ঈদের চেনা সমীকরণ আর প্রথাগত অ্যাকশন-রোমান্সের গ-ি ভেঙে ঢাকাই চলচ্চিত্রের শীর্ষ নায়ক শাকিব খান এবার হাজির হয়েছেন সম্পূর্ণ নতুন এক অবতারে। ঈদুল আজহায় দেশের ১০৩টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া ‘রকস্টার’ সিনেমাটি বক্স অফিসে এবং দর্শক মহলে তৈরি করেছে নতুন এক উদ্দীপনা। সান মোশন পিকচার্স লিমিটেডের ব্যানারে, অঞ্জন চৌধুরী পিন্টুর প্রযোজনায় সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন তরুণ নির্মাতা আজমান রুশো। নুসরাত মাটির লেখা মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনের এই গল্পটি আন্তর্জাতিক মানের মিউজিক্যাল ড্রামা হিসেবে যেমন প্রশংসা কুড়াচ্ছে, তেমনি প্রথাগত ধারার দর্শকদের মধ্যে তৈরি করেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
নিঃসঙ্গতায় বেড়ে ওঠা
সিনেমার গল্পটি আবর্তিত হয়েছে ‘আগুন’ নামের এক ছন্নছাড়া তরুণকে কেন্দ্র করে। প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী তারিক আনাম খানের সন্তান সে। বাবা ও মা রোজী সিদ্দিকীর অসুখী দাম্পত্যের টানাপড়েন আর তীব্র নিঃসঙ্গতার ভেতর বেড়ে ওঠা আগুনের কৈশোর কেটেছে চরম মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে। বাবার ঘরানাকে অস্বীকার করে সে বেছে নেয় পশ্চিমা ব্যান্ড মিউজিক। তবে ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের কারণে লাইভ স্টেজে পারফর্ম করতে তার চরম ভীতি। একদিন ঘটনাচক্রে মঞ্চে গাইতে বাধ্য হওয়ার পর সে রাতারাতি খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে যায়, পাশাপাশি তার জীবনে আসে মীরা। কিন্তু জনপ্রিয়তার আকাশচুম্বী আলোয় এসে সেই স্টারডমের চাপ নিতে পারে না আগুন। মাদকাসক্তি, আইনি জটিলতা এবং জেল খাটার পর যখন সে ফিরে আসে, ততক্ষণে প্রিয় মানুষ মীরা তার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। ২ ঘণ্টা ২৭ মিনিটের এই চলচ্চিত্রে মূলত একজন শিল্পীর ক্যারিয়ারের চেয়েও এক আবেগতাড়িত যুবকের পাওয়ার ও হারানোর তীব্র দহনকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মেগাস্টারের অভাবনীয় রূপান্তর
পর্দায় চিরচেনা বাণিজ্যিক ইমেজের খোলস ভেঙে শাকিব খানের এই রূপান্তরই সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। লম্বা চুল, স্টাইলিশ কস্টিউম, গায়কির নিখুঁত উপস্থাপন এবং রকস্টারের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে তিনি দর্শকদের চমকে দিয়েছেন। লাইভ কনসার্টের হাই-এনার্জি দৃশ্যের পাশাপাশি চরিত্রের ভেতরের একাকিত্ব, আসক্ত যুবকের দহন ও অপ্রাপ্তি ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে শাকিব তার অভিনয় দক্ষতার চরম মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, ‘রকস্টার’-এ শাকিব তার ক্যারিয়ারের অন্যতম ডমিনেটিং পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন, যা চিত্রনাট্যের দুর্বলতাকেও আড়াল করে সিনেমাটিকে একক শক্তিতে টেনে নিয়ে গেছে।
রোমান্টিক রসায়ন
শাকিবের বিপরীতে মীরা চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাবিলা নূর। ছোট পর্দার চেনা ইমেজ ভেঙে বড় পর্দায় এক পরিপক্ব প্রেমিকারূপে তিনি নিজেকে মেলে ধরেছেন। প্রথমার্ধে শাকিবের সঙ্গে তার অনস্ক্রিন রসায়ন এবং দ্বিতীয়ার্ধে আবেগের তীব্রতা ছিল বেশ সাবলীল। তবে চিত্রনাট্যে তার চরিত্রের পরিধি কম থাকায় খুব বেশি চমক দেখানোর সুযোগ ছিল না। অন্যদিকে করপোরেট গ্ল্যামারের দাবি মিটিয়েছেন তানজিয়া জামান মিথিলা, যদিও তার স্ক্রিনটাইম ছিল অতিসংক্ষিপ্ত। সিনেমার অন্যতম শক্তি ছিল এর পার্শ্ব চরিত্রগুলো।
গুণী তারকাদের উপস্থিতি
তারিক আনাম খান ও রোজী সিদ্দিকীর প্রভাবশালী অভিনয় গল্পে এক আলাদা গভীরতা যোগ করেছে। দাদির চরিত্রে দিলারা জামানের সংবেদনশীল উপস্থিতি দর্শকদের আবেগকে স্পর্শ করে। এছাড়া আগুনের ম্যানেজার ও বন্ধু আসলাম চরিত্রে কাজী সাবির এবং সীমিত সময়ের উপস্থিতিতে সংগীতশিল্পী পান্থ কানাইয়ের অভিনয় মিউজিক্যাল আবহকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলেছে।
চোখধাঁধানো কারিগরি কাজ ও সুরের মায়াজাল
পরিচালক আজমান রুশো সিনেমার কারিগরি বিভাগে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছেন। ওপেন কনসার্ট থেকে শুরু করে জ্যামিং স্টুডিওর প্রোডাকশন ডিজাইন, সবখানেই পরিচালকের মুন্সিয়ানা স্পষ্ট। চোখধাঁধানো সিনেমাটোগ্রাফি, দৃষ্টিনন্দন কালার গ্রেডিং ও দুর্দান্ত ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন সিনেমাটিকে বৈশ্বিক মান দিয়েছে। বিশেষ করে আহমেদ হাসান সানি ও জাহিদ নিরবের সুরে ‘পিরিতি’ এবং ‘আমাকে উড়িয়ে দাও’ গান দুটি প্রেক্ষাগৃহের সাউন্ড সিস্টেমে সুরের এক জাদুকরী মায়াজাল তৈরি করেছে। শাকিব খানের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে সিনেমাটি মুক্তির প্রথম কয়েক দিনেই কোটি টাকার বেশি গ্রস কালেকশনের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
চিত্রনাট্যের দুর্বলতা ও প্রথাগত দর্শকদের অসন্তোষ
কারিগরি দিক থেকে দারুণ হলেও ‘রকস্টার’ মূলত চরিত্রনির্ভর ছবি হওয়ায় এর চিত্রনাট্য কিছুটা আলগা রয়ে গেছে। পরিচালক পুরো গল্পে অন্ধের মতো কেবল আগুনকেই অনুসরণ করেছেন, ফলে অন্য চরিত্রগুলো ঠিকঠাক বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। তবে সিনেমার সংলাপ ভালো ছিল, গল্পের শেষ পরিণতি আরোপিত মনে হয়েছে। সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে মেইনস্ট্রিম বা সিঙ্গেল স্ক্রিনের দর্শকদের কাছ থেকে। ঈদে যারা মেগাস্টারের মারদাঙ্গা অ্যাকশন কিংবা চেনা ফর্মুলার সিনেমা আশা করেছিলেন, তাদের অনেকেই হতাশ হয়েছেন। নায়ক হিসেবে আগুনের মাদকাসক্তি ও নেতিবাচক লাইফস্টাইল দর্শকদের কোনো ইতিবাচক বার্তা দিতে পারেনি।
বাঁকবদলের সাহসী প্রয়াস
কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ‘রকস্টার’ বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করার এক নান্দনিক ও আধুনিক প্রয়াস। টেক্সটের চেয়ে টেকনিকে এগিয়ে থাকা এই চলচ্চিত্রটি ঢাকাই সিনেমার চেনা ফর্মুলা ভাঙার ক্ষেত্রে একটি সাহসী ও সফল নিরীক্ষা, পরিচালকের প্রথম সিনেমা হিসেবে সফল বললেও ভুল হবে না।
