শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মূল পিচের ওপর থেকে যখন কাভার সরানো হলো, তখন দৃশ্যপটে কেবলই সবুজের আভা। মিরপুরের চেনা মন্থর ও স্পিন-সহায়ক উইকেটের প্রথাগত রূপ ভেঙে এবার হোম অব ক্রিকেটে প্রস্তুত করা হয়েছে গতি ও বাউন্স সমৃদ্ধ এক ‘স্পোর্টিং’ উইকেট। আর এমন এক ভিন্ন আবহে দীর্ঘ ১৫ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামীকাল (মঙ্গলবার) তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মুখোমুখি হবে দুই দল।
সর্বশেষ ২০১১ সালে দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ খেলেছিল বাংলাদেশ। দেড় দশক আগের সেই সিরিজে খেলা দুই দলের কোনো ক্রিকেটারই এবার মাঠে নেই। তবে স্কোয়াডে না থেকেও এক অদৃশ্য আবহে জড়িয়ে আছেন সাকিব আল হাসান। সাবেক এই অধিনায়কের দেশে ফেরার পরিস্থিতি তৈরি না হওয়ায় এবার সম্পূর্ণ নতুন এক প্রজন্মের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে নামার রোমাঞ্চ ছুঁয়ে যাচ্ছে স্বাগতিক অধিনায়ককে।
অতীতে মিরপুর মানেই ছিল ঘূর্ণি পিচে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ। গত মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট জয়সহ সাম্প্রতিক সিরিজগুলোয় ভালো উইকেটে খেলার সুফল পেয়েছে দল। অধিনায়ক মিরাজ স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন আগামী বছর দক্ষিণ আফ্রিকা-জিম্বাবুয়ে-নামিবিয়ায় অনুষ্ঠেয় ওয়ানডে বিশ্বকাপকে মাথায় রেখেই ভালো উইকেটে খেলার এই সাহসী সিদ্ধান্ত, ‘সবাই ভাবে মিরপুর মানেই স্পিন বা খারাপ উইকেট, কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। আমরা স্পোর্টিং উইকেটে খেলব, কারণ এখানে ব্যাটাররা রান পেলে এবং বোলাররা ভালো করলে দলের আত্মবিশ্বাস অনেক উঁচুতে থাকবে। বিশ্বকাপের আগে এই আত্মবিশ্বাস অর্জন করা আমাদের জন্য ভীষণ জরুরি।’
বাংলাদেশ দলের বর্তমান সবচেয়ে বড় শক্তির নাম গতি তারকা নাহিদ রানা। তার উচ্চতা ও এক্সপ্রেস গতি নিয়ে প্রতিপক্ষ শিবিরে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। অজি অধিনায়ক জশ ইংলিশ অকপটে স্বীকার করেছেন রানাকে নিয়ে তারা সতর্ক, ‘আমি তাকে খুব বেশি খেলতে দেখিনি, তবে যতটুকু ভিডিও দেখেছি ও বেশ রোমাঞ্চকর একজন বোলার। উচ্চতার সঙ্গে গতির এমন সমন্বয় যেকোনো ব্যাটারদের জন্যই কঠিন পরীক্ষা।’
অন্যদিকে, মিচেল মার্শের ইনজুরি ও ট্রাভিস হেডের ব্যক্তিগত কারণে এই সফরে না থাকা অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় ধাক্কা। তবে জশ ইংলিশের দল হালকাভাবে নিচ্ছে না পরিস্থিতি। প্যাট কামিন্স বা মিচেল স্টার্কের মতো বড় নামরা স্কোয়াডে না থাকলেও নাথান এলিস, জাভিয়ের বার্টলেট কিংবা বেন ডোয়ারশুইসের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন ইংলিশ। বিশেষ করে তিন ফেজেই বোলিং করতে পারা নাথান এলিসকে এই সিরিজে দলের তুরুপের তাস মানছেন অজি অধিনায়ক।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ওয়ানডে পরিসংখ্যান একেবারেই সুখকর নয়। ফল হওয়া ২১টি ম্যাচের মধ্যে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা জয় পেয়েছে মাত্র ১টিতে; সেটিও দুই দশকের বেশি সময় আগে, ২০০৫ সালে কার্ডিফে মোহাম্মদ আশরাফুলের মহাকাব্যিক সেঞ্চুরিতে। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে শুধু ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই ওয়ানডে সিরিজ জেতা হয়নি বাংলাদেশের। হোম গ্রাউন্ডের চেনা কন্ডিশনে এবার সেই আক্ষেপ মেটাতে উন্মুখ মিরাজ বাহিনী।
গত এক বছরে ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের মূল চিন্তার জায়গা ছিল মিডল অর্ডারের ধারাবাহিকতার অভাব। তবে সদ্য সমাপ্ত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (ডিপিএল) তাওহিদ হৃদয়ের ৫০০ ঊর্ধ্ব রান, নাজমুল হোসেন শান্ত এবং ৪ বছর পর ওয়ানডে দলে ফেরা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের ফর্ম আশাবাদী করছে ম্যানেজমেন্টকে।
শেষ মুহূর্তে নাটকীয় কিছু না হলে প্রথম ওয়ানডের একাদশেই দেখা যাবে মোসাদ্দেককে। অধিনায়ক মিরাজের মতে, মোসাদ্দেকের অন্তর্ভুক্তি দলে একজন বাড়তি বোলার ও মিডল অর্ডারে দারুণ ভারসাম্য এনে দেবে। সাবেক প্রধান নির্বাচকের পুরনো মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া দুজনের ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র গুঞ্জনও উড়িয়ে দিয়েছেন মিরাজ। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ২০১৯ বিশ্বকাপসহ প্রায় ৩৯টি ম্যাচে একসঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। মোসাদ্দেক খেলবেন ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবে আর মিরাজ নিজে বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে দুজনের ভূমিকাই আলাদা।
কাগজে-কলমে তারকাবিহীন অস্ট্রেলিয়া কিছুটা ব্যাকফুটে থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে তারা সবসময়ই কঠিন প্রতিপক্ষ। অন্যদিকে, নিজেদের চেনা আঙিনায় নতুন এক ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশ। মিরপুরের সবুজ গালিচায় কার মুখে শেষ হাসি ফুটবে, তা দেখার অপেক্ষায় দেশের কোটি ক্রিকেটপ্রেমী।