‘রেডিমেডে’ আগ্রহ বিনিয়োগকারীদের

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৬:৫০ এএম

চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহ বাড়ছে রেডিমেড বন্দরের জেটিতে। যদিও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ল্যান্ড লর্ড (সরকারের ভূমিতে প্রাইভেট বিনিয়োগে বন্দর নির্মাণ) পদ্ধতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু তারপরও এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে থাকায় ল্যান্ড লর্ড পদ্ধতির বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ি আরও বিলম্বিত হতে পারে বলে বন্দরসংশ্লিষ্টদের ধারণা। চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক টার্মিনাল হলো এনসিটি ও সিসিটি, যা ‘রেডিমেড’ অবস্থায় রয়েছে। তাই এ টার্মিনাল পরিচালনায় আসতে চায় বিদেশি কোম্পনিগুলো।

বিলম্ব নিয়ে শঙ্কা জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কম বিনিয়োগে যদি বেশি লাভ পাওয়া যায়, তাহলে বিনিয়োগকারী কম বিনিয়োগের জায়গায় বিনিয়োগ করবে। বে-টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার কথা। কিন্তু এখন যদি তারা এনসিটিতে এর চেয়ে কম বিনিয়োগ করে বেশি রিটার্ন পায়, তাহলে তো এখানেই সাশ্রয়। এ ছাড়া বে-টার্মিনালে বিনিয়োগের পর টাকা উঠে আসতে অনেক সময় লাগবে। একই চিত্র মাতারবাড়ির ক্ষেত্রেও সেখানে এনসিটি চুক্তির পর থেকেই রিটার্ন আসবে।’

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত হলেও এখনো চুক্তি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। এদিকে এনসিটির পাশাপাশি সিসিটিকেও (চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল) পরিচালনা করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। গত ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-দুবাই প্ল্যাটফর্ম সভায় সিসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দেয় দুবাই সরকারের মালিকানাধীন ডিপি ওয়ার্ল্ড। পরে গত ২২ এপ্রিল সৌদি আরবের সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানাধীন আরএসজিটি সিসিটি পরিচালনার জন্য প্রস্তাবনা দেয়। এখন প্রশ্ন হলো আগামীতে দেশের অর্থনীতির গেম চেঞ্জার হিসেবে চিহ্নিত বে-টার্মিনাল-মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর-লালদিয়া টার্মিনাল। বে-টার্মিনাল প্রকল্পের আওতায় তিনটি টার্মিনালের মধ্যে দুটি টার্মিনালে আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সিঙ্গাপুরের পোর্ট অব সিঙ্গাপুর বিনিয়োগের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি রয়েছে। অপরদিকে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে পরিচালনা করছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল। পতেঙ্গার লালদিয়া চরে বিনিয়োগের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ডেনমার্কের এপি মুলারের মায়ের্সক কোম্পানির। একই এলাকায় দেশীয় কোম্পানি এমজিএইচ একটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের জন্য চুক্তি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। অর্থাৎ নতুন নতুন টার্মিনাল নির্মাণের দিকে যেখানে চট্টগ্রাম বন্দরের দৃষ্টি, সেখানে বিদ্যমান পুরনো বন্দরের অবকাঠামোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শিপিং সেক্টরের বিভিন্ন প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয়। তাদের বক্তব্য হলো গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ এনসিটিতে, ৩৬ শতাংশ জিসিবিতে, ১৬ শতাংশ সিসিটিতে এবং প্রায় ৪ শতাংশ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে হ্যান্ডলিং হয়েছে। ড্রাফট ও আধুনিক ইকুইপমেন্ট বেশি থাকায় বড় জাহাজগুলো এনসিটি ও সিসিটিতে ভিড়ে এবং কনটেইনারও বেশি হ্যান্ডলিং করে। নতুন বন্দরের চেয়ে এখানেই বিনিয়োগ হয়তো অনেক নিরাপদ মনে করছেন তারা। এ বিষয়ে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর তথা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন বন্দরের বিকল্প নেই। সে হিসাবে সবার আগে বে-টার্মিনাল বাস্তবায়ন করতে হবে। তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এনসিটি, সিসিটি কিংবা জিসিবিমুখী হলে চলবে না। হুম, বে-টার্মিনাল পুরোদমে চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের বিদ্যমান পোর্ট ফ্যাসিলিটি নিশ্চিত রাখতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, এখন প্রশ্ন হলো এখানে এনসিটি কিংবা সিসিটিতে বিদেশি বিনিয়োগকারী নিয়ে। তবে এখানে সরকার চাইলে বিদেশি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে দেশীয় বিনিয়োগকারীর অংশীদার রাখতে পারে। এতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বিকাশ লাভ করবে, ঠিক তেমনিভাবে দেশের টাকাও দেশে থাকবে।

অপরদিকে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেন, বিদ্যমান এনসিটি কিংবা সিসিটিতে বিদেশি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করলেও তাদের বে-টার্মিনালে বিনিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবৃদ্ধির জন্য বে-টার্মিনাল তথা নতুন বন্দর নির্মাণের বিকল্প নেই।

বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান এনসিটি-সিসিটি পরিচালনায় যে কেউ আগ্রহ দেখাতে পারে। আর এতে যৌক্তিক বিবেচনায় যা প্রযোজ্য হয়, আমরা সেটাই করব। তবে আগামীর বন্দরখ্যাত বে-টার্মিনাল কিংবা মাতারবাড়িতে বিদেশি বিনিয়োগে পেছানোর কোনো সুযোগ নেই। ওই প্রকল্প দুটো স্বাভাবিক গতিতে এগোচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে।’

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে জিসিবি (জেনারেল কার্গো বার্থ), এনসিটি, সিসিটি ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল রয়েছে। এসব টার্মিনাল দিয়েই চট্টগ্রাম বন্দরের সব পণ্য ওঠানামা হয়ে থাকে। বঙ্গোপসাগরের তীরে হালিশহর সাগরপাড়ে নির্মাণ হতে যাওয়া বে-টার্মিনাল ২০৩০ সালের মধ্যে অপারেশনে আসতে পারে। সেই লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে বলে বন্দরের পক্ষ থেকে জানানো হয়। একইভাবে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজও চলমান রয়েছে, এটিও ২০৩০ সালে আসতে পারে। একইভাবে পতেঙ্গার লালদিয়া টার্মিনাল ২০২৯ সালে অপারেশনে আসতে চায়। বর্তমানে জিসিবি, এনসিটি ও সিসিটি দেশীয় অপারেটর দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এখানেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ বাড়ছে।

উল্লেখ্য, আগামীতে চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনালে পিএসএ সিঙ্গাপুর ও ডিপি ওয়ার্ল্ড উভয় প্রতিষ্ঠান ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার করে মোট ১৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার কথা রয়েছে প্রাক্কলিত চুক্তি অনুযায়ী। অপরদিকে লালদিয়ায় এপি মুলারের মায়ের্সক ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বে-টার্মিনালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিশ্বব্যাংক থেকে ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, মাতারবাড়িতে জাইকার বিনিয়োগ আছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা, পতেঙ্গার লালদিয়ায় এমজিএইচ বিনিয়োগ করবে ৫০০ কোটি টাকা। এসব বিনিয়োগের সবই প্রায় নতুন গ্রিনফিল্ডে বিনিয়োগ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত