা থেকে ভোলাগঞ্জ যেতে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের মতো সময় লাগবে। ভোলাগঞ্জ নেমে ১০ নম্বর নৌকাঘাট থেকে সাদা পাথর যাওয়া ও আসাসহ নৌকা ভাড়া করতে খরচ হবে ৮০০ টাকা। প্রতি নৌকায় সর্বোচ্চ ১০ জন যেতে পারবেন। আপনি যদি একা বা কম মানুষ নিয়ে ঘুরতে যান তাহলে কম খরচে নৌকা ভাড়া করতে চাইলে অনেক নৌকা আছে, যারা ১ জন ২ জন করে ৮-১০ জন মিলিয়ে নিয়ে যায়। সেক্ষেত্রে ভাড়া ভাগ করে দিলে নৌকা ভাড়ার খরচ কমে যাবে। সাদা পাথর এলাকায় গিয়ে আপনাদের যতক্ষণ ইচ্ছা সময় কাটাতে পারবেন। এক্ষেত্রে মাঝির সঙ্গে কথা বলে মাঝির ফোন নম্বর নিয়ে রাখলেই হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত