৫০০ টাকায় মিলবে গরুর মাংস

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ০৬:৩৪ এএম

বছর চারেক ধরেই চাহিদার চেয়ে বেশি গরুর মাস উৎপাদন করছেন স্থানীয় খামারিরা। তবে উৎপাদন বাড়লেও কমছে খাওয়ার পরিমাণ। যার মূলে রয়েছে চড়া মূল্য। গরুর মাংসের দাম গত কয়েক বছরে ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তা সাধারণ মানুষের সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন খরচ কমিয়ে ভোক্তার হাতে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় গরুর মাংস পৌঁছে দিতে কাজ শুরু করেছে প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)। 

বিএলআরআইয়ের গবেষণার তথ্য বলছে, ২০১৫ সালের পর থেকে চাহিদার তুলনায় গরুর মাংস উৎপাদনের সক্ষমতা কমতে থাকে। তবে নানা প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বড় বড় উদ্যোক্তারা মাংস উৎপাদনে আসায় এই সক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। যার ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে এসে দেশে গরুর মাংসের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে ২১ শতাংশ বেড়ে যায়। এখনো বাড়তি উৎপাদনের এই ধারাবাহিতা বজায় থাকলেও সংকট তৈরি হয়েছে ভোক্তার ভোগের ক্ষেত্রে। শুধু বাড়তি দামের কারণে গরুর মাংসের খাওয়া কমে গেছে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত।

এই সংকটের মূলে রয়েছে বাড়তি উৎপাদন খরচ। ২০১৫ সালের পর থেকে দানাদার খাবারের দাম বেড়েছে অন্তত ১৫০ গুণ, যার প্রভাব পড়েছে মাংসের দামে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে যথাক্রমে ২৮০ টাকা এবং ৪০০ টাকা কেজি দরে। যা বর্তমান সময়ে এসে বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ টাকা পর্যন্ত দামে।

গবেষকরা বলছে, এই অবস্থা থেকে গরুর মাংসের দাম কমানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে খাদ্যের দাম কমিয়ে আনা। এজন্য দেশব্যাপী বড় বড় কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা দানাদার খাদ্যের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনে উন্নত জাতের ঘাসের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। কারণ ঘাসের উৎপাদন খরচ একেবারেই কম এবং প্রোটিনের উৎস হিসেবে দানাদার খাবারের চেয়েও বেশি কার্যকরী। গবেষকরা বলছেন, গরু পালনে দানাদার খাবার থেকে বেরিয়ে ঘাসনির্ভর হতে হবে। নতুন প্রযুক্তিতে নেপিয়ার ঘাসের কথা বলা হচ্ছে, যদিও তা বেশ আগে থেকেই সীমিত পরিসরে দেশে চাষ হচ্ছে। যেখানে নেপিয়ার ঘাসের সঙ্গে দানাদার খাদ্য থাকবে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। এই ব্যবস্থাপনাতেই কমে আসবে মাংসের উৎপাদন খরচ, কমবে দাম।

জানা গেছে, বিএলআরআই আগামী অর্থবছরে গরুর মাংসের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার জন্য ‘টেকসই ও কার্বন নিরপেক্ষ গরুর মাংস উৎপাদন’ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহযোগিতায় এই প্রকল্পের কর্মপরিকল্পনা সাজিয়েছেন বিএলআরআইয়ের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার (এসএসও-বায়োটেকনোলজি বিভাগ) এবং প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ড. মোহাম্মদ খাইরুল বাশার।

খাইরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, গরুর মাংসের দাম কমাতে হলে দানাদার খাদ্য থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। শূন্য মিথেন নিঃসরণের মাধ্যমে একেকটি খামারে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় গরুর মাংসের উৎপাদন নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। এখানে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদের গবেষণার প্রতিফলন ঘটবে এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে কারিগরি সুবিধা নেওয়া হবে।

গবেষকরা জানান, বর্তমানে সাড়ে ছয় কেজি খাবার খেয়ে এক কেজি মাংস বাড়ে গরুর শরীরে। দানাদার খাবার ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এক কেজি মাংসের উৎপাদন খরচ পড়ছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। দানাদার খাবারের জায়গায় যদি নেপিয়ার ঘাস প্রতিস্থাপন করা হয় তাহলে এই খরচ এসে দাড়াবে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় নেমে আসবে। কারণ, ঘাসের উৎপাদন ব্যয় অনেক কম। আবার এটি প্রোটিনের একটি বড় উৎস। প্রোটিনের পাশাপাশি গরুকে শক্তিশালী করতে ঘাসের সঙ্গে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত দানাদার খাবার যেমন ভুট্টা, গমের মতো পণ্যগুলো ব্যবহার করা হবে। যাতে করে আর কোম্পানিগুলোর দানাদার খাবারের ওপর নির্ভরতা তৈরি করতে না হয়।

জানা গেছে, এক কেজি নেপিয়ার সব খরচ মিলিয়ে দাম পড়ে ১৬ টাকা। সে হিসেবে ৬ দশমিক ৫ কেজি ঘাসের দাম পড়ে ১০৪ টাকা এবং এর সঙ্গে অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ৩২ টাকা ধরলে মোট দাম দাড়ায় ১৩৬ টাকা। অর্থাৎ ১৩৬ টাকা খরচের বিপরীতে ১ কেজি ওজন পাবে গরু। এখান থেকে মাংস আসবে ৫০০-৫৫০ গ্রাম। অর্থাৎ পুরো এক কেজি মাংসের জন্য খরচ হবে ২৭২ টাকা। তবে খামারিরা সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনে বাকি ৩ থেকে ৪ মাস মোটাতাজা করে থাকেন। এই হিসেবে এক কেজি মাংসের মোট খরচ ধরা হবে ২৭২ এর দ্বিগুণ অর্থাৎ ৫৪৪ টাকা।

তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষি জমির স্বল্পতায় ঘাস উৎপাদন একটি বড় চ্যালেঞ্চ। এজন্য চরাঞ্চলের পতিত জমিগুলো ব্যবহার করা যায় কি না তা আলোচনায় রয়েছে। এভাবে সমন্বিত একটি পরিল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বিজ্ঞনীরা মাংসের দাম কমিয়ে আনতে চাচ্ছেন। জানা যায়, গরু পালনের ক্ষেত্রে ৭০ ভাগ খরচ হচ্ছে খাবারের এবং বাকি ৩০ শতাংশে পরিচালন ব্যয়।

টেকসই ও কার্বন নিরপেক্ষ গরুর মাংস উৎপাদন’ প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর খাইরুল বাশার বলেন, নতুন ব্যবস্থাপনায় খামার তৈরি এবং ঘাসের উৎপাদন দুটোকেই গুরুত্ব দেওয়া হবে। সমন্বিত একটি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কমে আসবে উৎপাদন খরচ।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০২৩ সালের তথ্য মতে, বর্তমানে একেকজন মানুষ বছরে গড়ে ১ দশমিক ২৫ কেজি গরুর মাংস খায়, যা ২০১৭ সালে ছিল ২ দশমিক ৭১ কেজি। এ ছাড়া সব ধরনের মাংসের ক্ষেত্রে প্রতিজন মানুষ মাংস খান গড়ে ৪ থেকে ৫ কেজি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত