রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের মামলায় একদিনে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন মামলার সব সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। এদিন ১৬ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের পাশাপাশি তাদের জেরাও হয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে আসামিদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য আজ বুধবার দিন ধার্য করে আদালত।
এর আগে গত সোমবার মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় একই আদালত।
গতকাল রামিসার বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা, মা পারভীন আক্তার, বড় বোন, ফুপু মাহমুদা আক্তার, চাচা মিজানুর রহমান লিটন, তার বাসার চতুর্থ তলার বাসিন্দা মনির হোসেন, প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজু, দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা শেখ আবু সামা, ফুপা মনিরুজ্জামান শাহীন, কনস্টেবল রোমা আক্তার, কনস্টেবল শরীফ মিয়া, এসআই ইকবাল হোসেন, চিকিৎসক নাসাদ জাবিন, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ, এসআই রাশেদুল ইসলাম ও তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. অহিদুজ্জামানের জবানবন্দি নেয় আদালত।
গতকাল শুনানির আগে পুলিশ হেফাজতে থাকা আসামিদের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার না করতে নির্দেশ দেন এই ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেয় আদালত। মামলার কার্যক্রম শুরুর সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আইন অনুযায়ী বিচারকের সামনে অভিযোগ গঠন শুনানি, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় বক্তব্য প্রদান এবং ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দেওয়া ছাড়া পুলিশ হেফাজতে কোনো আসামির বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি আদালতকে জানান, এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। পুলিশ হেফাজতে থাকা কিংবা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার করা সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালার পরিপন্থী। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধও। বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখা, জনমত প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ রোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ভবিষ্যতে পুলিশ হেফাজতে থাকা কোনো আসামি যেন প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে না পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানান। তার বক্তব্য শুনে আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
ক্যামেরা ট্রায়ালে সাক্ষ্য রামিসার বোনের
ভুক্তভোগী রামিসার বোন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় ক্যামেরা ট্রায়ালে তার সাক্ষ্য নেয় ট্রাইব্যুনাল। মামলার সাক্ষ্য চলাকালে মামলার প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে গ্রহণের আবেদন জানান। তিনি বলেন, রামিসার বোন এখনো শিশু, তার বয়স মাত্র ১৬ বছর। বোনের হত্যাকাণ্ডের পর এখনো তিনি মানসিক ট্রমায় আছেন। এত লোকজনের সামনে সাক্ষ্য দিতে বিব্রতবোধ করতে পারেন। তাই তার সাক্ষ্য ক্যামেরা কোর্টে নেওয়া হোক। ট্রাইব্যুনাল আবেদন মঞ্জুর করে। এই সাক্ষীর জবানবন্দির পর আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কলিমউল্লাহ তাকে জেরা করেন।
গত ২৪ মে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই (উপপরিদর্শক) মো. অহিদুজ্জামান। গতকাল তিনি তার সাক্ষ্যে বলেন, রামিসা হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামির বাইরে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
মামলা সূত্রে জানা যায়, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে অভিযুক্ত সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না তাকে কৌশলে রুমের ভেতরে নেন। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য তার বাবা মা খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। একপর্যায়ে সোহেলের কক্ষের সামনে শিশুটির জুতা পাওয়া যায়। ডাকাডাকির পর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তিষ্কবিহীন মরদেহ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সোহেল রানা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে আসামি বলেন, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যান। এরপর বাথরুমে নিয়ে ছোট্ট রামিসাকে ধর্ষণ করেন সোহেল। এর মধ্যে শিশু রামিসার মা দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। এ সময় সোহেল তাকে গলা কেটে হত্যা করেন। পরে মরদেহ গুম করার জন্য তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে গলা থেকে আলাদা করেন। এরপর দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখেন। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিলেন। পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান সোহেল। এ ঘটনার দিন দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। গত ২০ মে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। একই দিন আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত।