রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন সংক্রান্ত যাবতীয় নথি) হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে। গতকাল বিকেলে লালসালুতে মোড়ানো এ সংক্রান্ত নথি ঢাকার সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত থেকে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিকেল সাড়ে ৫টায় হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা আসামি সোহেল ও স্বপ্নার ডেথ রেফারেন্স গ্রহণ করে।
রামিসাকে হত্যার মামলায় গত রবিবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুই আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদ- দেয় আদালত। জরিমানার এ টাকা রামিসার আইনি উত্তরাধিকারকে দিতে বলা হয় রায়ে। জরিমানা অনাদায়ে সংশ্লিষ্ট কালেক্টরেট অফিসকে আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করে বিক্রির মাধ্যমে ওই অর্থ রামিসার আইনি উত্তরাধিকারদের প্রদানের নির্দেশ দেন বিচারক। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী অধস্তন কোনো বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদন্ডের রায় হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টে শুনানি সাপেক্ষে অনুমোদন লাগে। এ জন্য মামলার রায়সহ যাবতীয় নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পরিচিত। হাইকোর্টে পেপারবুক (মামলার রায়সহ যাবতীয় নথি) প্রস্তুত সাপেক্ষে মামলার শুনানি শুরু হয়। পাশাপাশি বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করতে পারেন। কোনো আসামির আপিল করার মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে তার পক্ষে জেল আপিল হয়। হাইকোর্টে মৃত্যুদন্ড বহাল থাকলে দন্ডপ্রাপ্ত আসামি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারেন। আপিল বিভাগেও সাজা বহাল থাকলে রায় রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) চেয়ে আবেদন করতে পারেন। রিভিউ আবেদন খারিজ হলে এবং মৃত্যুদন্ড বহাল থাকলে শেষ সুযোগ হিসেবে আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে দোষ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন। প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হলে কারা কর্তৃপক্ষ কারাবিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আসামির ফাঁসি কার্যকর করতে পারে।
গত ১৯ মে পল্লবীতে রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে বাসার জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ স্বপ্না খাতুনকে হেফাজতে নেয়। একপর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২১ মে আসামি সোহেল রানা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। গত ২৫ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. অহিদুজ্জামান আদালতে সোহেল ও স্বপ্নাকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন বিচারক মাসরুর সালেকীন। ২ জুন রাষ্ট্রপক্ষে ১৬ জন সাক্ষ্য দেন এবং ওই দিন সাক্ষীদের জেরা শেষ হয়। পরদিন ৩ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানির হয়। পরে ৪ জুন যুক্তিতর্কের শুনানি রশষ হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর পর তিন কার্যদিবস শুনানি শেষে রবিবার আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন বিচারক।
এদিকে সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেমড সেলে ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের কনডেমড সেলে রাখা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ফাঁসির আসামিদের সাধারণত একা রাখা হয় না। কারণ রায়ের পর তারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে খারাপ থাকে। আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটাতে পারে। এজন্য সবার সঙ্গে রাখা হয়। সাধারণত ফাঁসির একটি সেলের আয়তন বিবেচনায় ২ থেকে ৫ জনকে একসঙ্গে রাখা হয়।